‘এই সরকারের আমলেই আদিবাসীদের পূর্ণাঙ্গ অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হবে’- রাশেদ খান মেনন

10407232_688570641197140_9017712600448763519_n

স্টাফ রিপোর্টার, পার্বত্যনিউজ :

এই সরকারের আমলেই পার্বত্য শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন করা হবে বলে ‘আদিবাসীদের’ আশ্বাস দিলেন বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। তিনি বলেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তির মাধ্যমে ‘আদিবাসীদের’ ভূমি অধিকারের কথা বলা হয়েছে। আমাদের সংবিধানেও ‘আদিবাসীদের’ অধিকারের কথা বলা আছে। এখন এর যথাযথ স্বীকৃতির মাধ্যমে ‘আদিবাসীদের’ অধিকার রক্ষা করতে হবে। এ জন্য সেতুবন্ধন রচনা করা জরুরী।

শনিবার সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আন্তর্জাতিক আধিবাসী দিবস উপলক্ষ্যে আদিবাসী ফোরামের র‌্যলি পূর্ব সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ সব কথা বলেন। এবারের অনুষ্ঠানের মুল প্রতিপাদ্য ছিল ‘আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠায় মুক্তিকামী জনতার সেতুবন্ধন’।

রাশেদ খান মেনন এ সময় ‘আদিবাসীদের’ অধিকার রক্ষায় পাহাড়ী-বাঙ্গালী ও সমতলের ‘আদিবাসীদের’ মধ্যে সেতুবন্ধনের উপর জোর দেন। তিনি বলেন, এই শহীদ মিনার আমাদের এক করবে। এ জন্য আমাদের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করে ঐক্যবদ্ধতা অত্যন্ত জরুরী। এ সময় মন্ত্রী বেশকিছু সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সমালোচনা করে বলেন, কিছু কিছু সুশীলরা নিরাপত্তার চশমা পড়ে ‘আদিবাসীদের’ দেখেন। এতে ‘আদিবাসীদের’ অধিকার খর্ব হচ্ছে। স্বশস্ত্র পাহারার মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়না, নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় ভালবাসার মাধ্যমে। ভালবাসার চোখ দিয়ে ‘আদিবাসী’ ও বাঙ্গালীদের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করতে হবে। এখন্ও পর্যন্ত ‘আদিবাসীরা’ নানাভাবে নির্যাতিত ও অবহেলিত হয়ে আসছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, সমতলের ‘আদিবাসীরা’ ভূমির অধিকার ও মানবাধিকার থেকে এখন্ও বঞ্চিত। কিন্তু এখন্ও সরকারীভাবে তাদের অধিকার আদায়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। তবে এই সরকারের আমলেই আদিবাসীদের পূর্ণাঙ্গ অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

সমাবেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, আদিবাসীদের অস্তিত্ব অস্বীকার করলে এই দেশেরই অস্তিত্ব থাকে না। তাই দেশের স্বার্থে ‘আদিবাসী’ ও বাঙ্গালীদের মধ্যে সেতুবন্ধন জরুরী। ইসরায়েলের মত আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে ‘আদিবাসীদের’ দমিয়ে রাখলে দেশের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে।স্বাধীনতার এত বছর পর এখন্ও ‘আদিবাসীরা’ র্নিযাতিত ও নিপীড়িত অভিযোগ করে তিনি বলেন, দেশের একটি অংশের জন্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আর সংখ্যালঘু ‘আদিবাসী’ সম্প্রদায়ের জন্য সামরিক ব্যবস্থা এটা হতে পারেনা। সামরিক শাসনের মাধ্যমে ‘আদিবাসীদের’ দমিয়ে রাখা হযেছে। তাই অতিদ্রুত ‘আদিবাসীদের’ ভুমির অধিকার ও মানবাধিকারের জন্য সেতুবন্ধন জরুরী বলে মনে করেন মানবাধিকারের চেয়ারম্যান।

অনুষ্ঠানের সভাপতি পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ( সন্তু লারমা) বলেন, বর্তমান সরকারের কাছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের আবেদন-নিবেদনের পালা শেষ হয়ে গেছে। এবার স্বাধিকার আদায়ে তাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রামে নামতে হবে।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে সন্তু লারমা বলেন, সরকার ও রাষ্ট্র আমাদের দাবিকে অবহেলা করে। অবজ্ঞা করে। আমাদের কোনো দাবিই তারা আমলে নেয়নি। তিনি বলেন, আমরা এখন বিরক্তির শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি। পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে যা করা দরকার আমরা আজ থেকে তাই করবো। অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার বোবা হয়ে গেছে, কানা হয়ে গেছে। তারা আমাদের কোনো কথা শুনে না। সরকার যদি মনে করে দেশে ‘আদিবাসী’ বলে কেউ নেই তাহলে তারা ভুল করবে।

সন্তু লারমা বলেন, আমাদের জীবনের পথ এখন রুদ্ধ হয়ে আছে। দিনের পর দিন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষেরা বঞ্চিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠীর কাছে আমরা আবেদন করেও কোনো ফল পাইনি। আমরা জানি, কিভাবে স্বাধিকারের জন্য সংগ্রাম করতে হবে। অনুষ্ঠানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, আজকের এ দিনে আপনাদের সবার প্রতি আহবান জানাই ঐক্যবদ্ধভাবে আপনারা অধিকার আদায় করে নিবেন। তিনি বলেন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষেরা শুরু থেকেই নির্যাতিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন সরকারের সময়, বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠীর কাছে আমরা আবেদন করে ব্যর্থ হয়েছি। কেউ আমাদের দাবি শুনছে না।

সমাবেশে শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন ও সমতলের ‘আদিবাসীদের’ অধিকার রক্ষায় আলাদা মন্ত্রনালয়ের তাগিদ দেন বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।

আইন ও শালিস কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামাল বলেন, যুদ্ধ করে আমরা এ দেশ স্বাধীন করেছি। তাই ‘আদিবাসীদের’ অধিকার রক্ষায় আমাদের লড়াই করতে হবে। এ সময় তিনি ‘আদিবাসীদের’ উপর নিপীড়ন ও অস্বীকৃতির বিরুদ্ধে সেতুবন্ধন রক্ষা করার তাগিদ দেন। এ সময় বাংলা একাডেমীর মত সংখ্যালঘু ‘আদিবাসীদের’ জন্য একটি একাডেমী প্রতিষ্ঠা জরুরী বলেও মত প্রকাশ করেন তিনি।

আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জ্যেতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার সভাপতিত্বে সমাবেশে এ সময় অন্যন্যের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেবায়েত ফেরদৌস, সাদেকা হালিম, নাট্যব্যাক্তিত্ব মামুনুর রশিদ, কানাডিয়ান হাইকমিশনার ডানিয়েল লুসি, ইউএনডিপির কান্ট্রি ডিরেক্টর পলিন তেমাসিস প্রমূখ।

নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান আদিবাসী ফোরামের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ( সন্তু লারমা)। “এবার আর কোনো আবেদন-নিবেদন নয়, দাবি আদায়ে কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে। আদিবাসীরাও মানুষ, তাদেরও আশা-আকাঙ্ক্ষা আছে, তারা জানে কিভাবে লড়াই করতে হয়।”

এর আগে সকাল ১০টায় বেলুন উড়িয়ে সমাবেশের উদ্বোধন করেন মানবাধিকারের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান। সমাবেশ শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও র‌্যালি অনুষ্ঠিত হয়।

 

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: আদিবাসী, আদিবাসী দিবস, আদিবাসী ফোরাম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × two =

আরও পড়ুন