সিএইচটি কমিশনের উপর হামলা কেন?

Rangamati pic-05-07-14-1

গাজী সালাউদ্দীন

গত ৪ ও ৫ জুলাই পার্বত্য চট্টগ্রামে সিএইচটি কমিশনকে সাধারণ জনতা কর্তৃক প্রতিরোধের ঘটনা বিভিন্ন মহল যেভাবেই সংজ্ঞায়িত করুক না কেন, প্রকৃতপক্ষে এটি নিছক একটি হামলা কিংবা আকস্মিক কোন ঘটনা নয়। এটি ছিল শাসন ও শোষণের  বিরুদ্ধে খেটে খাওয়া মানুষের দীর্ঘ দিনের পূঞ্জিভুত  ক্ষোভ ও অসন্তোষেরই বহিঃপ্রকাশ। উপজাতীয় অত্যাচার, নির্যাতন, গণহত্যা এবং উক্ত কমিশনের একপেশে আচরণের বিরুদ্ধে বাঙ্গালীদের এক বজ্রদীপ্ত প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ।

 

সিএইচটি কমিশন কি, কিংবা এর কার্যক্রম ও উদ্দেশ্যই বা কি- এ সর্ম্পকে দেশবাসী এমনকি পার্বত্য চট্টগ্রামেরও অধিকাংশ মানুষের অজানা। যতদূর জানা যায়, সিএইচটি কমিশন বা পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক কমিশন হলো  আন্তর্জাতিক মহলের একটি বিশেষ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে  গঠিত একটি কমিশন, যার কো চেয়ারম্যান হলেন বৃটিশ আইন সভার একজন লর্ড। যার কিনা সাম্প্রতিক সময়ে গঠিত পূর্ব  তিমুর এবং দক্ষিণ সুদান রাষ্ট্র গঠনে বিতর্কিত ভূমিকা রয়েছে। এমনকি এই কমিশনের বাংলাদেশ থেকে নিযুক্ত  অন্যান্য সদস্যরাও বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে বিতর্কিত।

এই কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্য যাই থাকুক না কেন, অতীত ইতিহাস ও বিগত বছরগুলোতে এর কার্যক্রম ও আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম সর্ম্পকে তাদের ভুমিকা যে একপেশে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, রাষ্ট্রবিরোধী তা বুঝতে বড়মাপের কোন গবেষক অথবা বুদ্ধিজীবী হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। সচেতন লোক মাত্রেই এটিই উপলদ্ধি করতে পারবেন।

ইতিহাসের পাতা থেকে যতদূর জানা যায়, প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলার অবিচ্ছদ্য অংশ ছিল। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের পর থেকেই একটি গোষ্ঠির রাজনৈতিক উচ্চাভিলাসী মনোভাব এবং আমাদের সরকারগুলোর অদূরদর্শী পার্বত্যনীতির কারণে সেখানে অসংখ্য মানবতা বিরোধী অপরাধ সংগঠিত হয়েছে। বলাবাহুল্য, এর সবগুলোই পরিচালিত  হয়েছিল একটি  বিশেষ গোষ্ঠী কর্তৃক, যা সম্ভব হয়েছিল আমাদের  পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের প্রত্যাক্ষ সহযোগিতায়।

পার্বত্য এলাকার এই উত্তপ্ত  পরিস্থিতিতে কতগুলো গণহত্যা হয়েছিল অথবা কী পরিমাণ লোকজন নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তার সঠিক পরিসংখ্যন না থাকলেও ধারণা করা হয় প্রায় ৪০ হাজারের অধিক বাঙ্গালী (যাদের অধিকাংশই সরকার কর্তৃত পূনর্বাসিত) এবং অসংখ্য সেনা, বিডিআর, আনসার, পুলিশ শহিদ হয়েছিল। উপজাতীরা যে  ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এমনটি নয়। বিভিন্ন সময়ে সংগঠিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় অসংখ্য পাহাড়িরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যাহোক, সবকিছু মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর জাতীয় ইস্যু। পার্বত্য চট্টগ্রামের এরূপ নাজুুক পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে একটি বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে কাজ করে যাচ্ছে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক ও জাতীয় কুচক্রি  মহল। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, সিএইচটি কমিশন তাদেরই একটি। পার্বত্য চট্টগ্রামের ৪০ বছরের ইতিহাসে সেখানে বাঙ্গালীরাই বেশি আক্রান্ত জাতি। অথচ এ  ব্যাপারে কমিশনকে কখনো দুঃখ প্রকাশ করতে কেউ শোনেনি।

