খাগড়াছড়িতে ৫ম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে সক্রিয় ইউপিডিএফ

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:
পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে খাগড়াছড়িতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন ইউপিডিএফ(প্রসীত)। যৌথ বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানে মাঠ ছাড়া সংগঠনটি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সক্রিয় হয়ে ওঠে। উপজেলা নির্বাচনকে ঘিরে আবারও মাঠ দখলের জন্য শক্তি বৃদ্ধি করছে। বাড়িয়েছে চাঁদাবাজি ও প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার তৎপরতা।

চলতি বছরে এ পর্যন্ত খাগড়াছড়িতে দুটি লাশ পড়েছে। তবে প্রশাসন বলছে, সন্ত্রাসীরা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারবে না। তাদের গ্রেফতারে যৌথ বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

৯ উপজেলা নিয়ে গঠিত খাগড়াছড়ি জেলা। পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রথম ধাপে জেলার খাগড়াছড়ি সদর, রামগড়, মানিকছড়ি, মাটিরাঙা ও মহালছড়ি উপজেলা পরিষদে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

২০১৪ সাল থেকে চার ধাপে অনুষ্ঠিত গত চতুর্থ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে পাঁচ উপজেলা পরিষদে ইউপিডিএফ(প্রসীত), দুটি বিএনপি, একটি আওয়ামী লীগ ও একটিতে জেএসএস(এমএন) প্রার্থীরা নির্বাচিত হন। পঞ্চম উপজেলা পরিষদে আওয়ামী লীগ, ইউপিডিএফ(প্রসীত) ও জেএসএস(এমএন) সম্ভাব্য প্রার্থীরা তৎপরতা শুরু করলেও বিএনপির কোন তৎপরতা এখনো চোখে পড়েনি।

খাগড়াছড়ির পাঁচ উপজেলায় ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপ সমর্থিত নির্বাচিত উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানরা হলেন, খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা পরিষদে চঞ্চু মনি চাকমা, পানছড়িতে সর্বোত্তম চাকমা, লক্ষ্ণীছড়িতে সুপার জ্যোতি চাকমা, দীঘিনালা উপজেলা পরিষদে নব কমল চাকমা ও সর্বশেষ অনুষ্ঠিত গুইমারা উপজেলা পরিষদে উশেপ্রু মারমা
পক্ষান্তরে বিএনপি প্রার্থীরা দুটি উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত ও অপর তিনটি উপজেলা পরিষদের সামান্য ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন।

চতুর্থ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট( ইউপিডিএফ)সমর্থিত প্রার্থী চঞ্চুমনি চাকমা ১৩,৪২৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী কংচাইরী মগ পান ১৩,২৬২ ভোট। রামগড় উপজেলা পরিষদে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া ফরহাদ ১০,৪৫৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী চাইথোয়াই চৌধুরী ৫,১২৫ ভোট পান। মানিকছড়িতে আওয়ামীলীগ সমর্থিত প্রার্থী ম্রাগ্য মারমা ১১,৫২৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতমী বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী এস এম রবিউল ফারুক পান ৮,৩৭৬ ভোট।

মাটিরাঙা উপজেলা পরিষদে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মো: তাজুল ইসলাম ১৬৯৪৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামীলীগ সমর্থিত প্রার্থী মো: শামছুল হক পান ১৫,১৬৯ ভোট। মহালছড়িতে জেএসএস(এমএন) গ্রুপের সমর্থিত প্রার্থী বিমল কান্তি খীসা ৮,৮৯৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম আওয়ামীলীগ সমর্থিত প্রার্থী নিলোৎপল খীসা পান ৪.৩৮৩ ভোট। পানছড়িতে ইউপিডিএফ সমর্থিত প্রার্থী সর্বোত্তম চাকমা ১১,৭৯৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী অনিমেষ চাকমা রিংকু ভোট ৮,৩৯১ পান।

দ্বিতীয় ধাপে অনুষ্ঠিত লক্ষ্ণীছড়ি উপজেলা পরিষদে ইউপিডিএফ সমর্থিত প্রার্থী সুপার জ্যোতি চাকমা ৪,৩৭০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামীলীগ সমর্থিত প্রার্থী সাথোয়াই অং মারমা পান ২,৮৪৭ ভোট।

