“১৯৮৬ সালের এই দিনে মাটিরাঙ্গা ও পানছড়িতে বসবাসরত বাঙ্গালিদের জীবনে নেমে আসে নৃশংস, বীভৎস, ভয়ঙ্কর ও বিভীষিকাময় এক কালরাত্রি”

গণহত্যার বিচারের দাবিতে রাঙ্গামাটিতে পার্বত্য অধিকার ফোরামের মানববন্ধন

খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা, পানছড়ি ও দীঘিনালা গণহত্যা দিবস উপলক্ষে পার্বত্য অধিকার ফোরাম ও বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদের মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সোমবার (২৯ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে ৫টায় রাঙামাটি শহরের পৌরসভাস্থ পার্বত্য অধিকার ফোরামের জেলা কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ রাঙামাটি জেলা শাখার সভাপতি মো. নাজিম আল হাসান ও কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. বাকি বিল্লাহ্’র পরিচালনায় প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন পার্বত্য অধিকার ফোরামের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা বেগম নূর জাহান।

এসময় বিশেষ বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলন রাঙামাটি জেলা শাখার সভাপতি মো. ইউনুছ, সাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর কামাল, পার্বত্য অধিকার ফোরামের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক মো. হাবিবুর রহমান হাবিব, বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম রাঙামাটি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. আবছার উদ্দিন, কলেজ শাখার সভাপতি মো. মুমিনুল ইসলাম।

মানববন্ধনে বক্তরা বলেন, আজ ভয়াল ২৯ এপ্রিল। খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা, পানছড়ি গণহত্য দিবস। পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত দিন। ১৯৮৬ সালের এই দিনে মাটিরাঙ্গা ও পানছড়িতে বসবাসরত বাঙ্গালিদের জীবনে নেমে আসে নৃশংস, বীভৎস, ভয়ঙ্কর ও বিভীষিকাময় এক কালরাত্রি। রাত আনুমানিক ৯টায় বর্বর শান্তিবাহিনী নিরস্ত্র নিরীহ বাঙ্গালির ওপর হিংস্র দানবের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সেদিন পার্বত্যবাসী প্রত্যক্ষ করেছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসের এক নৃশংস বর্বরতা। ঘটনার ৩৩ বছর অতিবাহিত হলেও কোন বিচার পায়নি স্বজন হারানো পরিবার গুলো।

খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় ১৯৮৬ সালের ২৯ এপ্রিল দিবাগত রাত আনুমানিক ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার তাইন্দং/ তবলছড়ি/ বর্ণাল/ বেলছড়ি/ আমতলি/ গুমতি/ গুইমারা ৮টি ইউনিয়নের ৮৫টি গ্রামের প্রত্যেকটি বাঙ্গালি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে এই গণহত্যা করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ( জেএসএস) এর অঙ্গ সংগঠন শান্তিবাহিনীর গেরিলা যোদ্ধারা ও উপজাতি সন্ত্রাসীরা। বাঙ্গালিদের সমস্ত বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয় এবং লুটপাট করা হয়। উপজাতি সন্ত্রাসীরা সামনে বাঙ্গালি যাকে পেয়েছে তাকেই হত্যা করেছে। মাত্র কয়েক ঘন্টা সময়ে ৪শ’ জনের অধিক নারী, শিশু, আবাল-বৃদ্ধ বনিতা নিরস্ত্র নিরীহ বাঙ্গালিকে হত্যা করা হয়েছে এবং আহত করা হয়েছে আরও ৮শ’ জনের অধিক বাঙ্গালি।

খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার লোগাং/চেঙ্গী/পানছড়ি/লতিবান/উল্টাছড়ি ৫টি ইউনিয়নে ও দিঘীনালার ৪৫টি গ্রামের প্রত্যেকটি বাঙ্গালি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে এই গণহত্যা করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ( জেএসএস) এর সশস্ত্র শাখা শান্তিবাহিনীর গেরিলা যোদ্ধারা, সে সময় বাঙ্গালিদের সমস্ত বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয় এবং লুটপাট করা হয়। শান্তি বাহিনীর সন্ত্রাসীরা সামনে বাঙ্গালি যাকে পেয়েছে তাকেই হত্যা করেছে। মাত্র কয়েক ঘন্টা সময়ে ৩শ’ ৫০ জনের অধিক নারী, শিশু, আবাল-বৃদ্ধ বনিতা নিরস্ত্র নিরীহ বাঙ্গালিকে হত্যা করা হয়েছে এবং আহত করা হয়েছে আরও ৫শ’ জনের অধিক বাঙ্গালি।