কিন্তু একজন উপজাতী কোনভাবে দুর্ঘটনার স্বীকার হলেই এরা বৈঠক, সেমিনার, প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে বর্হিঃবিশ্বে বাংলাদেশ সরকার ও সেনাবাহিনীকে জড়িয়ে অপপ্রচারে লিপ্ত হয়। যার ফলে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ ও শান্তির মূর্ত প্রতীক সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন হয়। ‘Life is not ours’ এর ধারাবাহিক প্রকাশ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সতরাং সিএইচটি কমিশনের কার্যক্রম যে সুদীর্ঘ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত এতে কোন সন্দেহ নাই।

এই সংগঠনের আরেকটি বিষয় খুবই উল্লেখযোগ্য- সেটি হলো ‘আদিবাসী’ শব্দের উদ্দেশ্যমূলক ব্যবহার। এরা কথায় কথায় এবং এদের অফিসিয়াল বিভিন্ন ডুকুমেন্টস-এ  পার্বত্য চট্টগ্রামে  বসবাসকারী  উপজাতি সম্প্রদায়গুলোকে আদিবাসী বলে উল্লেখ করে। যেখানে বাংলাদেশ সরকার আদিবাসী শব্দের ক্ষতিকর প্রভাব বুঝতে পেরে বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে শব্দটি ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে- সেখানে এই কমিশনের গায়ের জোরে আদিবাসীর শব্দের ব্যবহার রাষ্ট্রদ্রোহীতার শামিল। আদিবাসী ইস্যু একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের  জন্য কতটা হুমকি স্বরূপ তা সকলেরই জানা আছে।

যাহোক, সম্প্রতি যে বিষয়টি নিয়ে এই কমিশন গণমাধ্যমগুলোতে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে তা হলো  গত ৪ জুলাই খাগড়াছড়িতে ও রাঙ্গামাটিতে উদ্দেশ্ মূলক সফর এবং জনগণ কর্তৃক প্রতিরোধের চেষ্টা। এই কমিশনের পার্বত্য এলাকা সফরের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে বাঙ্গালী ভিত্তিক সংগঠনগুলো অবরোধের ডাক দিয়েছিল। কিন্তু অবরোধ উপেক্ষা করে কমিশন খাগড়াছড়ি সফরকালে বিতর্কিত কর্মকান্ডের জন্য  হাজার হাজার  বাঙ্গালীর জুতা নিক্ষেপের শিকার হয়। পরদিন  গোপনে রাঙ্গামটি সফরকালে সেখানেও সাধারণ বাঙ্গালীদের প্রতিরোধের মুখে পরতে হয় তাদের। সেখান থেকে ফিরে গিয়ে কমিশনের কো-চেয়ারম্যান একটি প্রশ্ন রেখেছিলেন, পার্বত্য এলাকায় বাঙ্গালীরাতো অনেক পিছিয়ে আছে। তাহলে তারা এত শক্তি পেল কোথায় ?

এর উত্তর হতে পারে মানুষের যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় তখন সে বাঁচার জন্য সর্বশেষ চেষ্টাটাই করে। এক্ষেত্রেও  কাজটি  তেমনি  হয়েছে। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামে মানুষ যুগযুগ ধরে দেখে এসেছে- এদের মুখ থেকে ঠিক এর উল্টোটা শোনা যায়।

পাহাড়ে  বসবাসকারী মোট জনসংখ্যা অর্ধেক বাঙ্গালী। অথচ বিভিন্ন  রাষ্ট্রিয়  সুবিধা দেওয়া ফলে শিক্ষা, চাকুরী সামাজিক, রাজনৈতিক  ইত্যাদি ক্ষেত্রে উপজাতীরা অনেক  অগ্রসর, পক্ষান্তরে চরম বৈষম্যর শিকার বাঙ্গালীরা রয়েছে প্রায়  শূন্যর কোঠায়।  বাঙ্গালীরা সেখানে দুমুঠো ভাত খাওয়া জন্য দিবা-রাত্রি সংগ্রাম করতে হচ্ছে। মোট কথা উপজাতি- বাঙ্গালীদের মধ্যে সেখানে রাজা-প্রজা  সর্ম্পক বিদ্যমান। সেখানে যদি উল্টো বাঙ্গালীদেরকেই  নির্যাতনকারী, জবর দখলকারী হিসেবে কেউ উল্লেখ করে সেক্ষেত্রে  বাঙ্গালীদের আবেগে  খোঁচা লাগতেই পারে। কাজেই এই ধরনের প্রতিরোধ অস্বাভাবিক  নয়।

