“যতটুকু মনে আছে সম্ভবত আমার শরীরের উপর ৪টা মৃত দেহ পড়েছিল। আহতদের গোঙানির শব্দে, আর্তনাদে তখনকার পরিস্থিতি ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। গাড়ির মেঝেতে পড়ে একটা দৃশ্য চোখে এলো, সেটা হচ্ছে তৈয়ব মাস্টারের লাশ। তার গায়ে গুলি লাগার পর তার মাথাটা গাড়ির ফাঁক দিয়ে বাহিরে ঝুলে ছিল, তাতে গাড়ির লোহার সাথে আঘাত লাগতেছিল। আমি যতটুকু পেরেছি চেষ্টা করেছি যাতে করে তার মাথাটা বাহিরে না থাকে। আমার এক হাতে গুলি লেগেছিল, আর অন্য হাতে তার পাঞ্জাবীটা ধরে আস্তে আস্তে টান দিয়ে মাথাটা গাড়ির ভিতরে নিয়ে এসেছিলাম। এভাবেই তিনি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়েছিলেন প্রায় দু-থেকে তিন মিনিট!”
কেমন ছিলো সেই ভয়ঙ্কর মূহুর্তগুলি

ভুক্তভোগীর বয়ানে বাঘাইছড়িতে নির্বাচনী কমকর্তাদের উপর হামলার হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা

fec-image

১৮ মার্চ, ২০১৯। ৫ম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দায়িত্ব পালনে আরো অনেকের সাথে যোগ দিয়েছিলেন মোহাম্মদ এনামুল হক। সারাদিন ভোটিং কার্যক্রম শেষে ফেরার পথে নয় মাইল নামক স্থানে উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের এমবুশে পড়ে তাদের বহনকারী তিনটি গাড়ি। ব্রাশফায়ারে নিহত হয় ৮জন, আহত ১৯জন। এ ঘটনায় এনামুল নিজেও গুলিবিদ্ধ হয়। চারটি লাশে ঢাকা পড়া তার আহত দেহটি বহন করে নিয়ে আসে চান্দের গাড়ি। পার্বত্যনিউজের অনুরোধে এনামুল ভয়ঙ্কর সেই হামলা, মর্মবিদারী সেই ঘটনার কথা লিখে পাঠিয়েছেন।

সেদিন ছিল ১৮মে,২০১৯। দিনটা ছিল সোমবার। বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। আমিসহ আমার সাথে আরো পুলিশ ছিল চারজন,সর্বমোট আমরা পুলিশ ছিলাম পাঁচজন। সাথে প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার।

তার মধ্যে থেকে পোলিং অফিসার হিসাবে দায়িত্বে ছিলেন ঘটনারস্থলে মারা যাওয়া প্রাইমারী স্কুলের সহকারী শিক্ষক তৈয়ব এবং আমির হোসেন। আমির হোসেন সম্ভবত সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার হিসাবে দায়িত্বে ছিলেন।

আমাদের সবারই নির্বাচনী দায়িত্ব ছিল কংলাক সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সকাল ৮ ঘটিকায় নিয়ম মোতাবেক সেদিন সকালে কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। যথাযথ নিয়মে ও সুশৃঙ্খলভাবে ভোট দিতে থাকেন স্থানীয় ভোটাররা। আনুমানিক এক ঘন্টার মত ভোট গ্রহণ চলেছিল, এরপর হঠাৎ একপক্ষ ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। ভোট বর্জনের ঘোষণার পর আর কোনো ভোটার কেন্দ্রে ভোট দেয়নি কিংবা কেউ ভোট দিতে আসে নাই। তো আমরা যারা নির্বাচনের দায়িত্বে ছিলাম, তারা প্রত্যেকেই নিষ্ঠার সাথে সারাদিন কেন্দ্রে বসে থাকি।

বিকাল ৪ টার সময় ভোট গ্রহণের সময় শেষ হলে, কেন্দ্রে দায়িত্বে থাকা ভোটিং অফিসারের নির্দেশনা মোতাবেক ভোট গণনা শুরু করেন। ভোট গণনা শেষে আমাদের কেন্দ্রে দেখা যায় মোট প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা ৯৯ টি। যার মধ্যে দোয়াত কলম একা পায় ৯৮টি ভোট।আরেকটি ভোট বাতিল বলে গণ্য হয়। বাকি ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান কে কত ভোট পায় সে হিসাবটুকু আমার মনে নেই।

