মাটির পাহাড়ে বিমানবন্দর হবে না!

সৈয়দ ইবনে রহমত::

মাটির পাহাড়ে এভাবে বিমানবন্দর করা যাবে না! কিছু সমস্যা আছে, আমাদের প্রচুর রাস্তাঘাট করে দিতে হবে। কথাগুলো বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বুধবার (৬ ফেব্রুয়ারি) সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাঙামাটির ১৩২/৩৩ কেভি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র উদ্বোধনকালে তিনি এসব কথা বলেন।  ভিডিও কনফারেন্স অনুষ্ঠানে প্রসঙ্গটি তুলেছিলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী এবং রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার।  দীপংকর তালুকদার পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্পের বিকাশ এবং দেশি-বিদেশি পর্যটকদের যাতায়াতের সুবিধার কথা বিবেচনা করে রাঙামাটিতে একটি ছোটখাট বিমানবন্দর করার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকে প্রস্তাব দেন।  তিনি বলেন, অন্তত ১০ সিট বা ২০ সিটের ছোট বিমান ওঠানামা করার মতো একটি বিমানবন্দর করে দিলে পর্যটন এলাকা হিসেবে এ এলকার গুরুত্ব বেড়ে যাবে।  এর পরিপ্রেক্ষিতেই প্রধানমন্ত্রী উপর্যুক্ত যুক্তি দিয়ে প্রস্তাবটি নাকচ করে দেন।  প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যে কেউ কেউ হতাশ।  তারপরও আশা ছাড়ছি না আমরা।  কারণটা বলার আগে প্রস্তাবটির পেছনের কিছু কথা তুলে দরকার।

২০১৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পাক্ষিক পার্বত্যনিউজের সংখ্যাটি পর্যটন সংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল। সে সংখ্যায় প্রকাশিত ‘পর্যটন পরিকল্পনার লক্ষ্য হোক সাজেক থেকে সেন্টমার্টিন, শীর্ষক লেখায় পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে গিয়ে বলেছিলাম, “কিছু মানুষ আছে, যাদের কাছে পথঘাটের কষ্টের বিষয়টি খুব একটা পাত্তা পায় না। থাকা-খাওয়ার জন্যও দরকার পড়ে না আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন কোনো হোটেল কিংবা রেস্তোরাঁর। তারা বরং পায়ে হেঁটেই দিনের পর দিন ভ্রমণ করতে পছন্দ করে। তাদের ব্যাপারটি আলাদা, তবে বেশিরভাগের কাছেই ভ্রমণ আনন্দ-বিনোদনের বিষয়। তাই যেখানে ভ্রমণের সাথে আরাম-আয়েশের যোগ আছে তারা সেখানেই যেতে চান।সে ক্ষেত্রে আমাদের পার্বত্য তিন জেলার যাতায়াত ব্যবস্থা খুব একটা অনুকূল না। রাজধানী ঢাকা থেকে রওনা হলে কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি কিংবা খাগড়াছড়ি যেতে ১২/১৩ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। দূরত্ব ছাড়াও এ ক্ষেত্রে বড় সমস্যা যানজট। বেড়াতে গিয়ে যানজটের যন্ত্রণা পোহানো সত্যিই বিরক্তিকর। তাই যাদের সামর্থ্য আছে তারা এটা এড়িয়ে বেড়াতে পছন্দ করেন আকাশ পথে। কক্সবাজারে একটি অভ্যন্তরীণ বিমান বন্দর আছে, কিন্তু তিন পার্বত্য জেলার কোথাও সে সুযোগ নেই। সমতল ভূমির সংকটের কারণে হয়তো রাঙ্গামাটি এবং বান্দরবানে বিমান বন্দর নির্মাণ কিছুটা কঠিন, তবে খাগড়াছড়িতে সহজেই একটি অভ্যন্তরীণ বিমান বন্দর নির্মাণের জায়গা পাওয়া সম্ভব। সে পরিকল্পনা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের এগুনো দরকার।এটা পার্বত্যাঞ্চলের পর্যটন সম্ভাবনাকে যেমন বহুগুণে বাড়িয়ে দেবে, তেমনি অন্যান্য প্রয়োজনেও কাজে আসবে। অন্যদিকে কক্সবাজার বিমান বন্দরটিকেও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা দরকার।”

