রক্তাক্ত বাঘাইছড়ি : লাভ কার

মোস্তফা কামাল:

ফাঁকা মাঠের নির্বাচনেও ব্রাশফায়ার। ৬-৭টা লাশ। তারা সবাই নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকারী। রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার নয়মাইল এলাকায় দীঘিনালা-বাঘাইছড়ি সড়কের এই ঘটনা কী বার্তা দিচ্ছে আমাদের? যুক্তি ও সংখ্যাতত্ত্বে মুখপা-িত্যে বলা যাবে, চলমান নানা ঘটনাদৃষ্টে এটা বড় ঘটনা নয়। এত বড় নির্বাচনে এ আর তেমন কী? অথবা এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। সারাদেশে তো এমন হয়নি। লাশও তত নয়।

মাত্র কদিন আগেই না ঢাকার চকবাজারে আগুনে পুড়ে মরেছে ৭০-৭৫ জন। এর আগে নিমতলীতে মরেছে ১১৯ জন। তাজরীনে ১১২। আর রানা প্লাজায় হাজার ছাড়িয়ে প্রায় ১২শ’। সেই তুলনায় বাঘাইছড়িতে লাশের সংখ্যা নেহাত কম। এমন সরল অঙ্কে ঠেলে দেওয়া হয়েছে মানুষের জীবনকে। গুরুতর ঘটনাকেও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নামে চালানোর পাশাপাশি মানবজীবন নিয়ে আমাদের মূল্যায়ন-বিশ্লেষণ এমন জায়গায় এসে ঠেকেছে বা ঠেকানো হয়েছে।

কিন্তু বাঘাইছড়ি কি বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন? উপজেলা নির্বাচনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা? লাশ গুনে বাঘাইছড়ির ঘটনাকে মামুলি বলে চালিয়ে দেওয়া অসুস্থতার নামান্তর। বাঘাইছড়ির সাজেক ইউনিয়নের দুর্গম এলাকার কয়েকটি স্কুলকেন্দ্রে ভোটের দায়িত্ব পালন শেষে নির্বাচনী সরঞ্জামাদি নিয়ে সন্ধ্যায় একসঙ্গে বিজিবির পাহারায় চারটি চাঁদের গাড়িতে উপজেলা সদরে ফিরছিলেন এই নির্বাচনীকর্মীরা। বহরে ছিলেন ভোটকেন্দ্রগুলোর প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা। গাড়িবহরের সামনে ছিল বিজিবির গাড়ি।

বহরটি দীঘিনালা-বাঘাইছড়ি সড়কের নয়মাইল এলাকায় পৌঁছলে শুরু হয় ব্রাশফায়ার। সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে পেছনের একটি গাড়ি আক্রান্ত হয়। এ সময় চালক গাড়ি না থামিয়ে দ্রুতগতিতে গাড়িটি চালিয়ে বাঘাইছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে গাড়ি থেকে তাদের নামানোর পর একের পর এক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে থাকেন গুলিবিদ্ধরা। ঘটনা আকস্মিক না পূর্বপরিকল্পিত তা জানার সুযোগ ভবিতব্য। ততক্ষণে আবার কোন ঘটনা এসে দাঁড়ায় কে জানে? এ কথা তো নির্দ্বিধায় বলা যায়, বাঘাইছড়ির ঘটনা তথ্যবহুল। ইঙ্গিতবহও। এ নিয়ে জাতীয় রাজনীতি এখনো চাপা পর্যায়ে। তবে তাৎক্ষণিক পাল্টাপাল্টি দোষারোপ চলে স্থানীয়ভাবে।

বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাচনে জাতীয় কোনো রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেনি। ভোটযুদ্ধ করেছেন সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রভাবশালী নেতা ও বর্তমান চেয়ারম্যান বড়ঋষি চাকমা এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ( এমএন লারমা) অন্যতম শীর্ষ নেতা সুদর্শন চাকমা। এই দুই নেতার ভোটযুদ্ধ নিয়ে উত্তাপ ছিল সেখানে। ভোটের প্রচারণার মধ্যেই গত ৭ মার্চ উপজেলার বঙ্গলতলিতে হামলায় নিহত হন ইউপিডিএফের নেতা উদয় জয় চাকমা চিক্কোধন। সর্বশেষ ভোটের দিন সকালেই নির্বাচনে অনিয়ম, ভোট ও কেন্দ্র দখল এবং চারটি কেন্দ্রে রাতেই ভোট দেওয়া হয়েছে এমন অভিযোগ এনে সকাল ১০টায় ভোট বর্জন করেন জনসংহতি সমিতির প্রার্থী বড়ঋষি চাকমা। ভোট বর্জন করেন তিনজন ভাইস চেয়ারম্যানও।

নির্বাচনে অংশ নেওয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি- এমএন লারমা চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সুদর্শন চাকমা দুষেছেন সন্তু লারমার জেএসএসকে। তার দাবি, জেএসএস প্রার্থী বড়ঋষি চাকমা নিশ্চিত পরাজয় জেনে সকালে নির্বাচন বর্জন নাটক করেন। পরে সন্ধ্যায় সরকারি কাজে নিয়োজিতদের ওপর এই নৃশংস হামলা চালিয়েছেন। কোনো রাখঢাক না করে সুদর্শন চাকমা এই হামলার জন্য দায়ী করেছেন জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফকে। এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বাঘাইছড়ি উপজেলা কমিটির সহসাধারণ সম্পাদক ত্রিদিব চাকমা। এ ঘটনার সঙ্গে দূরতম সম্পর্কও নেই দাবি করে বলেছেন, ওইটা পুরোটাই ইউপিডিএফের নিয়ন্ত্রিত এলাকা। ওই এলাকায় তাদের কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রম বা অবস্থান নেই। অন্যদিকে ইউপিডিএফের মুখপাত্র মাইকেল চাকমার সাফকথা এ ঘটনার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি সুস্থ মস্তিষ্কের কারও কাজ নয়। এই নির্বাচনে বাঘাইছড়িতে তাদের কোনো প্রার্থীও ছিল না।

বাঘাইছড়িসহ পার্বত্যাঞ্চলে এভাবেই ঘটে চলছে একের পর এক হত্যাকা- আর দোষারোপের পাল্টাপাল্টি। একটি রক্তের দাগ মুছতে না মুছতে আবার আসে তাজা রক্ত। পার্বত্য এলাকায় জন্ম নেওয়া অভাগারা শোকাহত হয়। কিছুদিন বিরতি দিয়ে আবার রক্তাক্ত হয়। পাহাড়ের সমস্যাটা রাজনৈতিক। বহুমাত্রিক। এ যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় পাহাড়ি, বাঙালি ছাড়াও বহু পক্ষের স্বার্থ সম্পৃক্ত। এতে লাভ কার? অশান্তি করে সবচেয়ে বেশি ফায়দা হয় কাদের? কাশ্মীর আর ফিলিস্তিনের লড়াইটা যারা জানে-বোঝে উত্তরগুলো নিশ্চয়ই তাদের জানা। সেই কালো থাবারই একটি সংস্করণ বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলায়। আজ যে পক্ষ নিজেদের শক্তিশালী মনে করছে কিংবা প্রশাসনযন্ত্রের সহযোগিতা পাচ্ছে, দুদিন পর তাদের দমনে আরেকপক্ষ একই সুবিধা পেয়ে আসছে। পাহাড়ি, অ-পাহাড়ির সম্পর্কের অবনতিও একটা সুযোগ।

আরেক দল উন্নয়নের ব্যবসা বিস্তার করে। বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মিলমিশ করানোর নামে আরেকট সূক্ষ্ম ট্রেডিংও রয়েছে। সব ছকমতোই হয়। হয়ে আসছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্র ও মাদকের ভা-ার গড়ে তোলার হোতারা অজ্ঞাত নয়। এদের সঙ্গে আসাম, ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড, মেঘালয়, মিয়ানমারের একটি চক্রের খায়খাতিরও ওপেন সিক্রেট। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ে মোটামুটি শান্তি ফিরে এলেও পরে কেন আবার পাহাড়ি সশস্ত্র গ্রুপগুলো শক্তিমান হয়ে উঠেছে? এর আগে-পিছেও অনেক কথা ও ঘটনা রয়েছে।

