সংবিধানের মৌলিক অধিকার ক্ষুন্ন না করে জেলা পরিষদ নির্বাচন জরুরী: এমপি দীপংকর

নিজস্ব প্রতিনিধি, রাঙামাটি:

গেল ৮ এপ্রিল পাহাড়ের জেলা পরিষদগুলোর নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় কমিটির এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। এর আগে ২০১৬ সালের ১৪ জুন নির্বাচন সংক্রান্ত নিয়ে এ কমিটি বৈঠক করেছিলো।

এরপর ২০১৯ সালের ৮এপ্রিল এ কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভায় আঞ্চলিক পরিষদসহ তিন পার্বত্য জেলা পরিষগুলোতে নির্বাচনের বৈঠক নিয়ে পাহাড়ি নেতাদের মধ্যে নানা জনের নানা অভিমত। পাহাড়ের উন্নয়নে কেউ কেউ নির্বাচনের পক্ষে কথা বললেও অনেকে বলছেন পার্বত্য চুক্তি পূর্ণবাস্তবায়ন ছাড়া নির্বাচনের সুপারিশ মেনে নেওয়া যায় না।

ইতিহাসে পার্বত্য চট্টগ্রাম সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আইন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর আঞ্চলিক পরিষদ গঠিত হয়। আর এ পরিষদের চেয়ারম্যান করা হয়েছিলো পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসি জেএসএস) সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমাকে। ১৯৯৮ সালের ২৪ মে কার্যকর হওয়ার পর পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন অনুযায়ী ২৫ সদস্য বিশিষ্ট নির্বাচিত পরিষদ থাকার কথা । কিন্তু সেই থেকে দীর্ঘ ২২ বছরে নির্বাচিত পরিষদ পায়নি আঞ্চলিক পরিষদ

এদিকে ১৯৮৯ সালের ৬ মার্চ তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন প্রণয়ন করে সরকার। এরপর ১৯৯৭ সালে পার্বত্য শান্তি চুক্তি হলে পাহাড়িদের মাঝে নির্বাচনের দাবি আরও জোরালোভাবে উত্থাপন হয়। ফলে ১৯৮৯ সালের আইনটিকে কার্যকর করতে ২০০০ সালে আরও সংশোধন আনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু আইন সংশোধনের পরও ১৬ বছর অতিবাহিত হতে চলেছে। নির্বাচন আর হয়নি।

শুধু তাই নয়, নির্বাচন করার জন্য বিধিমালার প্রয়োজন হয়, সেটাও করা হয়নি। অথচ আইনে বলা আছে- নির্বাচন সম্পন্ন করবে নির্বাচন কমিশন। আর এজন্য বিধিমালা প্রস্তুত করে দেবে সরকার। যদিও জেলা পরিষদ ছাড়া অন্য সব নির্বাচনের বিধিমালা প্রণয়নের ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনকেই আইনে দেওয়া আছে।

পার্বত্য জেলা পরিষদ নির্বাচনে যত বাঁধা:

পার্বত্য চুক্তির (শান্তি চুক্তির) ৯ ধারার শর্তানুযায়ী জেলা পরিষদ নির্বাচনে পাহাড়ের স্থায়ী বাসিন্দা ছাড়া সাধারণ কোন ভোটার ভোট দিতে পারবে না এমন তথ্য উল্লেখ থাকলেও শর্তটি দেশের প্রচলিত সংবিধানের পরিপন্থি এবং সাংঘর্ষিক। আর এজন্য খাগড়াছড়ির বাসিন্দা জামাল উদ্দীন নামের এক ব্যক্তি জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রকৃত ভোটররা কেন ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে না এমন দাবি তুলে ২০০২ সালের দিকে হাইকোর্টে একটি রিট করে। দীর্ঘ ১২বছর পর বিজ্ঞ আদালত বিষয়টি শুনানি শেষে জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রচলিত তালিকা অনুযায়ী সকলে ভোট প্রয়োগ করতে পারবে এমন মর্মে রায় প্রদান করলেও সরকারের পক্ষ থেকে এ রায়ের বিরুদ্ধে আবার উচ্চ আদালতে রিট করা হয়। বর্তমানে মামলাটি প্রক্রিয়াধীন।

