ভারী অস্ত্রের মজুদ গড়ছে আঞ্চলিক দলগুলো

fec-image

এক দল পাহাড়ের ওপরে ছিল। আরেকটি দল সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে গুলি চালাতে থাকে গাড়িগুলো লক্ষ্য করে। প্রায় ১৫ মিনিট ধরে বিরামহীন গুলি চলে। বড় একটি গাছের আড়ালে ছিলাম বলে বেঁচে গেছি।

চোখের সামনে ঘটে যাওয়া সে দৃশ্য এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। সিনেমায় যেমন বড় বড় অস্ত্র দেখি একবার মাত্র ট্রিগারে চাপ দিলে গুলি বেরোতেই থাকে, ঠিক সেই রকম অস্ত্র।’ কথাগুলো বলছিলেন গত ১৮ এপ্রিল রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে সন্ত্রাসী হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া শান্ত চাকমা।

ওই হামলায় নিহত হন ৮ জন, আহত হয়েছেন ২৭ জন। নিহতরা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করে ফিরছিলেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এর আগের দিন ১৭ এপ্রিল সেনা অভিযানে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের ওপারে বালুখালী ইউনিয়নের কান্দাইরমুখ এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গুলি। এর মধ্যে ৭.৬২ মিমি. এসএমজি, অ্যাসল্ট রাইফেল, উজিসহ কয়েকটি ভারী অস্ত্রও ছিল।

এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য তিন জেলায় সেনা অভিযানে উদ্ধার হয়েছে জার্মানির তৈরি এমকে-১১, এইচকে-৩৩, রাশিয়ার তৈরি জি-৩, একে-৪৭, এম-১৬ রাইফেল, নাইনএমএম পিস্তল, চায়নিজ সাব-মেশিনগানসহ অত্যাধুনিক কিছু ভারী অস্ত্র। চায়নিজ সাব-মেশিনগান মিয়ানমার সেনাবাহিনী নিয়মিত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।

কিভাবে ওই অস্ত্র দেশে ঢুকছে—জানতে চাইলে পার্বত্য জেলাগুলোয় কর্মরত গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মিয়ানমার ও ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর মাধ্যমে অস্ত্র কিনছে পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র দলগুলো।

খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানের সঙ্গে ভারতের ২৮১ কিলোমিটার এবং মিয়ানমারের ১৯৮ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। ভারত সীমান্তের ১৩০ কিলোমিটার সুরক্ষিত করা হলেও এখনো অরক্ষিত ১৫১ কিলোমিটার। অন্যদিকে মিয়ানমার সীমান্তের ১৩৩ কিলোমিটার অরক্ষিত এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকা। বর্তমানে মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে বেশি ভারী অস্ত্র ঢুকছে বলে গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানিয়েছে।

পার্বত্য তিন জেলায় জেএসএস- সন্তু লারমা, জেএসএস ( এমএন লারমা), ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক বা বর্মা) সক্রিয়।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, চারটি দলের সঙ্গেই মিয়ানমারের বিদ্রোহী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী সাতটি সংগঠনের সখ্য রয়েছে। বর্তমানে মিয়ানমারের ওই সব সংগঠনের মাধ্যমেই অস্ত্র কিনছে তারা। মিয়ানমারের এসব সংগঠন হলো আরাকান আর্মি ( এএ), আরাকান লিবারেশন পার্টি (এএলপি), আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরসা), ন্যাশনাল ইউনাইটেড পার্টি অব আরাকান (এনইউএ), পিপলস পার্টি অব আরাকান (পিপিএ), আরাকান রোহিঙ্গা ইসলামী ফ্রন্ট (এআরআইএফ) ও ডেমোক্রেটিক পার্টি অব আরাকান (ডিপিএ)।

গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ইউপিডিএফ সম্প্রতি নতুন করে ‘স্বাধীন জুম ল্যান্ড’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে। তাদের সামরিক শাখার তিনটি কম্পানি রয়েছে। এগুলো হলো ঈগল (বাঘাইছড়ি), ড্রাগন (রাঙামাটি) ও জাগুয়ার (খাগড়াছড়ি)।

চলতি বছর মার্চ মাসে চট্টগ্রাম শহরের চান্দগাঁ এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে গ্রেপ্তার হয় চীর জ্যোতি চাকমা ও মিন্টু চাকমা নামের দুই সশস্ত্র যুবক। তারা দুজনই জেএসএসের ( এমএন লারমা) সদস্য।

পার্বত্য জেলায় কর্মরত যৌথ বাহিনীর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘পাহাড়ি সশস্ত্র সংগঠনগুলো ভারী অস্ত্রের মজুদ গড়ে তুলছে। সীমান্তের ফাঁকফোকর গলিয়েই ওই অস্ত্র আসছে—এটা ঠিক। আমরা নতুনভাবে চেকপোস্ট বসিয়ে নজরদারি করছি, যাতে সন্ত্রাসীরা অস্ত্র আনার সুযোগ না পায়।’

খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার আহমেদুজ্জামান বলেন, ‘পাহাড়ি সশস্ত্র সংগঠনগুলো বিভিন্নভাবে অস্ত্র সংগ্রহ করে। সীমান্ত দিয়ে যাতে অস্ত্র ঢুকতে না পারে সে জন্য চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।

লেখক: সাংবাদিক, সূত্র: কালের কণ্ঠ

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: অস্ত্র, মজুদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fourteen + two =

আরও পড়ুন