রক্তাক্ত পাহাড়: নাগরিক প্রতিক্রিয়া

fec-image

১৮ মার্চ ২০১৯, সন্ধ্যায় রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়িতে নির্বাচনী কর্মকর্তা- কর্মচারীদের উপর পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের অতর্কিতে ব্রাশ ফায়ারে নিহত হয় ৮ জন, আর আহত হয় ২০ জনের বেশি। ১৯ মার্চ বিলাইছড়িতে উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সুরেশ কান্তি তঞ্চঙ্গাকে গুলি করে হত্যা করে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা। মাত্র ১৪ ঘণ্টার ব্যবধানে পাহাড়ে এমন ন্যক্কারজনক ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে পাহাড়ের সকল সম্প্রদায়ের মানুষ। জঘন্য এ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পাহাড়ের সর্বস্তরের মানুষের প্রতিক্রিয়া নিয়ে পার্বত্যনিউজের পক্ষ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ের পেশাজীবীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের চেষ্টা করা হয়। তবে বেশিরভাগই আতঙ্কে কোনো সাক্ষাৎকার দিতে রাজী হয়নি। তবে অনেকেই দিয়েছে।

 

সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য, উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য এই হামলা- বীর বাহাদুর এমপি

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বীর বাহাদুর এমপি বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের চলমান শান্তি প্রক্রিয়াকে ব্যাহত, উয়ন্নন ও অগ্রগতির ধারাকে বাঁধাগ্রস্ত এবং সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য বিশেষ কোন গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে। নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে বাঁধা সৃষ্টির জন্য এই ধরণের ন্যাক্কারজনক, বর্বরোচিত এই হামলার ঘটনা খুবই নিন্দনীয়।

তিনি আরও বলেন, জনমতের প্রতি যাদের নূন্যতম আস্থা, বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাবোধ নেই, শান্তি, সম্প্রীতি, উয়ন্নন ও অগ্রগতির বিপরীত মেরুতে যাদের সব সময়ই সহাবস্থান, কেবল তাদের দ্বারাই এই বর্বরোচিত হতাকাণ্ড ঘটানো সম্ভব। হামলাকারীরা শুধু জনগণের শত্রু নয়, এরা একাধারে পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও প্রগতিরও শত্রু বলে মনে করেন মন্ত্রী।

ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এই পরিকল্পিতভাবে এই হতাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বীর বাহাদুর বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি হয়। আর চুক্তি সম্পাদনের পর পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তির সুবাতাস বইছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় মাইলফলক সৃষ্টির মাধ্যমে যে আস্থা-বিশ্বাস ও ভালবাসার বহি:প্রকাশ ঘটেছে এবং সর্বোপরি প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক উদ্যোগ চলমান শান্তি প্রক্রিয়া যেভাবে দেশ ও বহি:র্বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে তাকে প্রশ্নবিদ্ধ ও নস্যাৎ করে দেয়ার জন্য ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে পরিকল্পিতভাবে এই হতাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।

মন্ত্রী অবিলম্বে ন্যাক্কারজনক এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে বিভিন্নভাবে যারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

যারা নির্বাচনী ফলাফল মেনে নিতে পারেনি তারাই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে- দীপঙ্কর তালুকদার এমপি

সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও রাঙামাটি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার বলেছেন,  আমি মনে করি নির্বাচনী কাজে যারা জড়িত ছিল তারা সকলে নিরীহ। তারা তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করছিল। সুতরাং আমি মনে করি, যারা নির্বাচনী ফলাফল মেনে নিতে পারেনি তারাই এই আক্রমণ করেছে। এই হামলা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে, সরকারের বিরুদ্ধে এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। সুতরাং সে ভাবে বিবেচনা করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। এটা জরুরি দরকার যারা। নিহত হয়েছে তাদের জন্য গভীর শোক প্রকাশ করছি, যারা আহত হয়েছে তাদের জন্য দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি।

আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নই, আমরা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নই। প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক কর্মকান্ড করার, তার রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়ার অধিকার আছে। আমরা সেই অধিকার সংরক্ষণ করার সবসময় সচেষ্ট থাকি। আমাদের লড়াইটা অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে। এসব ঘটনা ঘটার মূল কারণ হলো: পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্র রয়েছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছি, আন্দোলন করে আসছি এজন্য যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সমস্ত অবৈধ অস্ত্র রয়েছে সে সমস্ত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। যেসব অবৈধ অস্ত্রধারীরা নানা অপকর্ম করছে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং এ ধরনের সন্ত্রাসীরা যাতে ভবিষ্যতে আর এরকম কোন অপকর্ম করতে না পারে সে জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

