দেশে তৈরি স্বল্প দামের ফোন এখন হাতে হাতে

প্রযুক্তি ডেস্ক:

স্যামসাং, ওয়াল্টন, সিম্ফনির মত জনপ্রিয় কোম্পানির স্মার্টফোন এখন তৈরি হচ্ছে দেশেই। কম দামে এসব কোম্পানির ফোন পৌঁছে যাচ্ছে হাতে হাতে। এছাড়াও বাজারে রয়েছে আইটেলের কয়েকটি মডেল। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে মোবাইল ফোন বিদেশে রপ্তানি করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো।

দেশে অল্প মজুরিতে শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে এবং বাহির থেকে আমদানির যে শুল্ক খরচ সেটা লাগে না বলেই দেশে তৈরিকৃত ফোনের দাম তুলনামূলক অনেকটাই কম বলে জানিয়েছেন মোবাইল নির্মাতারা। যে মোবাইল দেশে তৈরি করে ২৫ হাজার টাকায় ক্রেতাদের হাতে পৌঁছানো যাচ্ছে, আমদানি করলে সে ফোনোর দাম হতো ৩০ হাজার টাকা।

তবে সংশ্লিষ্টরা এও বলছেন, দেশে মোবাইল তৈরির কথা বলা হলেও আসলে দেশে স্মার্টফোন সংযোজোন হচ্ছে। বিদেশ থেকে কাঁচামাল হিসেবে যন্ত্রাংশ আমদানি করে দেশীয় মোবাইল ফোন নির্মাতারা সংযোজন করে বাজারে ছাড়ছেন। তবে একাধিক মোবাইল ফোন নির্মাতা দাবি করেন তারা একটি মোবাইল ফোন তৈরির মোট যন্ত্রাংশের ৫০ শতাংশের বেশি দেশেই তৈরি করে থাকেন। ফলে তারা মোবাইল ফোন সংযোজন বলতে নারাজ। দেশে তৈরি এসব স্মার্টফোনে মানের দিক দিয়ে কোনও আপস হচ্ছে না বলেও তারা দাবি করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্যামসাং, ওয়ালটন, সিম্ফনি ও আইটেল দেশে গড়ে তোলা কারখানায় উৎপাদন শুরু করলেও পাইপ লাইনে রয়েছে উই সহ আরও কয়েকটি কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানগুলো শুরুতে ‘লো-এন্ড’-এর স্মার্টফোন তৈরি করলেও ধীরে ধীরে ‘হাই-এন্ড’ সেট তৈরি করবে বলে জানায়।

জানতে চাইলে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘আমি দায়িত্ব গ্রহণের কিছুদিন পরে বলেছিলাম এ বছর অন্তত ৫টি মোবাইল ফোন নির্মাতা কোম্পানি দেশেই মোবাইল তৈরি করবে। জানতে পেরেছি ৪টি প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে উৎপাদনে গেছে। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়েছে অন্তত মোবাইল ফোনে আমরা আর আমদানিকারক নির্ভর দেশ নই। আমরা এখন উৎপাদকের দেশ। দেশে বসেই আমরা এখন ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারছি।’

মোবাইল ফোনের গ্লোবাল ব্র্যান্ড স্যামসাং এর শাখা কারখানাও গড়ে উঠেছে দেশে। ফেয়ার গ্রুপের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এ কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে নরসিংদীতে।  কোম্পানিটি এরই মধ্যে উৎপাদনে চলে গেছে এবং এ বছর থেকে দেশে তৈরি হচ্ছে তাদের ফোরজি স্মার্টফোন।  ৫৮ হাজার বর্গফুট আয়তনের এই কারখানায় ব্যবহারকারীদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে স্মার্টফোন তৈরি করা হচ্ছে। এরই মধ্যে স্যামসাং ব্র্যান্ডের ৯টি মডেল এই কারখানায় তৈরি হয়েছে। যার মধ্যে বাজার মাতাচ্ছে জে ২ কোর এবং জে ৪ মডেল দুটি।

প্রসঙ্গত, স্যামসাং হচ্ছে দেশের প্রথম গ্লোবাল হ্যান্ডসেট কোম্পানি যারা বাংলাদেশে মোবাইল পোন তৈরির কারখানা স্থাপন করেছে। মূলত এই কারখানায় স্যামসাং মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ সংযোজন করা হচ্ছে। এই কারখানার মাধ্যমে দেশে প্রত্যক্ষভাবে পাঁচ শতাধিক এবং পরোক্ষভাবে আরও অনেক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে।

দেশে প্রথম মোবাইল ফোন তৈরি শুরু করে ওয়ালটন। সাভারে হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ এলাকা গড়ে তুলেছে ওয়ালটন। গত বছরের সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে সেখানেই তৈরি হচ্ছে ওয়ালটনের স্মার্টফোন।

‘ওয়ালটন এখন আর চীন থেকে স্মার্টফোন তৈরি করে আনছে না। দেশের কারখানায় তৈরি করছে স্মার্টফোন।’ মজুরিতে শ্রমিক পাওয়া যায়, আমদানি শুল্কও লাগে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মোবাইলের দাম কমেছে। সম্প্রতি ওয়ালটনের কারখানায় ৬ জিবি র‌্যামের ফোন তৈরি হয়েছে যার বাজার মূল্য ২৫ হাজার টাকা। চীন থেকে তৈরি করে আনলে এর দাম হতো ৩০ হাজার টাকা।

সিম্ফনি রাজধানীর সাভারে গড়ে তুলেছে তাদের মোবাইল সেটের কারখানা। সেখানে উৎপাদনও শুরু করেছে। দেশে তৈরি সেটটি (ই-৩০) বাজারেও এসেছে। সিম্ফনি এই একটি সেট তৈরির মধ্য দিয়ে উৎপাদকের খাতায় নাম তুলেছে। থ্রিজি এই স্মার্ট ফোনটি বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৯০ টাকায়। এই কারখানায় স্মার্টফোন ও ফিচার ফোন তৈরি হবে। সিম্ফনি সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি মোবাইল তৈরির জন্য গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্কেও জায়গা বরাদ্দ পেয়েছে। ৮ একরের বেশি জায়গায় প্রতিষ্ঠানটি বৃহৎ মোবাইল নির্মাণ কারখানা স্থাপন করবে।

অন্যদিকে ট্রানশান বাংলাদেশ লিমিটেডের রয়েছে দুটি মোবাইল ব্র্যান্ড। একটি টেকনো, অপরটি আইটেল। জানা গেছে, এ বছরেই দেশে মোবাইল উৎপাদনে গেছে ট্রানশান। বর্তমানে আইটেল মোবাইল তৈরি হচ্ছে ওই কারখানায়। শিগগিরই টেকনো মোবাইলের উৎপাদন শুরু হবে।

জানা গেছে, গাজীপুর চৌরাস্তার পাশে ভোগরায় টেকনোর কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। সেখানেই তৈরি হচ্ছে আইটেল মোবাইল।

এ বছর সাভারে ওয়ালটনের কারখানায় ল্যাপটপ নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করতে গিয়ে ওয়ালটন কারখানা এলাকাকে সব ধরনের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করায় হাইটেক ইন্ডাস্ট্রি জোন ঘোষণা করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। তিনি তখন ঘোষণা দেন, শুধু হাটটেক পার্কে নয় যেকোনও হাইটেক ইন্ডাস্ট্রি এলাকায় তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য (ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, চার্জার, ব্যাটারি ইত্যাদি) উৎপাদন করে রফতানি করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ১০ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হবে। নির্মাণ ও রফতানিকে উৎসাহিত করতে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two + six =

আরও পড়ুন