যাইহোক, প্রাপ্ত ভোটের হিসাব ও বাকি ব্যালেট পেপার, ব্যাক্স ও অন্যান্য নির্বাচনী সরঞ্জাম নিয়ে আমরা রওনা করি বাঘাইছড়ি উপজেলার উদ্দেশে। আমরা যখন মাচালং পৌঁছায়, সেখানে গিয়ে দেখি মাচালং কেন্দ্রের গাড়িটি আমাদের জন্য উপেক্ষা করছিল, আমরা পৌঁছা মাত্রই মাচালং ও আমাদের কংলাক কেন্দ্রের গাড়ি, সেনাবাহিনীর পেট্রলগাড়িসহ মোট তিনটি গাড়ি এক সাথে রওনা করি উপজেলার উদ্দেশে।

পথিমধ্যে বাঘাইহাট পৌঁছানোর পর, আমরা আবার অপেক্ষা করেছিলাম, বাঘাইহাট কেন্দ্রের গাড়ির জন্য। বাঘাইহাট কেন্দ্রে ভোট গণনা দেরি হওয়াতে আমাদের তাদের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল। তাদের যখন ভোট গণনা শেষ হল, তখন আমরা মাচালং, কংলাক, এবং বাঘাইহাট মোট তিন কেন্দ্রের গাড়ি এক সাথে রওনা করি বাঘাইছড়ি উপজেলার উদ্দেশে। আমাদের সাথে ছিল বিজিবির স্কর্ট পার্টি। কেননা ইতোমধ্যে সেনাবাহিনী বিজিবি স্কর্ট পার্টিকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছে। এ সময় বিজিবি’র পাহারাতে আমরা রওনা করি।

মোহাম্মদ এনামুল হক

 

যেতে যেতে সন্ধ্যা নেমে এলো। কালো আঁধারে সব কিছুই অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। কে জানত, পাহাড়ী রাস্তার অন্ধকারের মত তৈয়ব, আমিরসহ ৮ জনের জীবন প্রদীপটাও এই অন্ধকারে মিলিয়ে হারিয়ে যাবে। নিজের কাছে ভাবতেও অবাক লাগে, সারাদিন এক সাথে ছিলাম, একে অপরের সাথে কত হাসি, ঠাট্টা, এক সাথে রান্না, এক সাথে খাওয়া, কত মধুর সময় কাটিয়েছি। সব মিলিয়ে সবার সাথেই একটা আন্তরিকতা হয়ে গিয়েছিল। একজনের প্রতি আরেকজনের মায়া জন্মেছিল বুন্ধুত্বসুলভ।

হামলার ঠিক আগ মুহুর্তে কেন্দ্রের গাড়িগুলো সারিসারিভাবে একটার পেছনে আরেকটা সিরিয়ালে চলতে থাকে! আমাদের সামনে ছিল বিজিবি’র প্রটেকশন পার্টি।পথিমধ্যে আমি, তৈয়ব, এস.আই রজ্জব, আমরা তিনজন বাঘাইহাটে এক রেস্টোরেন্টে চা নাস্তা করে গাড়িতে উঠি। অবশ্য শত চেষ্টা করেও নাস্তার বিলটা দিতে পারি নাই। শেষমেষ তৈয়ব মাস্টারই বিলটা প্রদান করেন। এরপর রওনা করি বাঘাইছড়ি উপজেলার উদ্দেশে। গাড়ির মধ্যে বসে বসে একে অপরের সাথে আলাপ করছিলাম, ভোটের বিষয় নিয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় চলছিল। আমার ডান পাশে বসা ছিল তৈয়ব মাস্টার, পিছনে ছিল ফুল কুমারী, আর বাকি মানুষগুলোর চেহারা মনে নেই।

