“স্থানীয় উপজাতিরা জানান, পাহাড়ে আমরা শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু রাজনীতির চর্চা চাই। আঞ্চলিক সশস্ত্র রাজনীতি বাধা পেরিয়ে জাতীয় রাজনৈতিক দলের হাত ধরে উন্নয়নের রাজনীতিতে শামিল হতে চায়। সাম্প্রদায়িক, বিভেদ ও ঘৃণাত্মক রাজনীতির বেড়া ডিঙ্গিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে জাতীয় চেতনার সঙ্গে থাকতে চায়। সংশ্লিষ্টরা জানান, তাদের এ  চাওয়ায় বাধ সাধছে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর নির্মম হার্ডলাইন।”
যেকোনো সময় পাহাড়ে বড় ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে

সরকারের বিরুদ্ধে একজোট হচ্ছে পার্বত্য এলাকার আঞ্চলিক দলগুলো

fec-image

গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, তিন পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির আঞ্চলিক দলগুলো এক হওয়ার জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় বৈঠক করেছে। দলগুলোর উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ শপথ নিয়েছে যদি কেউ দলত্যাগ করে তাকে হত্যা করা হবে। এমন কয়েকজনকে অপহরণ করা হয়েছে। তাদের অনেকেই আবার ‘গুমের’ শিকার হয়েছেন। পরিবারের সদস্যদের ওপর নেমে আসছে নির্মম নির্যাতন। কথিত আছে-আঞ্চলিক দলগুলোতে ঢোকা যায়, বের হওয়া খুবই কঠিন। কেউ বের হতে চাইলে তাকে চরম মূল্য দিতে হয়।

নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় এবার পার্বত্য জেলাসমূহের আঞ্চলিক দলগুলো এক সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে। তারা বর্তমানে সরকারের বিরুদ্ধে হার্ডলাইনে রয়েছে। যে কোন ইস্যুতে পার্বত্য অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি করতে অস্ত্র শক্তি প্রদর্শন করছে। উপজেলা নির্বাচনে তারা সেই বিষয়টি জানান দিয়েছে।

১৮ এপ্রিল নির্বাচনী দায়িত্ব পালন শেষে জেলা সদরে ফেরার পথে নির্মমভাবে গুলি চালিয়ে ৭ জনকে হত্যা করে। স্থানীয় লোকজন ওই ঘটনাকে আঞ্চলিক দলগুলোর যৌথ আক্রমণ বলে উল্লেখ করেছে। এখানকার প্রশাসনের কাছেও এমন খবর রয়েছে। বর্তমানে পাহাড়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

স্থানীয় লোকজন বলছে, আবার যে কোন সময় এমন কোন বড় ঘটনা ঘটতে পারে। পুলিশসহ অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীও মনে করছে পাহাড়ে শান্তি নষ্ট করার জন্য অস্ত্রধারীরা গোপনে প্রস্তুতি নিচ্ছে।

গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, তিন পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির আঞ্চলিক দলগুলো এক হওয়ার জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় বৈঠক করেছে। দলগুলোর উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ শপথ নিয়েছে যদি কেউ দলত্যাগ করে তাকে হত্যা করা হবে। এমন কয়েকজনকে অপহরণ করা হয়েছে। তাদের অনেকেই আবার ‘গুমের’ শিকার হয়েছেন। পরিবারের সদস্যদের ওপর নেমে আসছে নির্মম নির্যাতন। কথিত আছে-আঞ্চলিক দলগুলোতে ঢোকা যায়, বের হওয়া খুবই কঠিন। কেউ বের হতে চাইলে তাকে চরম মূল্য দিতে হয়।

দুর্গম অঞ্চল হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। অনেক সময় নিজেদের অন্তর্দ্বন্দ্বে খুন হওয়া ব্যক্তির দায়ভার তুলে দেয়া হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর। তিন পার্বত্য জেলায় বর্তমানে চার আঞ্চলিক সংগঠন বেশ সক্রিয়।

এগুলো হচ্ছে জ্যেতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ( জেএসএস), জেএসএস (সংস্কার), ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রট ( ইউপিডিএফ) ও ইউপিডিএফ (সংস্কার)। এছাড়া এসব সংগঠনগুলোর পৃথক অঙ্গ সংগঠন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন, যুব সমিতি, মহিলা সমিতি ও গণতান্ত্রিক যুব ফোরামসহ একাধিক শাখার সংগঠন রয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, শান্তি চুক্তির পর গত ২১ বছরে সশস্ত্র গ্রুপগুলোর দ্বন্দ্বে ৮ শতাধিক মানুষ খুন হয়েছে। অপহরণ ও গুম হয়েছে ১৫ শ’র বেশি মানুষ। উপজাতি সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর কাছে মূলত জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারণ পাহাড়ীরা। মূলধারার রাজনীতি সঙ্গে জড়িতরাও সন্ত্রাসী সংগঠনের কাছে অসহায়।

ইউপিডিএফজেএসএস ছাড়া মূলধারার যে কোন রাজনৈতিক দলে যোগ দিলেই তাদের ওপর নেমে আসে নানা ধরনের নির্যাতন। এমন অনেক উদাহরণ আছে সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামজুড়ে।

স্থানীয় লোকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত ১৪ এপ্রিল জেএসএস ছেড়ে আওয়ামী লীগ সমর্থন করায় অংক্যচিং মারমা নামে এক ব্যক্তিকে গুলি করে উপজাতি সন্ত্রাসীরা। রাত ১০টার দিকে বান্দরবান জেলার রাজবিলা ইউনিয়নের তাইংখালী বাজারপাড়ায় এই ঘটনা ঘটে।