একইভাবে আমি মনে করি, সুরেশ কান্তি তঞ্চঙ্গ্যাকে যারা মেরেছে তারা নিঃসন্দেহে একটি রাজনৈতিক শক্তি। তারা আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করতে চায়, তারা আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়। অরবিন্দু চাকমাকে তারা হত্যা করেছে, রাসেল মারমার উপর হামলা করল, ঝরনা খীসার উপর হামলা করল। তাদের লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগকে দুর্বল করা।

আওয়ামী লীগ থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকদের যারা পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছে, তাদের লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করা। যেহেতু তারা আওয়ামী লীগকে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নিশ্চিহ্ন করতে পারে নাই এবং যেহেতু ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রাম বাসী আবার আওয়ামী লীগের উপরে আস্থা স্থাপন করেছে, উপজেলা নির্বাচনেও যেহেতু আওয়ামী লীগের উপর আস্থা স্থাপন করে ওইসব সন্ত্রাসীদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছে, সে কারণে আবারো আতঙ্ক সৃষ্টি করার জন্য তারা এই কাজটি করেছে। এই হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নেয়া অত্যন্ত জরুরী।

এ ধরণের ঘটনার পেছনে দেশী-বিদেশী কারণ থাকতে পারে- কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপি

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান ও খাগড়াছড়ি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা বলেন, যে ঘটনা ঘটেছে পার্বত্য চট্টগ্রামে, তা দেশের ১৬ কোটি মানুষ দেখেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে এ ধরণের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে ঘটে চলেছে। এটা নতুন কিছু না।  শান্তি চুক্তির পরে শান্তিবাহিনী ভেঙে আরেকটা নতুন গ্রুপ সৃষ্টি হয়, এরপর থেকে এই দুই গ্রুপের মারামারি দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। এটা চলমান, নতুন কিছু নয়। এখন তাদের আধিপত্য ও ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা আরো বিস্তার করার জন্যই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে।

তিনি বলেন, তারাতো চোরাগোপ্তা হামলা চালাচ্ছে। কেউ যদি চুরি করে মারে, তাহলে তো তাকে ঠেকানো কঠিন। তারপরও আমি মনে করি আওয়ামী লীগ সরকার আছে বলেই এরা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আছে। ওখানকার মানুষ আওয়ামী লীগের পক্ষে আছে বলেই যতটুকু প্রভাব তাদের বিস্তার করার কথা ছিল ততটুকু তারা বিস্তার করতে পারেনি।

এই হামলার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন,  এই হামলার পিছনে দেশ ও বিদেশের নানা ষড়যন্ত্র থাকতে পারে বলে আমি মনে করি। এই ষড়যন্ত্র থামানোর জন্য আওয়ামী লীগ সরকার আরো বৃহৎ আঙ্গিকে চিন্তাভাবনা করছে। আশা করি সফল হব। এই ঘটনার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনীতি বিঘ্নিত হবে, লেখাপড়া, অর্থনীতি, পর্যটন, ব্যবসা বাণিজ্য, মানুষের জীবন যাপনের শান্তি- স্বস্তি, সমস্ত কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে।

তাদের এই লড়াই শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের জন্য নয়, এলাকার মানুষের উন্নয়নের জন্য নয়, এমনকি নিজেদের উন্নয়নের জন্যও নয়।  এটা তাদের দলীয় আধিপত্য বিস্তারের জন্য এ লড়াই চলছে। এর পেছনে দেশি কারণ থাকতে পারে, আবার বিদেশি কারণও থাকতে পারে।  এখানে আমি থাকবো, ওখানে তুমি থাকবা, আমি এখানে থাকবো না, আমি ওখানে যাব- এই যে দ্বন্দ্ব এই দ্বন্দ্বেই এই লড়াই চলছে। তবে এই অবস্থা বেশিদিন চলবে না। উচ্চতর মহলে চিন্তাভাবনা চলছে।