তৃতীয় ধাপে দীঘিনালা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ইউপিডিএফ সমর্থিত প্রার্থী নব কমল চাকমা ১২,৮১০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম আওয়ামীলীগ সমর্থিত প্রার্থী মো: কাশেম পান ১০,৮৫৩ ভোট।

গুইমারা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ইউপিডিএফ সমর্থিত প্রার্থী উশ্যেপ্রু মারমা ৬ হাজার ৩৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন ও আওয়ামীলীগ সমর্থিত প্রার্থী মেমং মারমা পান ৫ হাজার ৫৫৭ ভোট।

তবে বিভিন্ন হত্যাসহ একাধিক মামলার আসাসী হওয়ার কারণে খাগড়াছড়ি সদর, পানছড়ি ও লক্ষ্ণীছড়ি উপজেলা পরিষদে চেয়ারম্যানরা দীর্ঘ দিন ধরে অনেকটা আত্মগোপনে রয়েছে। লক্ষ্ণীছড়ি ও পানছড়ি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানরা ইতিমধ্যে পদ হারিয়েছেন। সেখানে ভাইস চেয়ারম্যানরা এখন দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে এ তিন উপজেলায় ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের চতুর্থ উপজেলা পরিষদে নির্বাচিত চেয়ারম্যানরা আদৌ অংশ নিতে পারবে কিনা নিশ্চিত নয়।

পক্ষান্তরে আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি নেবে কিনা এখনো নিশ্চিত নয়। অংশ না নিলে তাদের বিশাল ভোট কোন দিকে যাবে এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।

এদিকে পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে পাহাড়ে আলোচিত ও বিতর্কিত আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপ। যৌথবাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানে সংগঠনটি অনেকটা কোনঠাসা হয়ে পড়লেও আবার মাঠ দখলের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।

চলতি বছরে জেলার দীঘিনালা ও রামগড়ে প্রতিপক্ষ জেএসএস(এমএন)গ্রুপের দুই কর্মী প্রাণ হারিয়েছে। জেএসএস(এমএন) এ হত্যাকাণ্ডের জন্য ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপকে দায়ী করলেও ইউপিডিএফ’র কেন্দ্রীয় নেতা মাইকেল চাকমা এ ঘটনাকে আভ্যন্তরীণ কোন্দল বলে দাবী করেছে।

সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মত উপজেলা নির্বাচনেও ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপ জেএসএস সন্তু গ্রুপের সমর্থন পাবে এবং তারা সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচন করবে বলে স্থানীয়দের ধারণা। তাদের ধারণা একাদশ জাতীয় সংস নির্বাচনে পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবে উপজেলা নির্বাচনে। ফলে ব্যাপক সহিংসা বাড়তে পারে। এ ছাড়াও একাধিক আসনে ইউপিডিএফ জেএসএস সংস্কারের মুখোমুখি হতে হবে।

পঞ্চম উপজেলা পরিষদে অংশ নিচ্ছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের কেন্দ্রীয় নেতা মাইকেল চাকমা বলেন, ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক দল। নির্বাচনে অংশগ্রহনের বিষয়ে আমরা সব সময় প্রজেটিভ। তবে তা নির্ভর করবে পরিস্থিতির উপর। আমরা দেখবো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন হয়, না অবাধ ও সুষ্ঠ নির্বাচন হয়। তারপর সিদ্ধান্ত নেবো।

অপরদিকে খাগড়াছড়ির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এম এম সালাউদ্দিন একটি আঞ্চলিক সংগঠনের অপতৎপরতায় জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির কথা স্বীকার করে বলেন, আমরা বসে নেই। জানমালের নিরাপত্তায় সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় সন্ত্রাসীদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসীদের অস্ত্রসহ ধরা হচ্ছে।

তিনি বলেন, আসন্ন পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সন্ত্রাসীরা যাতে প্রভাব ফেলতে না পারে, জনগণ যাতে তার পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে পারে তার জন্য নিরাপত্তা বাহিনীর সক্রিয় ভূমিকা থাকবে। আমরা কোনক্রমেই সন্ত্রাসীদের মতামত সাধারণ মানুষের উপর চাপিয়ে দিতে দেবো না।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: ইউপিডিএফ, উপজেলা পরিষদ নির্বাচন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 × two =

আরও পড়ুন