বাঘাইছড়িতে আব্দুর রশিদের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় সন্দেহের তীর সরকারদলীয় নেতৃবৃন্দের দিকে

Follow Up

আলমগীর মানিক, রাঙামাটি:
শুক্রবার বাঘাইছড়ি পৌর এলাকায় সন্ত্রাসীদের ব্রাশ ফায়ারে গুলিবিদ্ধ আব্দুর রশিদ (৪০) ওরফে ধইন্যার অবস্থার আরো অবনতি হওয়ায় তাকে খাগড়াছড়ি জেনারেল হাসপাতাল থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। এদিকে আব্দুর রশিদের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার জের ধরে বাঘাইছড়িতে চলছে নানা সমীকরণ। এই ঘটনায় সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে জেএসএস’র দুই গ্রুপ ও ইউপিডিএফএর একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। আর গুলিবিদ্ধ আব্দুর রশিদ তার গুলিবিদ্ধ হওয়ার পিছনে উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও রাঙামাটি জেলা পরিষদ সদস্য বৃষকেতু চাকমার হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে।

স্থানীয় একাধিক সূত্র এবং হাসপাতালে উপস্থিত বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের বক্তব্য থেকে জানা গেছে, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরপরই শুক্রবার বাঘাইছড়ি থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থাকার সময় আব্দুর রশিদ তার গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি রাঙামাটি জেলা পরিষদ সদস্য বৃষকেতু চাকমা জানতেন বলে জানান। সে বিষয়টি হাসপাতালে উপস্থিত লোকজনের সামনে খুলে বলার সময় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা জমির উদ্দিন তার মুখ চেপে ধরে বিষয়টি ধামা-চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ করে স্থানীয়রা। তারা দাবি করেন, জমির বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও আব্দুর রশিদের মুখের কথা এখন বাঘাইছড়ি পৌর এলাকায় সকলের মুখে মুখে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আব্দুর রশিদের সাথে একসময় ইউপিডিএফের বেশ সখ্যতা ছিল। রশিদ তাদের পক্ষ হয়ে বেশ কিছু কাজ করে দিতেন। কিন্তু ২০১২ সালের অক্টোবর মাসের ২৯ তারিখে বাঘাইছড়ি উপজেলা সদরের চৌমূহনী চত্ত্বরে ইউপিডিএফ নেতা ডা: সত্যরঞ্জন চাকমাকে গুলি করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার সঙ্গে জেলা পরিষদ সদস্য বৃষকেতু চাকমার সাথে বাক-বিতন্ডা শুরু হয় বলে জানা গেছে। স্থানীয় বেশ কয়েকটি সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানাগেছে, ডা: সত্য রঞ্জন চাকমাকে গুলি করার ঘটনায় সন্তু লারমা সমর্থিত বেশ ক’জন কে আসামী করে বাঘাইছড়ি থানায় একটি মামলা করা হয়। যার নাম্বার-৩ তারিখ ২৯/১০/২০১২ ইং। এই মামলার সাক্ষী ছিলেন আব্দুর রশিদ ওরফে ধইন্যা। তাই ধইন্যার উপর অব্যাহতভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে, যেন সে এই মামলায় কোনো ধরনের সাক্ষী না দেয়। আর এই কাজে তাকে চাপ প্রয়োগ করতেন রাঙামাটি জেলা পরিষদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বৃষকেতু চাকমাসহ যুবলীগের অপর একজন নেতা। যার ফলশ্রুতিতে গত চারদিন আগে বৃষকেতুসহ বেশ ক’জন নেতা সাজেক ইউনিয়নে একটি কেয়াংয়ে যাওয়ার সময় গাড়িতে থাকা আব্দুর রশিদ ওরফে ধইন্যাকে অশালীন ভাষায় গালি-গালাজ করেন এবং ধইন্যাকে এক প্রকার হুমকি-ধামকিও দেন বলে জানা গেছে দলীয় সূত্রে।

