স্থল বন্দরের সঠিক স্থান নির্ধারণে পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী নজর দেবেন কি?

download
মো. আবুল বাশার নয়ন::

পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় প্রবাহমান নদী সমূহের সীমানা নির্ধারণ, নাব্যতা হ্রাস এবং মিয়ানমার সীমান্তে স্থল বন্দর নির্মাণে উদ্যেগ নিচ্ছে সরকার। এ সংক্রান্ত সম্ভাব্য করণীয় নির্ধারণে গত রবিবার নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এদিকে পার্বত্য এলাকায় স্থল বন্দর নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির চাকঢালা ও ঘুমধুম সীমান্ত। স্থানীয়দের মতে সম্ভাব্য চাকঢালা, আশারতলী ও ঘুমধুমের যেকোন একটি সুবিধাজনক স্থানে ট্রানজিট পয়েন্ট স্থাপন করা গেলে পার্বত্য এলাকার মানুষ উপকৃত হবে।

তবে সর্বশেষ রবিবার সচিবালয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় নদীর সীমানা নির্ধারণ, নাব্যতা বৃদ্ধি এবং স্থলবন্দর নির্মাণ সংক্রান্ত সভায় খাগড়াছড়ির রামগড়ে, বান্দরবানের ঘুমধুম স্থলবন্দর ও রাঙ্গামাটির থেগামুখ স্থলবন্দর স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান।

সূত্র মতে, ১৯৯৬-২০০১ সনে তৎকালীন সরকার আমলে ডুলহাজারা থেকে শাহসুজা সড়কের আশারতলী হয়ে মিয়ানমারের সাথে বাণিজ্যের জন্য স্থল বন্দর নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হয়। ওই সময় তৎকালীন মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন এ স্থল বন্দর কার্যক্রমে সহায়তা করেন। কিন্তু পরবর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর কক্সবাজার জেলার এক এমপি এটিকে সরিয়ে ঘুমধুমে নিয়ে যান।

স্থানীয়দের মতে, ঘুমধুমে স্থল বন্দর হলে পার্বত্য এলাকার মানুষের তেমন কোনো প্রকার উপকার হবে না। কারণ মিয়ানমারের জিরো পয়েন্ট থেকে কাষ্টম মেইন রোড় পর্যন্ত মাত্র কয়েক’শ গজ এলাকা পড়েছে বান্দরবানের (ঘুমধুম ইউনিয়নে)। বাকী পুরো এলাকা কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলায়।

অন্যদিকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির চাকঢালায় স্থল বন্দর নির্মিত হলে পার্বত্য এলাকার মানুষ সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে। কারণ চাকঢালা জিরো পয়েন্ট থেকে রামুর প্রধান সড়ক পর্যন্ত প্রায় ১৫কি.মি. এলাকা পড়েছে বান্দরবানে। এছাড়াও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি দিয়ে বড় কোনো নদ-নদী নেই। অতিরিক্ত কোনো বরাদ্দেরও প্রয়োজন নেই স্থল বন্দর নির্মাণে।

সরকার যদি সত্যিকারার্থে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে কাজ কারতে চায়, তাহলে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে স্থল বন্দর নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই।

সূত্র মতে, সম্ভাব্য তিনটি ট্রানজিট পয়েন্ট এর মধ্যে চাকঢালা ও আশারতলী দুটি পয়েন্ট নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা সদরে অবস্থিত। অপরটি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নে। বর্তমানে চাকঢালা চেরারমাঠ সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের জনবহুল ওয়ালিডং, ফকিরাবাজার হয়ে মংডু ও আকিয়াব শহরে সহজেই যাতায়ত সম্ভব, মাঝখানে বড় কোনো নদীও নেই।

গত কয়েক বছর পূর্ব থেকে মিয়ানমারের ওপারে সীমান্ত সড়কগুলোও উন্নয়ন করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশ সীমান্তে ট্রানজিট পয়েন্ট স্থাপনে বড় ধরনের কোনো বাজেটেরও প্রয়োজন নেই। কয়েকটি ব্রিজ, কার্লভাট ও সীমান্তের কিছুটা সড়ক সংস্কার করা হলে দেশের উন্নত একটি বাণিজ্যিক পয়েন্ট চাকঢালা হবে বলে সচেতন মহল দাবী করেছেন।