যখন সন্ত্রাসীরা হামলা করে হঠাৎ বিকট শব্দের আওয়াজ হয়। বৈদ্যুতিক সকের মত পুরো গাড়ি ঝির ঝির করে কাঁপতে শুরু করতে লাগলো! শিলাবৃষ্টির মত গুলি পড়তে লাগলো, কারো হাতে, কারো পায়ে, কারো পিঠে, কারো মাথায়, কিংবা কারো বুকে, পেটে; বিভিন্ন জায়গাতে গুলি লাগতে শুরু করল। রাতের অন্ধকার হওয়াতে আমরা সন্ত্রাসীদের অবস্থান জানতে পারি নাই। যতটুকু বুঝতে পেরেছি, তারা রাস্তার পাশ থেকেই গুলি করছিল।

হঠাৎ একটা ঝড়ে সব কিছুই নিঃশেষ করে দিল, কেড়ে নিল তৈয়ব, আমির হোসেনসহ আরো অনেকের প্রাণ পাখিটা। আর আহত অবস্থায় গাড়িতে পড়ে রই আমিসহ আরো অনেকে। এক মুহুর্তেই পাহাড়ী রাস্তা, শীতল বাতাস, পাখির ডাক, সব কিছুর অনুভূতি শেষ করে দিল সন্ত্রাসীরা ব্রাশ ফায়ারে। কে জানত, সন্ত্রাসীরা আগে থেকেই ওঁতপেতে বসে ছিল নয় মাইল এলাকা নামক স্থানে। নয় মাইল এলাকায় পৌঁছা মাত্রই একে একে ব্রাশ ফায়ার করতে শুরু করে সন্ত্রাসীরা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব কিছু শেষ করে দেয় সন্ত্রাসীরা। গাড়িতে পড়ে থাকে তরতাজা মানুষের নিথর দেহগুলো।

আহ! কি নির্মম, কি নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড! রক্তমাখা শরীর, চোখের পানি, এখনো কানে বেজে উঠে ফুল কুমারীর চিৎকার, ছোট ছেলে আল-আমিনের কান্না- ‘ও আব্বা, ও আম্মা’, প্রিজাইডিং অফিসারের আর্তনাদ!

সবার কন্ঠে একই শব্দ, ‘ও আল্লাহ, আমাদেরকে রক্ষা কর, আমাদেরকে রক্ষা কর’। সেদিন আমাদের কান্না, মর্মভেদী চিৎকার, আহাজারি দেখে পাহাড়ী রাস্তা, গাছ গাছালী, পাখি, জীবজন্তু পর্যন্ত হয়তো আর্তনাদ করেছিল, আর দোয়া করেছিল, ‘হে আল্লাহ ওনাদের সবাইকে তুমি তোমার কুদরতী হাতে রক্ষা কর’। আমাদের অসহায় কান্না দেখে, সেদিন কেউ স্থির থাকতে পারে নাই। কেবল স্থির ছিল পাষণ্ড নিষ্ঠুর সন্ত্রাসীরা।

একের পর এক ব্রাশ ফায়ার করছিল তারা। যার দরুন কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুরো গাড়ি রক্তাক্ত! মানুষগুলো একে অপরের উপর কেউ কাত হয়ে, কেউবা শুয়ে গাড়ির উপর পরে রয়েছে! যতটুকু মনে আছে সম্ভবত আমার শরীরের উপর ৪টা মৃত দেহ পড়েছিল। আহতদের গোঙানির শব্দে, আর্তনাদে তখনকার পরিস্থিতি ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। গাড়ির মেঝেতে পড়ে একটা দৃশ্য চোখে এলো, সেটা হচ্ছে তৈয়ব মাস্টারের লাশ। তার গায়ে গুলি লাগার পর তার মাথাটা গাড়ির ফাঁক দিয়ে বাহিরে ঝুলে ছিল, তাতে গাড়ির লোহার সাথে আঘাত লাগতেছিল। আমি যতটুকু পেরেছি চেষ্টা করেছি যাতে করে তার মাথাটা বাহিরে না থাকে। আমার এক হাতে গুলি লেগেছিল, আর অন্য হাতে তার পাঞ্জাবীটা ধরে আস্তে আস্তে টান দিয়ে মাথাটা গাড়ির ভিতরে নিয়ে এসেছিলাম। এভাবেই তিনি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়েছিলেন প্রায় দু-থেকে তিন মিনিট!

এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের কথা মনে হলে আজো গাঁ সিউরে ওঠে। এখনো কানে বাজে তৈয়বের শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগে বলে যাওয়া কথা, ‘ভাই, আমার বাচ্চাগুলোর জন্য দোয়া করিয়েন এবং তাদের আম্মুকে বইলেন তাদের ভাল রাখতে’! এই কথা বলার সাথে সাথে চলে যান না ফেরার দেশে।

ওনার বাচ্চা গুলিকে আজো পর্যন্ত বলা হয়নি তাদের বাপের বলে যাওয়া শেষ কথা! জানি না তারা কেমন আছে, কোথায় আছে! এ লেখার মাধ্যমে তৈয়বের স্ত্রী ও সন্তানকে তাদের স্বামী ও পিতার শেষ কথা জানাতে চাই। দোয়া করি, আল্লাহ যেন ওনার স্ত্রী বাচ্চাদের সর্বদায় ভাল রাখেন। আর তিনিসহ ঘটনায় নিহত প্রত্যেকেরই যেন আল্লাহ জান্নাতবাসী করেন। আর আমরা যারা এখনো গুলির আঘাত নিয়ে বেঁচে আছি, তাদের প্রত্যেকেই যেন সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারি, সবার কাছে দোয়া চাই। আর দোয়া করি, আর কাউকে যাতে কোনোদিন এভাবে আমার মত এমন ঘটনার সম্মুখীন না হতে হয়। বাংলাদেশ যেন হয় শান্তি ও কল্যাণময়।

একদিক দিয়ে সন্ত্রাসীরা গুলি করছিল, অন্যদিক দিয়ে গাড়ির ড্রাইভারগুলো গাড়ি চালাতেই ছিল। ড্রাইভারগুলো চরম সাহসী হওয়াতে গুলি করার পরেও গাড়ি গুলো টেনে নিয়ে আসছিল। আমাদের বেঁচে যাওয়ার পিছনে ড্রাইভারগুলোর অবদান অনেক।

পরবর্তীতে আমাদের গাড়ি বাঘাইছড়ি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় আমরা যারা আহত হয়েছিলাম, তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। এর কিছুক্ষণ পর সেনাবাহিনী তত্ত্বাবধানে হেলিকপ্টারযোগে আমাদেরকে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে যাওয়া হয়।

সেখানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও জিওসি মহোদয় স্যারের তত্ত্বাবধানে আমাদের চিকিৎসা করানো হয়। হামলার পরবর্তী চিকিৎসা থেকে নিয়ে যাবতীয় কার্যক্রমে যাদের অবদান ছিল, তাদের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার, ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি, পুলিশ সুপার রাঙ্গামাটি, সেনাবাহিনী বাঘাইছড়ি জোন কমাণ্ডার, বিজিবি জোন কমান্ডার ও স্থানীয় প্রশাসন। তাদের প্রত্যেকের কাছে সারাজীবন আমি কৃতজ্ঞ থাকব। যতদিন বেঁচে থাকি তাদের প্রতি আলাদা একটা সম্মান সবসময় থাকবে।

যতদিন বেঁচে থাকি, এই নিষ্ঠুরতম হত্যাকাণ্ডের কথা সারাজীবন মনে থাকবে। আর পাহাড়ী রাস্তায় চলতে ফিরতে বারবার মনের পর্দায় ভয়, শঙ্কা নাড়া দিয়ে যাবে, এই বুঝি আবার আক্রমণ করছে! চোখের সামনে এতোগুলো মানুষের লাশ, রক্তাক্ত দেহ, প্রতিনিয়তই আমাকে কাঁপুনি দিয়ে যায়।

পাহাড়ে এ ধরণের ঘটনা আর দেখতে চাই না। পাহাড়ী এলাকা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান হোক শান্তিময়। সন্ত্রাসীদের স্থান যেন এই মাটিতে না হয়, এটাই হোক সবার কাম্য।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seven + 15 =

আরও পড়ুন