লেখাটি পরে (৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮) পার্বত্যনিউজের অনলাইন ভার্সনে প্রকাশিত হলে গুরুত্বপূর্ণ অনেক ব্যক্তিই ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন প্রস্তাবটি দেয়ার কারণে। শুধু তাই নয়, পার্বত্যনিউজের ফেসবুক পেইজে শেয়ার করা হলে সেখানে অনেকে মন্তব্য করে উৎসাহ দিয়েছেন। কেউ কেউ সমালোচনাও করেছেন, যেমনটা হয়ে থাকে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি উন্নয়নমূলক কাজের বিরোধিতা করে। সেখানে তোফাজ্জল আহমেদ নামের একজনের মতামতকে খুবই গুরুত্বসহকারে দেখা যেতে পারে। তিনি লিখেছেন, ‘পর্যটন বিকাশে বিমান বন্দরের দরকার, কোনো সন্দেহ নাই। এতে যোগাযোগ সহজতর হবে, পর্যটকরা আগ্রহী হবে, দেশ উপকৃত হবে,  স্থানীয় উপজাতিদের কর্মসংস্হান হবে, আমাদের উপজাতি সংস্কৃতি বিশ্ব পরিচিতি পাবে। আমি পার্বত্য চট্টগ্রাামের বিপরীত দিকে মায়ানমার গিয়েছি পর্যটক হয়ে। সেখানে বড় বড় পর্যটন নগরী গড়ে উঠেছে। মানদালয় শহর হতে  বাগান এলাকা পর্যন্ত বিশাল বিশাল পাহাড় সড়ক সংযোগের আওতায়। যেখানে যাবেন, পাহাড়ী মানুষগুলো পণ্য বিক্রি করছে। ব্যাংক-বীমা, শিল্প গড়ে উঠেছে। মানুষগুলো খুবই বন্ধুবৎসল এবং অতিথি পরায়ন। ফুটপাতে বসেই আহার সেরে ফেলতে পারেন। ভূ-প্রকৃতি হুবহু পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো। নারী প্রধান সমাজ বলে সব নারী সকালে কাজ করতে বের হয়। যানবাহন, মটরসাইকেল চালক শতকরা ৮০% নারী। আমাদের সীমান্ত হতে ২০০ কিলোমিটার দূরত্বে এত আয়োজন হলে কেন পার্বত্য চট্টগ্রাম পিছিয়ে? কেন পর্যটন বিকাশ নেই, সুযোগ-সুবিধা নেই? আর যোগাযোগ ব্যবস্থা আরো সহজতর হলে কেন পর্যটন বিকাশ হবে না? আসলে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা এই পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ। বেআইনী অস্ত্র উদ্ধার আর পরিপূর্ণ নিরাপত্তা দিতে না পারলে কীভাবে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটবে? আর্থিক অবস্থার উননয়ন ঘটবে কীভাবে? মূলত পাহাড়ী মানুষগুলো চাইলেই তা সম্ভব। তারা কি পর্যটন বিকাশ চান? শান্তি থাকলেই এসব সম্ভব। মায়ানমারে যত সমস্যাই থাকুক, সেখানকার সমাজ পর্যটন মেনে নিয়েছে বলেই তার উত্তরণ ঘটছে। কে কোন ধর্ম, জাতি, গোষ্ঠি- ইত্যাদি নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই (রোহিংগা সমস্যা নিয়ে বিশাল মায়ানমারের মানুষ তেমন অবহিত নয়। আর এ সমস্যা শুধু রাখাইন প্রদেশে) । আমরা মটরসাইকেল ভাড়া করে যেখানে খুশী গিয়েছি। সেখানকার মানুষ স্বাগত জানিয়েছে। এখন মূল বিষয়ে আসি। পর্যটন বিকাশ মূলত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে করা দরকার। স্থানীয় এবং সমতল ছাড়াও বিদেশিদের জন্য অনুকূলে পরিবেশ তৈরি না করলে শুধু বিমান বন্দর দিয়ে লাভ হবে কি? অবকাঠামো উন্নয়ন করে, যোগাযোগ উন্নয়ন করে বিমান যোগাযোগ স্থাপন করলেই পর্যটনের বিকাশ হতে পারে। তবে পূর্ব শর্ত হতে হবে পর্যটকদের নিরাপদ অবস্থান নিশ্চিত করা। বিমান বন্দর স্থাপন করে যদি পরযটক না আসে, তবে তা হবে অলাভজনক বিনিয়োগ । মনে রাখতে হবে, বিমানবন্দর তৈরি করতে বিপুল অর্থ দরকার। তাই এর feasibility study অতিব জরুরি। তাছাড়া ICAA ( International civil Aviation Authority) এর অনুমোদন ছাড়া এবং IATA এর চুক্তি ছাড়া বিমান বন্দর চালু করা যাবে না। বেসামরিক বিমান চলাচলের অনুমোদন লাগে। শত কোটি টাকা খরচ করে যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা যায়, তবে শুধু বিমান বন্দর তৈরি করে লাভ হবে না। আসলে পার্বত্য চট্টগ্রামে অনেক কিছুই করা সম্ভব, যা সন্ত্রাসের কারণে সম্ভব হচ্ছে না। থাইল্যান্ড, মায়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম, নেপাল, ভুটান কিংবা শিলং যেভাবে পর্যটন নিয়ে এগিয়েছে, আমরা তার কাছেধারেও নেই। নেপালের পাহাড়ে যদি বোয়িং ৭৭৭ নামতে পারে, থিম্পু বিমান বন্দরে যদি বিমান নামতে পারে তবে কেন পার্বত্য চট্টগ্রামে তা সম্ভব হবে না? তবে মূল বিষয় শান্তি আনয়ন। কীভাবে সম্ভব, সেটাই এখন প্রথম বিবেচনায় নিতে হবে। ধন্যবাদ সুন্দর একটা গঠনমূলক বিষয় নিয়ে আলোচনার সুযোগ দেওয়ার জন্য।’

