adv 728

পাহাড়ে প্রত্যাহারকৃত সেনা ক্যাম্প পুণঃস্থাপন না করলে ভয়াবহ পরিণতি    

fec-image

পাহাড়ে প্রতিযোগিতা দিয়ে চলছে সশস্ত্র গ্রুপগুলোর চাঁদাবাজি। এই সব সংগঠন সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিতে শান্তিপ্রিয় পার্বত্যবাসির জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।সন্ত্রাসীরা টোকেন কিংবা রশিদ দিয়ে নিয়মিত চাঁদা আদায় করছে। কৃষক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ী, সরকারী বেসরকারী অফিসিয়ালস কেউই সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজির হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না।

সন্ত্রাসীদের তৎপরতায় এ অঞ্চলের জীবনযাত্রা থমকে আছে। মূলত:পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্পগুলো পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করে নেয়ার ফলে সন্ত্রাসী সংগঠন গুলোর দৌরাত্ম্য আশংকাজনক ভাবে বাড়ছে বলে এ অঞ্চলের সাধারণ পাহাড়ি- বাঙ্গালীরা জানিয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির  স্বাক্ষরের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারী খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে গেরিলা নেতা সন্তু লারমার নেতৃত্বে অস্ত্র সমর্পন করে জনসংহতি সমিতির সদস্যরা। আর ঐদিনই প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ানে শত শত পতাকা উত্তোলন করে অস্ত্র সমর্পন অনুষ্ঠানকে ধিক্কার জানানো হয়।

তারই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকায় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্ণ স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবীতে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট( ইউপিডিএফ) গঠিত হয়। শুরু হয় সন্তু ও প্রসীতের  নেতৃত্বে দুই সংগঠনের আধিপত্য রক্ষার লড়াই। দ্বিমুখী পাল্টা-পাল্টি হামলা। ২০১০ সালে ১০ এপ্রিল জেএসএস ভেঙ্গে সুধা সিন্দু খীসার নেতৃত্বে গঠিত হয় জেএসএস(এমএন) গ্রুপ। এবার শুরু হয় ত্রিমুখী সংঘাত। কখনো জেএসএস- ইউপিডিএফ আবার কখনো জেএসএস(সন্তু)- জেএসএস(এমএন)। কখনো, কখনো নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে।

২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর ইউপিডিএফ ভেঙ্গে তপন কান্তি চাকমাকে আহবায়ক ও শ্যামল কান্তি চাকমা তরুকে সদস্য সচিব করে ১১ সদস্যের নতুন দল ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) দলের জন্ম হয়। এবার শুরু হয় চতুর্মুখী সংঘাত। এর ফলে চুক্তির পর গত ২১ বছরে সশস্ত্র গ্রুপগুলোর দ্বন্দ্বে  ৮ শতাধিক খুন হয় এবং ১৫শ’ গুম হয়েছে। এ ছাড়া এ সব সংগঠনগুলোর পৃথক অংগসংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন, যুব সমিতি, মহিলা সমিতি ও গণতান্ত্রিক যুবফোরামসহ একাধিক শাখার সংগঠন রয়েছে। সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর হাতে রয়েছে,এম-১৬, একে-৫৬, একে-৪৭, উজি গান, জি- থ্রি, মার্ক ফোর এলএমজি, এসএমজি ও রকেট ল্যাঞ্চারসহ আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পর সশস্ত্র পাহাড়ি সংগঠনগুলো এতো দিন নিজেদের মধ্যে সংঘাতে লিপ্ত হলেও গত ১৮ মার্চ রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে নির্বাচনের দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারী কর্মকর্তাদের উপর হামলা চালিয়ে প্রিজাইডিং অফিসারসহ ৭ জনকে হত্যা ও ৪০ জনের মত সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আহত করার ঘটনা ছিল সব চেয়ে বেশি আলোচিত।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিমত, পার্বত্য  চুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি বেড়েই চলেছে। চুক্তির আগে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন জেএসএসকে চাঁদা দিলে ব্যবসা- বাণিজ্য নির্বিঘ্নে করা যেতো। কিন্তু চুক্তির পর  পার্বত্য চট্টগ্রামের আনাচে- কানাচে এসব সংগঠনের নামে ব্যাপক চাঁদাবাজি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয সূত্রগুলো জানায়, এমন কোন সেক্টর নেই যেখান থেকে সন্ত্রাসীরা চাঁদা আদায় করছে না। তবে সব চেয়ে বেশি চাঁদা আদায় বনজ সম্পদ ও উন্নয়ন প্রকল্প থেকে। এছাড়াও যানবাহন, বিভিন্ন টোল কেন্দ্র, বাজার ডাক, ফসলের জমি, ঝুম চাষ, গবাদিপশু এমনকি চাকরিজীবিদেরও বার্ষিক চাঁদা দিতে হয়।

একটি সূত্র জানায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে চলাচলকারী প্রতিটি যানবাহনের মালিক, ব্যবসায়ি ও ঠিকাদাররা একাধিক সংগঠনকে ডিসেম্বর মাসে বাৎসরিক চাঁদা দিয়ে পরবর্তী বছরের টোকেন সংগ্রহ করতে হয়। সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন বিদেশী দাতা গোষ্ঠী ও সংস্থা এবং এনজিওদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছে। চাঁদা না দিলে অপহরণের শিকার হতে হয় ।