কিভাবে এই অবস্থা থামানো যায় প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি অতি স্পর্শকাতর এলাকায। এখানে যে কোন পদক্ষেপ গ্রহণের আগে অনেক কিছু চিন্তা করতে হয়। কিন্তু সরকারের আন্তরিকতা রয়েছে, উদারতা আছে। এ ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং দুঃখজনক। এ ধরনের ঘটনা রোধ করতে হলে আমাদের শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে হাত দিতে হবে এবং আমি মনে করি শান্তি চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলে এ ধরনের ঘটনা বন্ধ হয়ে যাবে। তবে এ কাজে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।

 এ ঘটনায় যারাই জড়িত থাকুক তাদের একটাই পরিচয়, তারা সন্ত্রাসী- বাসন্তী চাকমা

পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে মনোনীত সংরক্ষিত সংসদ সদস্য বাসন্তি চাকমা বলেন, আমি এ ঘটনায় মর্মাহত। এ ঘটনা এ ধরনের ঘটনা যারা ঘটিয়েছে তারা হল সন্ত্রাসী। এই সন্ত্রাসীদের কখনোই বাংলার মাটিতে ঠাঁই হবে না। আমি এ ঘটনায় জড়িতদের যথাযথ বিচার ও শাস্তি দাবি করছি।

যারা মারা গেলেন শহীদ বলবো তাদের আমি, তাদের প্রতি শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছি। আমি আসলেই মর্মাহত। আমার খুবই ভালো লাগত যদি, আমি এই মুহূর্তে পার্বত্য চট্টগ্রামে গিয়ে হতাহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারতাম, তাদের প্রতি শোক ও সহানুভূতি জানাতে পারতাম। কিন্তু আমি এ মুহুর্তে ঢাকায় অবস্থান করছি।

যারা মারা গিয়েছে তারা নিরীহ। আমার স্বামী সার্ভিস হোল্ডার। আমার স্বামী দীঘিনালা থাকাকালে তিনিও এভাবে ডিউটিতে যেতেন।  এদের কি অপরাধ? এরা তো নিরীহ! এটা অত্যন্ত জঘন্য ও ঘৃণিত কাজ। যারাই এর সাথে জড়িত থাকুক তারা সন্ত্রাসী, তাদের একটাই পরিচয় তারা সন্ত্রাসী। আমি এই সন্ত্রাসীদের উপযুক্ত বিচার দাবি করছি।

এ ঘটনার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি কিভাবে এর কারণ বলব,  যারা মারা গিয়েছে তারা ইউপিডিএফও করেনা, জেএসএসও করে না, আওয়ামী লীগ- বিএনপি কিছুই করে না। তারা সরকারি চাকরিজীবী, নিরীহ। আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না, আমি কি মন্তব্য করবো? আমি তো দেখিনি কারা ঘটিয়েছে। তবে যারাই ঘটাক, আমি বলব সন্ত্রাসীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। আমি কোনো নিরীহ মানুষকে হত্যা সমর্থন করি না।

এ ধরনের ঘটনা বন্ধে কী করণীয় জানতে বাসন্তী চাকমা বলেন, বাংলাদেশ সরকার, আওয়ামী লীগ সরকার শান্তিতে বিশ্বাসী। আমি এইটুকু বলব, আমি বা আমার সরকার কখনো চাই না- এ ধরনের ঘটনা ঘটুক। এ ধরনের ঘটনা কারা ঘটায়, আপনারা যেহেতু সাংবাদিক মানুষ, আপনারা খুঁজে বের করেন। আমি কিভাবে বলবো?  আমি মনে করি আমাদের সবাইকে মিলে একসাথে কাজ করতে হবে। যেটা আমরা এখনো করছি। এর বাইরে কোন মন্তব্য আমি করবো না। তবে আমি চাই, আমরা সবাই মিলে যাতে একসাথে বসবাস করতে পারি, একসাথে থাকতে পারি সেব্যাপারে আমাদের চেষ্টা থাকবে এবং আমরা কাজ করবো সেজন্য।

জনগণের অধিকার আদায়ের নামে যারা পাহাড়ে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে তারা কখনো বন্ধু হতে পারে না- কংজরী চৌধুরী

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী বাঘাইছড়ি হত্যাকাণ্ডকে সন্ত্রাসীদের চরম ধৃষ্টতা আখ্যায়িত করে বলেন, যারা নিহত হয়েছেন, তারা কারো শত্রু ছিল না। তারা কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যায়নি। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে গেছেন।