এর ঠিক এক বছর পর শুক্রবার (১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯) গণমাধ্যমে আসা একটি খবর আমাদের আশান্বিত করে তোলে। খবরে প্রকাশ, ‘রাঙামাটির কাউখালী উপজেলাকে বিমান বন্দর নির্মাণের সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। তাই রাঙামাটিতে যে কোন সময় গড়ে উঠতে পারে বিমান বন্দর।  এ উপজেলায় বিমান বন্দর গড়ে তোলার অন্যতম কারণ হলো- এ উপজেলার সাথে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, হাটহাজারি, রাউজান, রাঙুনিয়া এবং পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবানের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো রয়েছে।  মঙ্গলবার (১৫ জানুয়ারি ২০১৯) বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ড’র (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী মো. আমিনুল ইসলাম রাঙামাটিতে এমন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বেসরকারি বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছেন।  চিঠিতে বিডা’র নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেছেন- তিন পার্বত্য জেলায় কোনো বিমানবন্দর না থাকায় তাদের চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ব্যবহার করতে হয়, যা খুবই কষ্টকর ও সময়সাপেক্ষ।  তাছাড়া পার্বত্য জেলাগুলোতে রেলপথ নির্মাণ সম্ভব নয়, নৌ-পথের সুযোগও সীমিত।  শুধু সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে কোনো অঞ্চলের কাঙ্খিত উন্নয়ন সম্ভব নয়।  বর্তমান সরকারের উন্নয়ন অভিযাত্রায় সবাইকে সমান সুযোগ দিতে হলে পার্বত্য অঞ্চলের জেলাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই।’

‘এর আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা মঙ্গলবার (৮ জানুয়ারি ২০১৯) বিডা’র নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী মো. আমিনুল ইসলামের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে রাঙামাটিতে বিমানবন্দর গড়ে তুলতে উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ করেছেন।  চিঠিতে নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা বলেন, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের একটি প্রধান শর্ত।  তিন পার্বত্য জেলায় সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও এখানে কোনো রেলপথ ও বিমানবন্দর নেই।  নৌ-পথেও অন্য জেলার সঙ্গে যোগাযোগের সুবিধা নেই।  এ অবস্থায় তিন পার্বত্য জেলার মধ্যবর্তী কোনো স্থানে ছোট একটি বিমানবন্দর নির্মিত হলে এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।  রাঙামাটির কাউখালী উপজেলায় প্রস্তাবিত এ বিমানবন্দর হতে পারে উল্লেখ করে নব বিক্রম বলেন, কাউখালীতে বিমানবন্দরটি হলে অন্য দুই পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান ছাড়াও চট্টগ্রাম জেলার রাউজান, হাটহাজারী, রাঙুনিয়া ও ফটিকছড়ির অধিবাসীরা সুবিধা পাবে।  এতে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।  দুই জেলা চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বিমানবন্দর থাকা সত্ত্বেও রাঙামাটিতে আরও একটি বিমানবন্দর হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিন কোটি জনসংখ্যার দেশ নেপালের আয়তন বাংলাদেশের প্রায় সমান।  দেশটির অভ্যন্তরে বিমান চলাচলের জন্য ৪৩টি বিমানবন্দর রয়েছে।  সে হিসেবে বাংলাদেশের পার্বত্যাঞ্চলেও একটি আভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর নির্মাণ করা যেতেই পারে।’