এখানে বাঙ্গালীদের জেএসএস- ইউপিডিএফের মত  কোন সশস্ত্র সংগঠন নাই। তাদের অস্ত্রের  জোর নাই। চাঁদাবাজির অর্থ নাই যা দিয়ে কমিশনের লোকদের ম্যানেজ করতে  পারবে।  তাই বিক্ষোভ প্রদর্শন করে  জুতা  নিক্ষেপ করে  প্রতিবাদই  তাদের সবচেয়ে  বড় ও  চুড়ান্ত প্রতিবাদ। রাঙ্গামাটিতে গাড়ি বহরে হামলার কারণ অনুসন্ধান করতে  গিয়ে গণমাধ্যম কর্মিদের চোখে  সিএইচটি  কমিশনের পক্ষপাতমুলক আচরণ ও রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি  উঠে আসে। এই সম্পর্কে বিভিন্ন  প্রশ্নোত্তরে তারা সঠিক  জবাব দিতে পারেনি  এবং অনেক কিছুই কৌশলে  এড়িয়ে গেছে। এ সময় তারা  কিছুটা নরম স্বরে  বাঙ্গালীদের  সাথেও আলোচনা প্রস্তাব দিয়েছেন বলে দাবী করেন। কিন্তু  বাস্তবে এটিও ছিল একটি চরম মিথ্যাচার।

আদৌ এই কমিশনের জন্মলগ্ন থেকে অদ্যবদি পার্বত্য বিষয়ে কোন বাঙ্গালী নেতৃবৃন্দের  সাথে আলোচনার ইতিহাস  নাই। অথচ পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেকেরও বেশি লোক বাঙ্গালী  (যাদেরকে কমিশন সেটেলার  সন্ত্রাসী বলে  আখ্যায়িত করেছেন)। এখানে  বসবাসরত দুইটি পক্ষের  মধ্যে একটি পক্ষ নিয়ে কাজ করতে  আসবেন  এবং  অপর  পক্ষটিকে ভিটেমাটি ছাড়া করতে  চাইবেন তখন  এ ধরণের ঘটনা অস্বাভাবিক নয়।

সুলতানা কামালের দল খাগড়াছড়ি ত্যাগ করার দুই দিন পর ৪ জন বাঙ্গালীকে  উপজাতী  সন্ত্রাসীরা অপহরণ করেছে। আজ এক সপ্তাহ পার হয়ে গেল,  কই এই ঘটনা নিয়ে তো  তাদের কেউ বিবৃতি  দিলো না। কোন কমিশন নিন্দা জানালো না। অথচ আবুুল  মকসুদের মত ব্যাক্তিরাও ঢাকায় বসে বাণী ছাড়ে-পার্বত্য অঞ্চলে কথা বলার  স্বাধীনতা নেই!  হ্যা, মকসুদ সাহেব ঠিকই বলেছেন, সেখানে কথাবলার  স্বাধীনতা নেই। তবে এই কথাটিই পাহাড়িদের  নয় বাঙ্গালীদের জন্য প্রজোয্য।

পরিশেষে   সিএইচটি কমিশনের উদ্দেশ্যে পার্বত্য  বাঙ্গালীদের পক্ষ থেকে একটি কথাই বলতে চাই, সত্যিকারার্থে  যদি পার্বত্য  এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চান তাহলে একটি  পক্ষের স্বার্থকে বাদ দিয়ে নয় বরং বসবাসকারী সকল মানুষের মানবিক অধিকারের দিকে  দৃষ্টি  দিয়ে কাজ করুন। তবেই স্থায়ী  শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। 

ঘটনাপ্রবাহ: আদিবাসী, উপজাতি, পাহাড়ী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ten + 17 =

আরও পড়ুন