তিনি এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, জনগণের অধিকার আদায়ের নামে যারা পাহাড়ে অরাজক পরিস্থিতি তৈরীর অপচেষ্টা চালাচ্ছে তারা কখনো আপনার-আমার বন্ধু হতে পারে না। এরা রাষ্ট্র বিরোধী। তিনি পাহাড়বাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সাড়াঁশি অভিযান চালালোর আহবান জানান।

সর্ষের মধ্যে ভূত ঢুকেছে- ফিরোজা বেগম চিনু

মহিলা সংরক্ষিত আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ফিরোজা বেগম চিনু বলেন, হামলা করে মানুষ হত্যা কোন সচেতন মানুষ মেনে নিতে পারে না। আমিও সেইরকম একজন। সংসদ সদস্য থাকাকালে আমি পাহাড়ের সন্ত্রাসবাদ, চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে মহান সংসদে কথা বলেছি। সংসদের মাধ্যমে পাহাড়ের  সমস্যার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছি।

বাঘাইছড়ির ঘটনাটি আমাদের কাছে কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। আর এ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় শাস্তি প্রদানের জোর দাবি জানাচ্ছি।

তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, আমরা বর্তমানে সংসদে এমন একজনকে দেখতে পাচ্ছি যিনি আওয়ামী লীগের মতো একটি প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে জড়িত থেকে পাহাড়ের সন্ত্রাসীদের পক্ষে কথা বলছেন। ব্যাপারটি খুবুই দু:জনক। সর্ষের ভিতরে ভূত ঢুকেছে। তিনি পাহাড়ের শান্তির পক্ষে কথা না বলে উগ্রবাদী কথা বলে যাচ্ছেন।

বাঘাইছড়িতে উপজেলা পরিষদের নব নির্বাচিত চেয়ারম্যান সুদর্শন চাকমা বাঘাইছড়িতে নিহতদের প্রতি শোক প্রকাশ জানিয়ে বলেন, ব্যাপারটি নিন্দনীয়, দুঃখজনক। যাদেরকে হত্যা করা হয়েছে তারা কোন রাজনৈতিক দলের কেউ নয়। এ হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত হামলাকারী ও নির্দেশদাতাদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি দাবি জানাচ্ছি।

খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা রণ বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা বলেন, অস্বাবিক মৃত্যু কারো কাম্য নয়। সারা বিশে^ খুন কোন সুষ্ঠু মানুষের কাজ হতে পারে না। তিনি সব হত্যাকান্ডের নিন্দা জানিয়ে বলেন, অবৈধ অস্ত্র কারো হাতে থাকা কাম্য নয়। সকল অবৈধ অস্ত্রধারীদের আইনের আওতায় আনা জরুরী।

রাঙামাটি জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক দীপেন তালুকদার দীপু জানান, বাঘাইছড়ির হত্যাকান্ডটি খুবুই দুঃখজনক। এ ধরণের হত্যাকান্ড মেনে নেওয়া যায় না। যাদেরকে হত্যা করা হয়েছে তাদের কী দোষ ছিলো? তারা তো কোন দোষ করেনি। যারা এ হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের দ্রæত গ্রেফতার করে শাস্তি প্রদানের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।

বান্দরবান জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ সভাপতি অধ্যাপক মো: ওসমান গণি ও সাধারণ সম্পাদক জাবেদ রেজার সাথে যোগাযোগ করা হলে উভয় নেতা বলেন, যেহেতু নির্বাচন সংক্রান্ত সব কর্মকাণ্ড বয়কট করেছে বিএনপি, সেহেতু সংঘটিত ওই ঘটনার বিষয়ে কোন প্রতিক্রিয়া জানাতে চায় না।

বান্দরবান চেম্বার অব কমার্সের জেলা সহ-সভাপতি শফিকুর রহমান বলেন, বাঘাইছড়িতে গুলিতে ৭জন নিহত হওয়ার ঘটনা দু:খজনক। সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ড ও সফলতা কাজকে বাধাগ্রস্ত করতেই এই ধরনের ঘটনা ঘটানো হয়েছে।

রাঙামাটি প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক রাঙামাটি পত্রিকার  সম্পাদক আনোয়ার আল হক বলেন, পাহাড়ের হত্যাকান্ডের ঘটনাগুলো ঘটছে মূলত প্রতিহিংসার বহি:প্রকাশ। যা একটি এলাকার উন্নয়নকে ত্বরানিত করছে। পিছিয়ে পড়া এ অঞ্চলকে এগিয়ে নিতে হলে সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে কাজ করতে হবে। আর যারা এ হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।