এ খবরটি আমাদের মধ্যে ব্যাপক আশার সঞ্চার করেছিল।  কিন্তু তার পাঁচ দিন পরই প্রধানমন্ত্রী বললেন এটি করা যাবে না। স্বাভাবিকভাবেই এটা আমাদের জন্য হতাশাজনক। কারণ, প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার বাইরে বিমানবন্দর তো দূরের কথা, এখানে অন্য কিছুই করা সম্ভব না।  প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যটি লাইভ শোনার সুযোগ হয়নি, তবে টিভিতে দেখে যারা হতাশ হয়েছেন তাদের কয়েকজন ফোন করে জানালে পরবর্তীতে ভিডিওটি দেখেছি। দেখার পর মনে হচ্ছে, এমন কিছু এখনো ঘটেনি যে, এখনি আমাদের হতাশ হতে হবে। কারণ, পার্বত্য চট্টগ্রামে বিমানবন্দর হতে পারে কিনা সে ব্যাপারে এখনো feasibility study হয়নি। সেটা হলেই কেবল নিশ্চিত হওয়া যাবে যে, এখানে বিমানবন্দর হতে পারে কিনা। আর হলে তার প্রতিক্রিয়া বা প্রতিফলন কেমন হবে সেটাও বিস্তারিত জানা যাবে। তাই প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আমাদের অনুরোধ থাকবে, বিষয়টি নিয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের তথ্যভিত্তিক কাজটি অন্তত করার নির্দেশ দিন।

রাঙামাটিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘটে যাওয়া পাহাড়ধ্বসের ভয়াবহ ঘটনাগুলোই সম্ভবত প্রধানমন্ত্রীকে ‘মাটির পাহাড়ে বিমানবন্দর করা যাবে না’ বলতে উৎসাহী করেছে। কিন্তু পাহাড়ের উপরেই বিমানবন্দর করতে হবে, তা কিন্তু নয়। একটি ছোট বিমানবন্দর করার মতো সমতল জায়গার খুব বেশি সংকট পাহাড়ে হবে না। আর শুধু মাত্র পর্যটনের বিকাশের জন্যও যে পার্বত্য এলাকায় বিমানবন্দর করতে হবে, তাও কিন্তু নয়। রাঙামাটির কাউখালী এমন একটি জায়গা যার সাথে সংযুক্ত আছে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, হাটাজারি, রাঙুনিয়া, রাওজান। যেসব এলাকার বিশাল সংখ্যক মানুষ প্রবাসী। তারা মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। তাছাড়া, এ এলাকার বিপুল সংখ্যক মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্যও বিভিন্ন দেশে আসা-যাওয়া করেন। তাদের এখন চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের অবস্থান শহরের দক্ষিণ প্রান্তে হওয়ায় শহরের যানজট পেরিয়ে সেখানে আসা-যাওয়া করতে হয়। কাউখালীতে বিমানবন্দর হলে তাদের জন্য যানজট এড়িয়ে সহজে যাতায়াত করা সম্ভব হবে। সেই সাথে খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবানের সাথে সহজ যোগাযোগ থাকায় এই দুই জেলার মানুষও এটাকে সহজে ব্যবহার করতে পারবেন।

সে দিক থেকে ধারণা করা যায়, এখানে বিমানবন্দর হলে সেটা লাভজনকই হবে। সেই সাথে পার্বত্য এলাকার পর্যটন গুরুত্বকে বাড়িয়ে তো দেবেই। আর পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন গুরুত্ব বৃদ্ধির অর্থই হচ্ছে স্থানীয় মানুষের ব্যাপক কর্মসংস্থান। সাজেকের দিকে দৃষ্টি দিলেই বিষয়টা স্পষ্ট হবে। যেখানে মানুষ সারাদিন পরিশ্রম করে ২/৩শ’ টাকার বেশি আয় করার সুযোগ ছিল না, সেখানে হোটেল-মোটেল বানিয়ে এখন এক রাতে ৩/৪ হাজার টাকাও আয় করছে স্থানীয়রা। তাদের স্বচ্ছল জীবনযাপন দেখে রাঙামাটির বিলাইছড়ি এবং বান্দরবানের পাংখো ও লুসাইদের অনেকেই এখন সাজেকে গিয়ে বসতি গড়তে আগ্রহী। একইভাবে যদি পুরো পার্বত্য এলাকাকে পর্যটনের আওতায় আনা যায়, তাহলে শুধু পাহাড়ের মানুষ নয়, বরং পুরো বাংলাদেশের অর্থনীতিতেই তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। আর সে ক্ষেত্রে একটি বিমানবন্দর অতি জরুরি। নানা কারণেই এ অঞ্চলের সামরিক-বেসামরিক গুরুত্বও দিন দিন বাড়ছে, তাছাড়া যে কোনো জাতীয় দুর্যোগ মোকাবেলার জন্যও এখানে একটা বিমানবন্দর প্রয়োজন।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিমানবন্দর নির্মাণ নিয়ে ইতোমধ্যে যাদের সাথে আলাপ করার সুযোগ হয়েছে, তাদের মতামত থেকে এটা অন্তত ধারণা করা যায় যে, আজ না হোক কাল এটা হবেই। সে দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে চাই, আপাতত নির্মাণ সম্ভব না হলেও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজটি অন্তত হোক- প্রধানমন্ত্রীর প্রতি এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

[email protected]

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen − 9 =

আরও পড়ুন