“নির্বাচনে এ ধরণের ফলাফল প্রসঙ্গে পার্বত্য অধিকার ফোরামের কেন্দ্রিয় সমন্বয়ক হাবিবুর রহমান হাবিব মানবজমিনকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত পাহাড়ি-বাঙ্গালীদের জিম্মি করে রেখেছে আঞ্চলিক সংগঠনগুলো। তাদের অত্যাচারের মাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠেছে। তারা আসলে এসব থেকে মুক্তি চায়। বিশেষ করে পাহাড়িরা এ নিয়ে সোচ্চার হয়ে উঠেছে।”
জোরদার হচ্ছে জাতীয রাজনীতি

পাহাড়ে দাপট কমছে আঞ্চলিক রাজনীতির

fec-image

স্থানীয়রা জানান, অতীতে পার্বত্য অঞ্চলের যে কোন নির্বাচনে সরাসরি হস্তক্ষেপ থাকতো এসব আঞ্চলিক দলগুলোর। তাদের সহায়তা ছাড়া সাধারন পাহাড়িদের সমর্থন পাওয়া যেতো না। এবার জাতীয় নির্বাচনে ঘটেছে উল্টো ঘটনা।

পাল্টে গেছে পাহাড়ের রাজনীতির ধারা। রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির রাজনীতির চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। জনপ্রিয়তা ও প্রভাব কমছে আঞ্চলিক দলগুলোর। বাড়ছে মুল ধারার রাজনীতির শক্তি। এতদিন পাহাড়ি সংগঠনগুলোর বাইরে আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা অন্য কোনো দলের প্রাধান্য বলতে গেলে ছিলই না।

আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্যে বলা চলে মূল ধারার রাজনীতি এখানে ছিল প্রায় অনুপস্থিত। খুনোখুনি, দমন, পীড়ন, চাঁদাবাজি আর অন্তর্দ্বন্ধের কারণে সম্প্রতি আঞ্চলিক সংগঠনগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে সাধারণ পাহাড়িরা।

পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চল ঘিরে জুম্মল্যান্ড আন্দোলনকে বাংলাদেশ বিরোধী বলে মনে করছেন তারা।

সাধারণ মানুষ এসব সংগঠন থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলায় বেপরোয়া হয়ে উঠছে আঞ্চলিক দলগুলো। তাই দল ত্যাগ করলেই হত্যা করা হচ্ছে, অপহরণ করা হচ্ছে। অনেকে আবার গুমের শিকার হচ্ছেন। পরিবারের সদস্যদের ওপর নেমে আসছে নির্মম নির্যাতন। বর্তমানে চারটি আঞ্চলিক সংগঠন বেশ সক্রিয়। এগুলো হচ্ছে জ্যেতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লামার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্রগ্রাম জনসংহতি সমিতি ( জেএসএস), জেএসএস(সংস্কার), ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রট ( ইউপিডিএফ) ও ইউপিডিএফ (সংস্কার)।

স্থানীয়রা জানান, অতীতে পার্বত্য অঞ্চলের যে কোন নির্বাচনে সরাসরি হস্তক্ষেপ থাকতো এসব আঞ্চলিক দলগুলোর। তাদের সহায়তা ছাড়া সাধারন পাহাড়িদের সমর্থন পাওয়া যেতো না। এবার জাতীয় নির্বাচনে ঘটেছে উল্টো ঘটনা।

তিন পার্বত্য জেলায় বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন আওয়ামী লীগ দলীয় এমপিরা। জাতীয় নির্বাচনে খাগড়াছড়ি ২৯৮ নং আসনে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা। তিনি ২ লাখ ৩৬ হাজার ১’শ ৫৬ ভোট পান তার নিকটতম প্রতিদ্বন্ধী ইউপিডিএফ সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী পান ৫৯ হাজার ২’শ ৫৭। বান্দরবানে মহাজোট মনোনীত প্রার্থী বীর বাহাদুর উ শৈ সিং ১ লাখ ৪২ হাজার ২২৩ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন।