বাঘাইছড়ি উপজেলা আ’লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দীন আল মামুন বলেন, সন্ত্রাসবাদ কারো জন্য আর্শিবাদ নয়। বিশেষ করে সন্ত্রাসীদের অভয়রাণ্য হয়েছে বাঘাইছড়ি। যার নির্মম শিকার হয়েছে সরকারি এসব কর্তারা। সন্ত্রাসীরা এ ঘটনায় ছাড় পেয়ে গেলে ভবিষ্যতে তারা আরো বড় হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা চালাবে। তাই এখনি উপযুক্ত সময় সন্ত্রাসবাদের লাগাম ঠেনে ধরা। দ্রæত সময়ের মধ্যে খুনীদের গ্রেফতারের জোর দাবি জানাচ্ছি এবং বিশেষ ক্ষমতায় তাদের বিচার করা হোক।

বান্দরবান জেলা শিক্ষক সমিতির সহ-সভাপতি কামাল উদ্দিন জানান, নির্বাচনী কার্যক্রম করতে গিয়ে সরকারী মানুষের উপর দুষ্কৃতিকারীদের বর্বরোচিত এই হত্যাকাণ্ড নিন্দাজনক। আগামীতে এই ধরনের কাজে সরকারী চাকুরীজীবিদের নিরাপত্তার পাশাপাশি দুস্কৃতিকারীদের শাস্তির পক্ষে তিনি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সম-অধিকার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সাধারন সম্পাদক মোশাররফ হোসেন বাঘাইছড়িতে সংঘটিত গত নৃশংস হত্যাকান্ডের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, শান্তিচুক্তি পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে পাহাড়ে অস্ত্রধারী  সন্ত্রাসীরা চাঁদা এবং জিম্মি করে মুক্তি পন আদায়সহ নানান অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।  তিনি পাহাড়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসী  কর্মকান্ড বন্ধে সেনাবাহিনীকে অপারেশন দাবানল এর মতো অভিযান  পরিচালনা পক্ষের মত দেন।

পার্বত্য নাগরিক পরিষদের বান্দরবান জেলা সভাপতি মো: আতিকুর রহমান বলেন, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রশাসন। আর এই কমিশনের কাজ করতে গিয়ে এই ধরনের সন্ত্রাসী হামলা সংবিধানের উপর হামলা বলে ধরে নেওয়া যায়। যারা এই কাজ করেছে তারা যুদ্ধাভাব তৈরীর জন্যই করেছে। এই ধরনের কোন ঘটনা ঘটলে সমতলে সাথে সাথে এ্যাকসেন নেওয়া হয়।

কিন্তু পাহাড়ে প্রশাসনের নির্লিপÍতার কারনে একদিনের ব্যবধানে একই ঘটনা পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। তাই পার্বত্য নাগরিক পরিষদের পক্ষ থেকে অবিলম্বে দুস্কৃতিকারীদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির দাবী জানাচ্ছি। তিনি আরো বলেন- পাহাড়ে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারের কারনেই এই ধরনের ঘটনা হচ্ছে। তাই অতীতের দাবীর মতো নাগরিক পরিষদ আবারো সেনা ক্যাম্প স্থাপনের দাবী জানাচ্ছে।

পার্বত্য অধিকার ফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি মো: মাঈন উদ্দীন বাঘাইছড়ি হত্যাকান্ডকে পাহাড়ে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ঘাটতিকে দায়ী করে প্রত্যাহারকৃত সকল নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্প পুন:স্থাপনের দাবী জানান।

সশস্ত্র উপজাতি জঙ্গী গোষ্ঠি যেখানে হত্যাকান্ডটি সেখানে ঘটেছে যেখানে পূর্বে তিনটি সেনাক্যাম্প ছিলো। নিরাপত্তা বাহিনীর ঐ ক্যাম্পগুলো থাকলে আজ এমন ঘটনা ঘটাতে পারতো না। তাই সময়ের  পাহাড়ে যতদিন উপজাতী সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠন থাকবে ততদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা ক্যাম্প গুলো পুন:স্থাপন করতে হবে। তিনি উপজাতিয় সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধের দাবীতে তীব্য আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

ঘটনাপ্রবাহ: বাঘাইছড়ি হত্যাকাণ্ড, সাক্ষাৎকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × five =

আরও পড়ুন