সূত্র মতে, ট্রাক, বাস বা কোষ্টার প্রতিটি বাৎসরিক চাঁদা  হিসাবে সংগঠনগুলোকে ৬ হাজার টাকা ৯ হাজার টাকা, জীপ ২ থেকে ৩ হাজার টাকা, বেবিটেক্সি ১ থেকে ১৫শ টাকা, রিক্সা ২শ ও ৩শ, ব্যবসায়িক পাশ ২০ থেকে ৩০  হাজার টাকা, বড় সাইজের বাঁশ প্রতি হাজার ৪শ থেকে ৬ শ, উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে স্কুল,কলেজ ও মাদ্রাসা ১০% থেকে ১৫%, রাস্তা, সেতু কালভার্ট ও বিল্ডিং জেএসএস ১০%, কড়ই কাঠ, গর্জন, চাপালিশ ও সেগুন প্রতি ঘনফুট ৪০ টাকা থেকে ৬০ টাকা, প্রতিটি শ্রেনীর গোলকাঠ ফুট প্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা, কলা, আদা হলুদ, সবজি, ধান ও চাউল ভর্তি প্রতি ট্রাক ৪শ থেকে ৬শ টাকা, প্রতিটি বাছুর ৫০ টাকা থেকে ৭৫টাকা, ষাড় বা গরু ১শ থেকে ১৫০ টাকা, ছাগল ৪০টাকা থেকে  ৫০ টাকা,রাইচ মিল ২০ হাজার থেকে  ৩০ হাজার টাকা করে আদায় করছে।

এছাড়াও কৃষক ও ঝুম চাষীদের একর হিসাব করে চাঁদা দিতে হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে যে সব উপজাতীয় চাকরিজীবী রয়েছে তাদেরকেও বার্ষিক হারে চাঁদা দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এর বাইরে রয়েছে, মৌসুমী চাঁদা। যেমন, বর্তমান বৈসাবি উপলক্ষে পাহাড়ে ব্যাপক চাঁদাবাজি চলছে। কিছুদিন আগে সমাপ্ত হওয়া সংসদ ও উপজেলা নির্বাচন উপলক্ষে নির্বাচনী খরচের জন্য বিপুল অংকের চাঁদা আদায় করা হয়েছে। আবার নির্বাচনে হেরে গিয়েও নির্বাচনী ক্ষয়ক্ষতি ওঠানের জন্য চিঠি দিয়ে নতুন করে চাঁদাবাজি করা হয়েছে। এভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতি বছর প্রায় ৩শত কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় হচ্ছে।

একটি সূত্র জানায়, সশস্ত্র সংগঠনগুলো বিভিন্ন পদ্ধতিতে চাঁদা আদায় করে থাকে। চাঁদা আদায় করার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের ২৬টি উপজেলা ছাড়াও ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে  তাদের  রয়েছে কালেক্টর। সূত্রটি আরো জানায়, চাঁদা আদায়ের জন্য পাহাড়িদের পাশাপাশি অনেক বাঙালিও রয়েছে। চাঁদা আদায়ের  ক্ষেত্রে কালেক্টররা একটা পার্সেন্ট পেয়ে থাকে। কালেক্টরা চাঁদা আদায় করার পর তাদের  অংশটা রেখে বাকীটা  কেন্দ্রীয় তহবিলে জমা দেয়।

অভিযোগ রয়েছে, ব্যবসায়ি ও ঠিকাররা স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনী অন্ধকারে রেখে সন্ত্রাসীদের কাছে গোপনে চাঁদা পৌঁছে দিয়ে থাকে। ফলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়ে উঠে না। এ প্রসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনৈক ব্যবসায়ীর দৃষ্টি আর্কষণ করা হলে নাম প্রকাশ না শর্তে জানান, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নিলে পরবর্তীতে অপহরণসহ  বড় ধরনের বিপদে পড়তে হয়। ফলে অনেকে নিরবে-নিভৃতে চাঁদা দিয়ে যাচ্ছে। তবে অপর এক ব্যবসায়ী বললেন ভিন্ন কথা। তার মতে, এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে ব্যবসায়ীদের।

সূত্র জানায়, পার্বত্য চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এ পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ২৪০টি নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে অরক্ষিত এ অঞ্চলের সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষ হয়ে পড়েছে নিরাপত্তাহীন। এ অবস্থায় প্রত্যাহার করা ক্যাম্পগুলো পূণঃস্থাপন করা না হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য আরো ভয়াবহ দিন অপেক্ষা করছে পর্যবেক্ষক মহলের এমন অভিমত।

পার্বত্য অধিকার ফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাইন উদ্দিন প্রত্যারকৃত সকল নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্প পুণঃস্থাপনের দাবী জানিয়ে বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্পগুলো প্রত্যাহার করে নেওয়া পাহাড় অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নেই। সর্বত্র সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম চলছে। এভাবে চলতে থাকলে পাহাড়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।

চাঁদাবাজির বিষয়ে ইউপিডিএিফ(প্রসীত) প্রচার ও প্রকাশনা শাখার প্রধান নিরণ চাকমার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি এ এব অভিযোগ প্রত্যাখান করে বলেন, সাধারণ পাহাড়িরা সংগঠন চালানোর জন্য স্বেচ্ছায় দান করে থাকেন। কারো কাছ থেকে জোর করে আদায় করা হয় না। একইভাবে চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, জেএসএস(এমএন) ও ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক।পক্ষান্তরে বহু চেষ্টা করেও জেএসএস(সন্তু) গ্রুপের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রশাসনের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, পাহাড়ে চাঁদাবাজি হচ্ছে এটা সবাই জানে। তবে কেউ অভিযোগ করছে না। যেখানে অভিযোগ পাচ্ছে প্রশাসন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছে। প্রশাসন চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের ধরতে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। ধরাও পড়ছে। সাধারণ মানুষ ঘুরে দাঁড়ালে এবং প্রশাসনকে সহযোগিতা করলে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীরা পালাতে বাধ্য হবে বলেও তিনি মত দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen + 16 =

আরও পড়ুন