রাঙামাটিতে জয়লাভ করেন আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী দীপংকর তালুকদার। জাতীয় নির্বাচনের পর উপজেলা নির্বাচনেও একই অবস্থা লক্ষ্য করা যায়। নির্বাচনে আঞ্চলিক দলগুলো জনসমর্থন পেতে ব্যর্থ হন। পার্বত্য ইতিহাসে এ ধরনের ফলাফল এবারই প্রথম বলে জানান স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলেন,আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর সন্ত্রাসী কার্যক্রমের কারণে পার্বত্যবাসী তাদের নির্বাচনে প্রত্যাখান করেছে। এ অঞ্চলের ২৫টি উপজেলায় নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের ১৭ জন জললাভ করেন। বিপরীতে জেএসএস (মুল) পায় ৩টি, জেএসএস (সংস্কার) পায় ৩টি, ইউপিডিএফ (মূল) পায় ১টি ও স্বতন্ত্র পদে একজন জয়লাভ করেন।

অন্যদিকে ভাইস চেয়ারম্যান (পুরুষ) এ আওয়ামী লীগের ১২ জন, জেএসএস(মূল) এর ৪ জন, ইউপিডিএফ (মূল) এর ২ জন, পার্বত্য নাগরিক পরিষদের ১ জন ও স্বতন্ত্র পদে ৬ জন জয়লাভ করেন। একইভাবে ভাইস চেয়ারম্যান (মহিলা) পদে আওয়ামী লীগের ১৪ জন, জেএসএস(মুল) এর ৩ জন, জেএসএস (সংস্কার) এর ১ জন, ইউপিডিএফ (মূল) এর ১ জন ও স্বতন্ত্র পদে ৬ জন জয়লাভ করেন। সবমিলিয়ে উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ৪৩ জন, জেএসএস(মুল) এর ১০ জন, জেএসএস(সংস্কার) এর ৪ জন, ইউপিডিএফ (মূল) এর ৪ জন,পার্বত্য নাগরিক পরিষদের ১ জন ও স্বতন্ত্র পদে ১৩ জন জয়লাভ করেন।

নির্বাচনে এ ধরণের ফলাফল প্রসঙ্গে পার্বত্য অধিকার ফোরামের কেন্দ্রিয় সমন্বয়ক হাবিবুর রহমান হাবিব মানবজমিনকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত পাহাড়ি-বাঙ্গালীদের জিম্মি করে রেখেছে আঞ্চলিক সংগঠনগুলো। তাদের অত্যাচারের মাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠেছে। তারা আসলে এসব থেকে মুক্তি চায়। বিশেষ করে পাহাড়িরা এ নিয়ে সোচ্চার হয়ে উঠেছে।

কারন বাঙ্গালীদের ওপর অত্যাচার করা হলে তারা অন্তত কথা বলতে পারে। প্রতিবাদ জানাতে পারে। কিন্তু পাহাড়িদের ওপর নির্যাতন করা হলে তারা এসব করতে পারে না। আঞ্চলিক সংগঠনগুলো তাদের ওপর বেশি মাত্রায় নির্যাতন ও চাঁদাবাজি করে। তিনি বলেন, এসব কারণে বাঙ্গালী-উপজাতীরা ওইসব দল থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন, মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

যদিও এসবের কারণে তাদের অনেককে চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। হাবিবুর রহমান হাবিব জানান, এরইমধ্যে অনেক উপজাতী নেতা মূল ধারার রাজনীতির মঞ্চে উঠে আঞ্চলিক দলগুলোর বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন। এমনকি সন্তু লারমার ফাঁসিও দাবি করেছেন। তিনি বলেন, মূল ধারার রাজনীতি এখানে পরিপুর্নভাবে প্রতিষ্ঠিত না হলে পাহাড় হয়ে উঠবে অশান্ত। ফলে শান্তিপুর্নভাবে বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়বে।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: আঞ্চলিক রাজনীতি, জাতীয রাজনীতি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 − 9 =

আরও পড়ুন