তলিয়ে না দেখে এসব পাশ কাটানোর চাতুরী কে না বোঝে? ভূমি বিরোধ, পাহাড়ি-বাঙালি বিরোধ কারা উসকে দেয়? আর ঢাকায় বসে পাহাড়িদের নিয়ে উপরমহলের কার কী এজেন্ডা? গভীরে না গিয়ে এড়িয়ে যাওয়া বা পাশ কাটানোর মধ্য দিয়ে আরেক ঘটনার অপেক্ষায় থেকে ইস্যু এড়ানো যায়। সমবেদনা, দুঃখ প্রকাশ, ব্যবস্থা নেওয়ার হুশিয়ারি বা ক্ষতিপূরণ ঘোষণার মধ্য দিয়ে ইস্যু তামাদিতে মুনশিয়ানা দেখানো যায়। এ দক্ষতাকে ‘বাহ কী সুন্দর ম্যানেজ’ বলার চর্চা ভর করেছে আমাদের মধ্যে। নানা ছুতা বা রেশ টেনে এনে মূল ঘটনাকে আড়াল বা বেমালুম করার কাজটি চলছে বাঘাইছড়ির হত্যাযজ্ঞ নিয়েও। আগাম বলে দেওয়া যায়, খরস্রোতা করে বিশাল ঢেউয়ের মতো আছড়ে ফেলে এই ইস্যুকেও তলিয়ে দেওয়া যাবে আরেক ইস্যুতে। হত্যা-খুনাখুনির যাবতীয় আয়োজন রেখে ঘটনাকে দুর্ঘটনা বা মৃত্যু বলে চালিয়ে দেওয়ার এ প্রবণতা চলতে থাকলে এক সময় ডাবল, সেভেন, শত-হাজার কেন লাখো হত্যাও মামুলি হয়ে যাবে। পাহাড়ে কয়েকটা লাশ ছোটগল্প ধরনের ঘটনা হিসেবেই গণ্য হবে না। থাকবে না এ ধরণের হত্যা বা মৃত্যুর নিউজ ভ্যালুও। এটা নিশ্চিত ইস্যুর তোড়ে ইস্যু হারানোর এমন বাতিকে আগামী দিনকয়েকেই আমরা বাঘাইছড়িতে ব্রাশফায়ারে এ হতাহতের ঘটনা ভুলে যাব।

এমন অভিষেক আমাদের কোন তলানিতে নিয়ে ঠেকাচ্ছে? বিশেষ করে হত্যা-খুন, ধর্ষণ চিনাবাদামের মতো তুড়িতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। নাথিং হয়ে যাচ্ছে সব ঘটনাই। এতে ঘটনা বা সমস্যার অবসান হয় না। বরং আরও জটিল-পোক্ত হয়। পাহাড়ের ঘটনা আড়াল বা নাথিং করার চেষ্টার পাশাপাশি এ নিয়ে প্রসঙ্গের বাইরে নানামুখী কথার খই ফোটানো কেন জরুরি হয়ে পড়ল? সাংঘর্ষিক, হাস্যকর কথার কচলানিতে ঘটনা আড়ালের এ বাস্তবতা হয়তো পাহাড়ে হত্যাকা-ের ঘটনা মাটিচাপা পড়তে ভালো ভূমিকা রাখবে। ইস্যু বরবাদের চেষ্টা সফল হবে। সেই সক্ষমতা ও চাতুরীর একটা বাজার তো রয়েছেই। কিন্তু দেশের পার্বত্যাঞ্চলের পরিস্থিতিটা আর আট-দশটার মতো বিষয় নয়। এর সঙ্গে একটা দেশের ভূগোল-সার্বভৌমত্বসহ পরিচয়-অস্তিত্ব সম্পৃক্ত। লেখক: সাংবাদিক-কলাম লেখক; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।

ঘটনাপ্রবাহ: রক্তাক্ত বাঘাইছড়ি : লাভ কার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × two =

আরও পড়ুন