শক্তিমান বর্মা খুনের আসামী কে এই আনন্দ প্রকাশ চাকমা

fec-image

রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমা ও ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক-এর প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মাসহ ছয় খুনের আসামি ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের কেন্দ্রীয় নেতা আনন্দ প্রকাশ চাকমাকে ঢাকার শেরেবাংলা নগর এলাকা থেকে গতকাল (২৪ ফেব্রুয়ারি) গ্রেফতার করে র‍্যাব-২।

র্যা ব-২ এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর মোহাম্মদ আলী পার্বত্যনিউজকে বলেন, ‘আগারগাঁও স্টাফ কলোনিতে মেয়ের বাসায় আত্মগোপন করে ছিলেন আনন্দ প্রকাশ চাকমা। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র্যা ব ওই এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে।’  গ্রেফতারকালে তিনি নিজেকে অসুস্থ বলে দাবী করেন বলে মেজর মোহাম্মদ আলী আরো জানান।

গতকাল (২৪ ফেব্রুয়ারি) ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে পাঠানো নিরন চাকমা কর্তৃক স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক দলটির দপ্তর সম্পাদক আনন্দ প্রকাশ চাকমাকে গ্রেফতারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।

ইউপিডিএফের বিবৃতিতে আনন্দ প্রকাশ চাকমাকে দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দেয়া হয়। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের ইনসার্জেন্সির ইতিহাসে আনন্দ প্রকাশ চাকমা এক বহুল আলোচিত নাম। কেননা, অফিসিয়ালি দপ্তর সম্পাদক পদাধিকারী হলেও আনন্দ প্রকাশ চাকমা মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ বিরোধী পাহাড়ী সশস্ত্র গ্রুপের একজন কমান্ডার হিসেবে বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

ফলে তার গ্রেফতারের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার ঝড় ওঠে। অনেকেই তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পার্বত্যনিউজ অফিসে ফোন করে আগ্রহ প্রকাশ করেন।

কে এই আনন্দ প্রকাশ চাকমা?

তার আসল নাম আনন্দ প্রকাশ চাকমা হলেও ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের সশস্ত্র দলের মধ্যে সে বেশ কিছু ছদ্ম নামে পরিচিত যেমনঃ পারং, কণ্ঠ এবং আইসাই। তবে পারং নামেই সে বেশী পরিচিত।

রাংগামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলার খুল্যাংপাড়া গ্রামে তার জন্ম। আনন্দ প্রকাশ চাকমা ১৯৮২ সালে নবম শ্রেণীতে পড়াশুনা করার সময় ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় তৎকালীন শান্তিবাহিনীর ট্রেনিং সেন্টারে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এরপর তিনি একজন সেকেন্ড লেফটেনেন্ট হিসেবে শান্তিবাহিনীতে যোগদান করে পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র আন্দোলন পরিচালনা শুরু করেন।

শান্তিবাহিনীতে থাকাকালীন সময়ে তিনি প্রথমে তৎকালীন প্রীতি গ্রুপের সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (এম এন লারমা)’র হত্যাকারী ঘাতক দলের একজন সদস্য ছিলেন বলেও জানা যায়। পরবর্তীতে, ১৯৮৫ সালে তিনি জেএসএস-এর কাছে আত্নসমর্পন করে তাদের পক্ষ হয়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাতে থাকেন।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তির পর এর তীব্র বিরোধীতা করে ২০০০ সালের মার্চ মাসে আনন্দ চাকমা শান্তিচুক্তি বিরোধী সংগঠন ইউপিডিএফ-এ যোগদান করেন। ইউপিডিএফ-এ যোগদান করার পূর্বে তিনি রাংগামাটির নানিয়ারচর উপজেলার মরাচেংগী হাইস্কুলে শিক্ষকতা করতেন।

এছাড়াও, ১৯৯৭ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত রন্তাকুর বনবিহারে ভান্তের সেবাকারী হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।

ইউপিডিএফ-এ যোগদান করার পর তিনি ইউপিডিএফ এর বিশেষ গোপন শাখা “ইয়ুথ ব্রিগেড”-এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ইউপিডিএফ-এর “ইয়ুথ ব্রিগেড”-এর সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের প্রশিক্ষণ পরিচালনা এবং প্রশিক্ষণ সামগ্রী, অস্ত্র, পোষাক, ঔষধ ইত্যাদি সরবরাহের দায়িত্বে ছিলেন।

গত বছর (২০১৮ সাল) ৩ মে তারিখে নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর পরদিন নিহত শক্তিমান চাকমার শেষকৃত্যে যাওয়ার পথে গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যাকরা হয় তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মাসহ পাঁচজনকে।

ওই ছয় খুনের ঘটনায় যে মামলা হয়েছে, তাতে আনন্দ প্রকাশ চাকমাও আসামি। জানা যায় যে, ঐ হত্যাকান্ডের মূল পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে আনন্দ প্রকাশ চাকমা অন্যতম।

শুধু তাই নয়, এর আগেও আনন্দ প্রকাশ চাকমা বর্মাকে খুনের চেষ্টা করেছিলেন। ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক কর্তৃক প্রকাশিত পুস্তিকায় দাবী করা হয়েছে, ২০১৪ সালে প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে নারাখাইয়া ইউপিডিএফ কার্যালয়ে প্রসীত বিকাশের নেতৃত্বে তপন জ্যোতি বর্মাকে মেরে ফেলার জন্য এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে আনন্দ বিকাশ চাকমা উপস্থিত ছিলেন।

ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের প্রধান নেতা প্রসীত বিকাশ খীসার অত্যন্ত আস্থাভাজন এবং ঐ সশস্ত্র দলের দ্বিতীয় প্রধান আনন্দ বিকাশ চাকমা রাংগামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলার বাসিন্দা হলেও ছয় খুনের ঘটনার পর থেকে তিনি বেশীরভাগ সময়ই ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে আত্নগোপন করে থাকতেন।

অবশেষে, গতকাল (২৪ ফেব্রুয়ারি) আনন্দ প্রকাশ চাকমাকে ঢাকার শেরেবাংলা নগর এলাকা থেকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় র‍্যাব-২।। তাকে সঠিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ইউপিডিএফ ও পার্বত্য চট্টগ্রামে ইনসার্জেন্সির অনেক গোপন ও অকথিত ইতিহাস জানা যাবে বলে শান্তিপ্রিয় পার্বত্যবাসীর ধারণা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twenty + 7 =

আরও পড়ুন