অংক্যচিং মারমা এক সময় সন্তু লারমার দল জেএসএস এর হয়ে সশস্ত্র কার্যক্রম চালাতেন। তখন সে রাঙ্গামাটি জেলার রাজস্থলী এলাকায় বসবাস করত। এক পর্যায়ে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। তখন থেকেই অংক্যচিং মারমাকে হুমকি দিতে থাকে জেএসএস
প্রাণভয়ে অংক্যচিং মারমা রাজস্থলীতে তার নিজ ভিটেমাটি ছেড়ে সপরিবারে ৮ বছর আগে বান্দরবান জেলার রাজবিলা ইউনিয়নে এসে বসতি গড়ে। এরপর অংক্যচিং মারমা মূলধারার রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগে যোগ দেন।

অংক্যচিং মারমার ছেলে বাবুল মারমা রাজবিলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে বর্তমানে সক্রিয়। বর্তমানে অংক্যচিং চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। তিন পার্বত্য জেলায় এরকম আরও অনেকেই আছেন যারা আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা মূলধারার রাজনীতি করার অপরাধে অপহৃত হয়ে লাশ হয়ে ফিরেছেন। আবার কেউবা মুক্তিপণ দিয়ে ফিরেছেন।

অনেকেই আছেন যারা অপহরণের পর তাদের পরিবার এখনও জানে না তিনি বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন। যেমনটি হয়েছে, বান্দরবানের আওয়ামী লীগ নেতা মংপ্রু মারমার ক্ষেত্রে।

২০১৬ সালের ১৩ জুন অপহৃত হন তিনি। এরপর থেকে খোঁজ নেই তার। স্বামীর অপেক্ষায় চোখের পানি ফেলছেন স্ত্রী সামা প্রু মারমা। মংপ্রু মারমা বান্দরবান সদর থানার ১ নম্বর রাজবিলা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক মেম্বার এবং সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন।

১৩ জুন রাত ১০টার দিকে প্রতিবেশী ক্রানু মারমার ঘরে বসে টিভি দেখছিলেন মংপ্রু মারমা। এ সময় দুর্বৃত্তরা এসে অস্ত্রের মুখে তাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। সেই থেকে আজও নিখোঁজ আছেন মংপ্রু মারমা

এই ঘটনায় মংপ্রুর জামাতা হামংচিং মারমা বাদী হয়ে বান্দরবান সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার সকল আসামিই জেএসএসের সদস্য। ওই সময়ে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মংপ্রু মারমা আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করায় দুর্বৃত্তরা নির্বাচনের আগে থেকেই তাকে হুমকি দিয়ে আসছিল।

নির্বাচনের পরেও তারা একাধিকবার হুমকি দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তাকে অস্ত্র ঠেকিয়ে অপহরণ করে নিয়ে যায়। জেএসএসের মতো একইভাবে সন্ত্রাসের পথে হাঁটছে ইউপিডিএফ

২০১৬ সালের ২৯ নবেম্বর খাগড়াছড়িতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের জনসভায় যোগ দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন নীলবর্ণ চাকমা।

জেলার লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার বর্মাছড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের এই সভাপতিকে রাস্তা থেকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে নিয়ে যায় ১০-১২ সন্ত্রাসী। ওবায়দুল কাদেরের জনসভায় যোগ দেয়াই ছিল তার অপরাধ। ‘জীবনে আর কোন দিন আওয়ামী লীগ করব না’- এমন মুচলেকা দিয়ে তিনদিন পর অপহরণকারীদের কাছ থেকে নীলবর্ণ চাকমার মুক্তি মেলে।

স্থানীয়রা জানান, জেএসএস গ্রুপের শক্ত ঘাঁটি হলো পার্বত্য রাঙ্গামাটি জেলা। সন্তু লারমা, ঊষাতন তালুকদারসহ পার্বত্যাঞ্চলের এই আঞ্চলিক সংগঠনটির প্রভাবশালী নেতাদের বাস এই জেলাতেই।

২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রাঙ্গামাটির জুরাছড়ি উপজেলায় প্রায় সাড়ে ৪শ’ উপজাতি সম্প্রদায়ের লোক ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। এরপর থেকে ওই এলাকায় তাদের ওপর নেমে আসে প্রাণনাশের হুমকি। এসময় জেএসএস হামলা চালিয়ে হত্যা করে জুরাছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের অন্যতম সাংগঠনিক সম্পাদক অরবিন্দু চাকমাকে।

প্রাণনাশের জন্য হামলা চালিয়ে গুরুতরভাবে জখম করা হয় বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি রাসেল মার্মা, রাঙ্গামাটি জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ঝর্ণা খীসাসহ অনেক নেতাকর্মীকে। জেএসএস এর লাগাতার সহিংসতার মুখে ওই সময় আওয়ামী লীগ ছাড়তে বাধ্য হয় শতশত উপজাতি নেতা।

স্থানীয় উপজাতিরা জানান, পাহাড়ে আমরা শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু রাজনীতির চর্চা চাই। আঞ্চলিক সশস্ত্র রাজনীতি বাধা পেরিয়ে জাতীয় রাজনৈতিক দলের হাত ধরে উন্নয়নের রাজনীতিতে শামিল হতে চায়। সাম্প্রদায়িক, বিভেদ ও ঘৃণাত্মক রাজনীতির বেড়া ডিঙ্গিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে জাতীয় চেতনার সঙ্গে থাকতে চায়। সংশ্লিষ্টরা জানান, তাদের এ  চাওয়ায় বাধ সাধছে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর নির্মম হার্ডলাইন।

ঘটনাপ্রবাহ: ইউপিডিএফ, জেএসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × one =

আরও পড়ুন