আইনে বলা হয়েছে- একজন চেয়ারম্যান, ২০ জন উপজাতীয় সদস্য, ১০ জন অ-উপজাতীয় সদস্য, দুইজন উপজাতীয় মহিলা সদস্য এবং একজন অ-উপজাতীয় মহিলা সদস্য নিয়ে পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠিত হবে। এ ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান উপজাতীয়দের মধ্য থেকে নির্বাচিত হবেন। আর ২০ জন সদস্য উপজাতীয় সদস্যের মধ্যে সার্কেল ভিত্তিক অর্থাৎ চাকমা থেকে ১০ জন, মারমা থেকে ৪ জন, তঞ্চঙ্গ্যা থেকে ২ জন, ত্রিপুরা, লুসাই, পাংখু ও খেয়াং থেকে ১ জন করে নির্বাচিত হবেন। আর মহিলা সদস্যদের দুইজন উপজাতীয়, যে কোনো সার্কেল থেকে নির্বাচিত হতে হবে।

কিন্তু নানা জটিলতায় গত আড়াই দশকেও নির্বাচন হয়নি। ফলে বিভিন্ন সরকারের আমলে মনোনীত সদস্যের মাধ্যমে অন্তবর্তীকালীন পরিষদ দিয়ে পরিচালিত হয়ে আসছিল পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো।

পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সরকার ইতোমধ্যে ২৮-৩২টি সরকারি বিভাগ জেলা পরিষদের হাতে ন্যাস্ত করেছে। কিন্তু অনির্বাচিত অন্তবর্তীকালীন পরিষদ থাকায় বিভাগগুলোতে পর্যাপ্ত তদারকি হয় না। যার ফলে মুখ থুবরে পড়েছে উন্নয়ন কার্যক্রম।

সংবিধানের মৌলিক অধিকার ক্ষুন্ন না করে জেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা হোক এমন দাবি তুলেছেন রাঙামাটি আসনের সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় আ’লীগের নেতা দীপংকর তালুকদার। চলতি বছরের গত ৮এপ্রিল পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় কমিটির বৈঠকের মতবিনিময় সভায় আঞ্চলিক পরিষদ এবং জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার বিষয়ে এমন সুপারিশ করেছেন বলে একান্ত সাক্ষাৎকারে এমপি দীপংকর এসব কথা বলেন।

এমপি জানান, যে করে হোক পাহাড়ের উন্নয়নের জন্য পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর নির্বাচন করাতে হবে। জেলা পরিষদ নির্বাচন কি নিয়মে হবে তা জেলা পরিষদের সংবিধানে স্পষ্ট উল্লেখ আছে। যেভাবে হোক, সংবিধানের মৌলিক অধিকার যাতে ক্ষুন্ন না হয় সেদিক লক্ষ্য রেখে নির্বাচন কমিশনের সাথে আলোচনা করে যত তারাতারি সম্ভব নির্বাচন করার জন্য বৈঠকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

দীপংকর তালুকদার ক্ষোভের সাথে বলেছেন, বিভিন্ন সরকারের আমলে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অন্তর জেলাপরিষদগুলোর অন্তবর্তীকালীন পরিষদ পরিবর্তন হলেও দীর্ঘ বছর ধরে আঞ্চলিক পরিষদের কোন পট পরিবর্তন বা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। যে কারণে একই নিয়মে আঞ্চলিক পরিষদের কার্যক্রম চলছে বহু বছর ধরে।

তিনি বলেন, পাহাড়ে আমি প্রথম জেলা পরিষদ নির্বাচনের ব্যাপারে প্রস্তাবনা উত্থাপন করেছিলাম।

এক প্রশ্নে তিনি আরও জানান, জেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে হাইকোর্টে একটি মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

রাঙামাটি জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমা জানান, পাহাড়ের উন্নয়নে তথা পাহাড়ের সকল জাতি স্বত্তার মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে জেলা পরিষদের নির্বাচন জরুরী। কেননা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে। জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতবদ্ধ থাকার কারণে জণগণের উন্নয়নে তিনি কাজ করেন।

One Reply to “সংবিধানের মৌলিক অধিকার ক্ষুন্ন না করে জেলা পরিষদ নির্বাচন জরুরী: এমপি দীপংকর”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × three =

আরও পড়ুন