বান্দরবান পার্বত্য জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত পিলার ৪৩-৪৪ এর প্রায় তিন কি.মি. মধ্যবর্তী সুবিধাজনক স্থানে বাংলাদেশ-মিয়ানমার স্থল পথে সীমান্ত বাণিজ্যের এক নতুন ট্রানজিট পয়েন্ট হতে পারে এবং এটি এলাকার গণমানুষের দাবীতেও পরিণত হয়েছে। চাকঢালার বাণিজ্যিক ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে সরকারিভাবে বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে অবকাঠামো গড়ে তোলা হলে এখানে কক্সবাজারের টেকনাফের চেয়েও সহজ ও আধুনিক বাণিজ্যিক ট্রানজিট পয়েন্ট গড়ে তোলা সম্ভব বলে অভিজ্ঞজনের অভিমত।

অপরদিকে ঘুমধুম কিংবা আশারতলী এলাকায় বাণিজ্যিক পয়েন্ট করা হলে এতে বান্দরবানের চেয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করবে পার্শ্ববর্তী কক্সবাজার জেলার রামু, উখিয়া ও টেকনাফ এলাকার জনসাধারণ। এ জন্য সুধূর প্রসারী চিন্তার মাধ্যমে ট্রানজিট পয়েন্ট স্থাপনের জন্য সরকারের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছে পার্বত্য জেলার মানুষ।

জানা গেছে, বাংলাদেশের চাকঢালা ও মিয়ানমারের ওয়ালিডং এলাকার উপর দিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার সহজ হওয়ার কারণে বিভিন্ন সময়ে সীমান্তের লোকজন প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে দু’দেশের স্থানীয় গরীব জনসাধারণের নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানী রপ্তানি করে থাকে। এজন্য এ সড়ক দিয়ে বাণিজ্যিক ট্রানজিট চালু হলে অবৈধভাবে আমদানী-রপ্তানী বন্ধসহ সহজ যাতায়তের মাধ্যমে সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে সক্ষম হবে।

এতে করে পার্বত্য সীমান্ত এলাকার উন্নয়ন বঞ্চিত জনসাধারণের কর্মসংস্থানসহ দু’দেশের বন্ধুত্ব ও অর্থনৈতিক লেনদেনে অগ্রগতি সাধিত হবে।

এ ব্যাপারে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফরিদুল আলম বলেন, পার্বত্য এলাকার মানুষের উন্নয়ন করতে হলে চাকঢালা চেরারমাঠ সড়ক দিয়েই ট্রানজিট পয়েন্ট স্থাপন করা প্রয়োজন। এ সড়ক দিয়ে ট্রানজিট পয়েন্ট স্থাপন হলে সরকারের রাজস্ব আদায়সহ সর্বপ্রকার সুবিধা হবে।

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়নে আওয়ামীলীগ মনোনীতি প্রার্থী তসলিম ইকবাল চৌধুরীসহ স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দরা জানিয়েছেন, ইতিপূর্বে বান্দরবান ৩০০ নং আসনের সংসদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যান (বর্তমানে প্রতিমন্ত্রী) বীর বাহাদুর (উশৈচিং) নাইক্ষ্যংছড়ি সফরকালে চাকঢালা চেরারমাঠ এলাকায় সীমান্ত বাণিজ্যিক ট্রানজিট পয়েন্ট স্থাপন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাই এটি স্বপ্ন নয় প্রতিমন্ত্রী চাইলে নাইক্ষ্যংছড়ি স্থল বন্দরকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেন বলেও মনে করেন তিনি।

উল্লেখ্য, নাইক্ষ্যংছড়ির চাকঢালা এলাকায় বাণিজ্যিক ট্রানজিট পয়েন্ট স্থাপন হলে দু’দেশের মধ্যে গভীর বন্ধুত্বের পাশাপাশি দু’দেশের প্রয়োজন মাফিক আমদানী-রপ্তানির নতুন এক দীগন্ত উম্মোচিত হবে। এ ব্যাপারে এলাকাবাসী সরকারের সিদ্ধান্ত ও সুদূর প্রসারী পরিকল্পনার ভিত্তিতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের চাকঢালা চেরারমাঠে একটি বাণিজ্যিক ট্রানজিট স্থাপনে দাবী জানিয়েছেন।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

9 − eight =

আরও পড়ুন