৬ হাজার ২শ’ ৪০টি বাড়ি সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে গৃহহীন হয়ে পড়ে হাজার হাজার পরিবার। জেএসএসের সশস্ত্র শাখা শান্তি বাহিনীর গেরিলা যোদ্ধারা সেদিন এতগুলো মানুষকে হত্যা করতে একটি বুলেটও ব্যবহার করেনি। হাত-পা বেঁধে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে, দা-দিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে জবাই করে, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে, বেয়নেট ও অন্যান্য দেশীয় অস্ত্র দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নানা ভাবে কষ্ট দিয়ে হত্যা করেছিল এই অসহায় মানুষ গুলোকে।

প্রতিটি লাশকেই বিকৃত করে সেদিন চরম অমানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল তারা। ঘটনাটি স্বচক্ষে দেখা এবং বেচে যাওয়া কিছু কিছু স্বাক্ষী আজও আছে।

শান্তি বাহিনীর অব্যাহত হুমকির মুখে সেসব গ্রামের উপজাতীয় বাসিন্দাদের একটি বড় অংশ শরণার্থী হয়ে ভারতে যেতে বাধ্য হয়। যারা ভারতে যেতে রাজি হয়নি তাদেরকে শান্তি বাহিনী মুখে কাপড় বেঁধে হামলা চালায়। এভাবেই শান্তি বাহিনী নিরীহ উপজাতিদের উপরও হামলা করে, হুমকী দিয়ে সে সময়ে ভারতে শরণার্থী হতে বাধ্য করে।

মাটিরাঙ্গা ও পানছড়ি গণহত্যা ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে জেএসএসের শান্তিবাহিনী সন্ত্রাসীদের দ্বারা বিভিন্ন গণহত্যা সংঘটিত হয়। এসব গণহত্যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য লংগদু গণহত্যা, ১৯৭৯ কাউখালি গণহত্যা, বেতছড়ি গণহত্যা, বানরাইবারী, বেলতলী, বেলছড়ি গণহত্যা, তাইন্দং, আচালং, গৌরাঙ্গ পাড়া, দেওয়ান বাজার, তবলছড়ি, বর্ণাল, রামছিরা, গোমতি গণহত্যা,গোলকপতিমা ছড়া, মাইচ্যেছড়া, তারাবনছড়ি গণহত্যা, ভূষণছড়া গণহত্যা, দিঘীনালা গণহত্যা, ২৯ এপ্রিল ১৯৮৬, মাটিরাঙ্গা গণহত্যা, কুমিল্লাটিলা, শুকনাছড়ি, দেওয়ান বাজার, সিংহপাড়া, তাইন্দং গণহত্যা, দিঘীনালা গণহত্যা, ২ জুলাই ১৯৮৬, ভাইবোন ছাড়া গণহত্যা, হিরাচর, শ্রাবটতলী, খাগড়াছড়ি, পাবলাখালী গণহত্যা, লংগদু গণহত্যা ১৯৮৯, নাইক্ষ্যাছড়ি গণহত্যা, মাল্যে গণহত্যা, লোগাং গণহত্যা, নানিয়ারচর গণহত্যা, পাকুয়াখালী গণহত্যা, জুরাইছড়ি গণহত্যা। জেএসএস’র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙাামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান নিয়ে পৃথক রাষ্ট্র গঠণ করা। সে ষড়যন্ত্র থেকে তারা হত্যা করে এদেশের খ্যাতিমান সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সিপাহী পর্যন্ত প্রায় ২শ’ ৫৬ জন বীর সেনাকে।

দেশে অনেক মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের এত গণহত্যার বিচার হয় নি কেন?

বক্তরা পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্তৃক সকল হত্যাকান্ডের বিচারের দাবি করেন।

ঘটনাপ্রবাহ: পার্বত্য অধিকার ফোরামের মানববন্ধন, রাঙ্গামাটিতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 + 2 =

আরও পড়ুন