এরই এক পর্যায়ে বাঘাইছড়ির তুলাবান নামক স্থানে তাকে নামিয়েও দেন উপজেলা আওয়ামী লীগের এই কর্ণধার। এসময় গাড়িতে বেশ ক’জন নেতা ও সুশীল ব্যাক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের কাছ থেকেও এই ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। এই ঘটনায় স্থানীয় সরকার দলীয় নেতাদের কাছে বিষয়টি অবহিত করেন আব্দুর রশিদ। পরে এই ঘটনার জেরে শনিবার বিকাল তিনটায় উপজেলা পরিষদ রেষ্ট হাউজে একটি বৈঠক হওয়ার কথাও ছিলো। কিন্তু পূর্ব নির্ধারিত বৈঠকে উপস্থিত না থেকে উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদ সদস্য বৃষকেতু চাকমা রাঙামাটি শহরে চলে আসেন বলে জানাগেছে দলীয় সূত্রে।

এদিকে শুক্রবার বিকেলে বৈঠকে উপস্থিত না হওয়ায় এবং রাত সাড়ে নয়টায় আব্দুর রশিদ ওরফে ধইন্যাকে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলির ঘটনায় গুরুত্বর আহত ধইন্যা বাঘাইছড়ি হাসপাতালের বেডে শুয়ে কাতরাতে কাতরাতে তাকে গুলি করার ঘটনায় জেলা পরিষদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি বৃষকেতু চাকমা আগে থেকেই জানতেন বলে বলতে থাকলে উপজেলা যুবলীগের একজন নেতা ধইন্যাকে ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দেন বলে হাসপাতালে ঘটনার সময় উপস্থিত বেশ’কজন প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে জানাগেছে।

এদিকে আব্দুর রশিদ ওরফে ধইন্যাকে গুলি করে আহতের প্রতিবাদে শনিবার বিকাল ৩.৫০ টার সময় জনসংহতি সমিতি( এমএন লারমা)বাঘাইছড়ি থানা শাখার উদ্দোগে উপজলোর মুক্ত মঞ্চে এক প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্টিত হয়েছে। এ সমাবেশে প্রধান অথিতি ছিলেন জেএসএস রাঙামাটি জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক চিত্র বিকাশ চাকমা। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বিপুলেশ্বর চাকমা।

বক্তারা ঘটনার তীব্র্র নিন্দা জানান এবং দোষী ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবী জানিয়ে তিনদফা দাবিসহ আগামী ৪৮ ঘন্টার মধ্যে এই ঘটনায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে বাঘাইছড়িতে অনিদিষ্টকালের জন্যে সড়ক ও নৌ-পথ অবরোধসহ কঠোর কমসুচি গ্রহন করা হবে বলে হুমকি দিয়েছে এমএন লারমা সমর্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতি ( জেএসএস)।
অপরদিকে বাঘাইছড়িতে সাম্প্রতিক এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে রোববার বাঘাইছড়ি বিজিবি জোনে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানাগেছে।

উল্লেখ্য, রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলাধীন বাবু পাড়া এলাকায় উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের গুলিতে এক বাঙ্গালী আহত হয়েছে। শুক্রবার রাত ১০টার সময় এই ঘটনা ঘটে। আহত ব্যক্তির নাম আব্দুর রশিদ (৪০) ওরফে ধইন্যা। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাঘাইছড়ি পৌর মেয়রের বাসভবন সংলগ্ন এলাকা দিয়ে নিজ বসতঘরে যাওয়ার সময় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা অর্তকিতভাবে হামলা চালায় আব্দুর রশিদের উপর। এসময় সন্ত্রাসীদের ব্রাশ ফায়ারে আব্দুর রশিদ গুরুত্বর আহত হয়। এসময় তার শরীরে গুলি লাগে। পরে স্থানীয়রা রশিদকে উদ্ধার করে বাঘাইছড়ি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে খাগড়াছড়ি জেনারেল হাসপাতালে রেফার্ড করেছেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ইউপিডিএফ, উপজাতি, খুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × 3 =

আরও পড়ুন