“১৯৯৭ সালে শান্তি ফেরাতে পার্বত্য চট্টগ্রামে যে চুক্তি করা হয়েছিলো চুক্তি অনুসারে পাহাড়ে আর কোন অবৈধ অস্ত্র থাকার কথা নয়। কিন্তু পাহাড়ে প্রতিনিয়ত অবৈধ অস্ত্র ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পেয়েছে”

১৯৮৬ সালের গণহত্যার বিচারের দাবিতে মানববন্ধন

১৯৮৬ সালের ২৯ এপ্রিল জেএসএস কর্তৃক সংগঠিত গণহত্যার বিচার দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছে পার্বত্য অধিকার ফোরাম ঢাকা মহানগর শাখা।

সোমবার (২৯ এপ্রিল) সকাল ১০টায় শুরু হওয়া মানববন্ধনে পাহাড়ে সশস্ত্র সশন্ত্রীদের অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানী, হত্যা, গুম, ধর্ষণ চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানানো হয়।

মানববন্ধনের প্রধান অতিথি ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তারিক হোসেন খান।

মানববন্ধনে প্রধান অতিথি বলেন, ১৯৯৭ সালে শান্তি ফেরাতে পার্বত্য চট্টগ্রামে যে চুক্তি করা হয়েছিলো চুক্তি অনুসারে পাহাড়ে আর কোন অবৈধ অস্ত্র থাকার কথা নয়। কিন্তু পাহাড়ে প্রতিনিয়ত অবৈধ অস্ত্র ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিনিয়ত পার্বত্য চট্টগ্রাম খবরের শিরোনাম হচ্ছে। সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় এই সকল সন্ত্রাসীদের অব্যাহত হত্যা, চাঁদাবাজি ও নির্যাতনে অতিষ্ঠ।

তিনি তার বক্তব্যে পাহাড়ে কাঙ্খিত শান্তি ফেরাতে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানী, হত্যা, গুম, ধর্ষণ ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে এখনই রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার দাবি জানান।

মানববন্ধনে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত থেকে পার্বত্য অধিকার ফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. মাঈন উদ্দীন বলেন, ১৯৮৬ সালের ২৯ এপ্রিল সংগঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম  গণহত্যার বর্বরতা কোন অংশে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে কম নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি সন্ত্রাসী সংগঠন ‘শান্তিবাহিনী’ কর্তৃক অসংখ্য বর্বরোচিত, নারকীয় ও পৈশাচিক হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে পার্বত্য অঞ্চলের বাঙালিরা। কিন্তু কোন এক অলৌকিক কারণে বাঙালিদের উপর সন্ত্রাসীদের চালানো এসব নির্যাতনের চিত্র প্রচার মাধ্যমে তেমন স্থান পায়নি। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নির্যাতনকারী উপজাতিরা নিজেদের নৃশংসতার স্বরূপকে ঢেকে তিলকে তাল বানিয়ে দেশে-বিদেশে নিজেদের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে যে পার্বত্য চট্টগ্রামে তারা অত্যাচারিত।

কতিপয় উপজাতি সাইবার এক্টিভিস্ট এবং তথাকথিত সুশীল সমাজ কর্তৃক অর্থের বিনিময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের উপর সন্তু লারমার শান্তিবাহিনী দ্বারা সংঘটিত এসব গণহত্যার সম্পর্কে বিদেশি ও দেশের মানুষকে ভুল বোঝানো হয়। এতে করে সর্বমহলে ধারণা জন্মেছে যে, পার্বত্যাঞ্চলের আসলে উপজাতিরাই নির্যাতনের শিকার।

কাগজে-কলমে শান্তিবাহিনী না থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দৌরাত্ম্য কমেনি, বরং তাদের হাতে বাঙালিরা যেমন হত্যার শিকার হচ্ছে, তেমনি নিহত হচ্ছে উপজাতি জনগোষ্ঠীগুলোর মানুষজনও। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তির অন্বেষায় সরকার শান্তিচুক্তি করলেও সন্তু লারমার শান্তিবাহিনীর বিকল্প জেএসএস (সন্তু), জেএসএস (সংস্কার), ইউপিডিএফ (প্রসীত) এবং ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নামক চারটি সন্ত্রাসী বাহিনী গঠিত হয়েছে। এই চার সংগঠন এখন পাহাড়ের সকল জনগোষ্ঠীকে কোণঠাসা করে রেখেছে। তারা পাহাড়ের সাধারণ মানুষের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক। কখন কার উপর তারা যমদূতের মতো আবির্ভূত হয় তা নিয়ে শঙ্কিত থাকে পাহাড়ের মানুষ।

শান্তিচুক্তির পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনী কর্তৃক অসংখ্য গণহত্যা চালানো হয়। তাদের এইসব গণহত্যার শিকার পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালি ও উপজাতি জনগোষ্ঠীর মানুষগুলো। এমনকি শান্তিবাহিনীর বর্বর হত্যাকান্ড থেকে রেহায় পায়নি পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও।

পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত অসংখ্য হত্যাকান্ডের মধ্যে অন্যতম হল ১৯৮৬ সালের ২৯ এপ্রিলে সংঘটিত তিন তিনটি গণহত্যা। এগুলো হলো- পানছড়ি গণহত্যা, দিঘীনালা গণহত্যা ও মাটিরাঙা গণহত্যা।

সেদিন দিবাগত রাত আনুমানিক ৯টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত একযোগে চালানো হয় পানছড়ি গণহত্যা, দিঘীনালা গণহত্যা ও মাটিরাঙা গণহত্যা।

এদিনে খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার লোগাং, চেঙ্গী, পানছড়ি, লতিবান, উল্টাছড়ি এই ৫টি ইউনিয়নের ২শ’ ৪৫টি গ্রামের প্রত্যেকটি বাঙালি গ্রামে; দীঘিনালা উপজেলার মেরুং, বোয়ালখালী, কবাখালী, দিঘীনালা, বাবুছড়া এই ৫টি ইউনিয়নের ২শ’ ৪৫টি গ্রামের প্রত্যেকটি বাঙালি গ্রামে এবং মাটিরাংগা উপজেলার তাইন্দং, তবলছড়ি, বর্ণাল, বেলছড়ি, আমতলি, গোমতি, মাটিরাংগা, গুইমারা এই ৮টি ইউনিয়নের ৩শ’ ২৫টি গ্রামের প্রত্যেকটি বাঙালি গ্রামে অগ্নিসংযোগসহ লুটতরাজ, হত্যা, বাঙালি নারীদের গণধর্ষণ ও পরে হত্যা করে নারকীয়তা সৃষ্টি করেছিলো সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসি জেএসএস) এর সশস্ত্র সংগঠন শান্তিবাাহিনীর সন্ত্রাসীরা।

মাত্র কয়েক ঘন্টা সময়ের মধ্যে তারা পানছড়ি এলাকায় ৮শ’ ৫৩ জন, দিঘীনালা এলাকায় ৮শ’ ৯৮ জন এবং মাটিরাঙ্গা এলাকায় ৬শ’ ৮৯ জন নিরস্ত্র নিরীহ বাঙালি নারী, শিশু, আবাল-বৃদ্ধ বনিতাকে হত্যা করে। হাত-পা বেঁধে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে, দা-দিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে, জবাই করে, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নানা ভাবে কষ্ট দিয়ে হত্যা করেছিল এই অসহায় বাঙালি মানুষগুলোকে। প্রতিটি লাশকেই বিকৃত করে সেদিন চরম অমানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল তারা।

ওই ঘটনায় পানছড়ি এলাকায় আহত হয় ৫শ’ জনের অধিক বাঙালি। ৬ হাজার ২শ’ ৪০টি বাঙালিদের বাড়ি লুটতরাজ করে সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে দেয় উপজাতি সন্ত্রাসীরা। দিঘীনালা এলাকায় আহত হয় ১ হাজার ২শ’ জনের অধিক বাঙালি। ৭ হাজার ৩শ’ ৪টি বাড়ি লুটতরাজ করে সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে দেয় উপজাতি সন্ত্রাসীরা। মাটিরাঙ্গা এলাকায় আহত হয় ৮শ’ জনের অধিক বাঙালি। ৯ হাজার ৪৮টি বাড়ি উপজাতি সন্ত্রাসীদের কর্তৃক লুটতরাজ করে সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে দেয়া হয়।

তিনটি ঘটনাতে অপহরণ ও গুমের শিকার হয় কয়েক হাজার বাঙালি। সেদিন কতিপয় বাঙালি প্রাণে বেঁচে গেলেও এই ঘটনায় গৃহহীন হয়ে পড়ে হাজার হাজার বাঙালি পরিবার। ঘটনাটি স্বচক্ষে দেখা এবং বেঁচে যাওয়া কিছু কিছু সাক্ষী আজও আছে। কিন্তু ঘটনার বীভৎসতার কথা মনে পড়লে আজও তাদের চোখে মুখে আতঙ্ক ফুটে ওঠে।

১৯৮৬ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও ভূক্তভোগী উপস্থিত ছিলেন খাগড়াছড়ির আলাউদ্দীন পাটোয়ারী ও পানছড়ি থেকে উপস্থিত ছিলেন আবু বক্কর ছিদ্দিক।

ঢাকা মহানগর সভাপতি আহম্মেদ রেদোয়ানের সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য রাখেন বিশেষ বক্তা সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মেজর সারোয়ার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের ছাত্র এম এ মুহিত, গবেষক আসাদুজ্জামান আসাদ, বেসরকারি কর্মকর্তা খালেদ আহম্মেদ ফেরদৌস, গভ. তিতুমীর কলেজ ছাত্রী ফারহানা নুসরাত, ওয়াল্র্ড ইউনিভার্সির ছাত্রী ফারিয়া জাহান নিশি, সাব্বির রহমান প্রমুখ।

মানববন্ধন থেকে বক্তরা নিম্নলিখিত ৫ দফা দাবি পেশ করেন।

 

১. ১৯৮৬ সালের ২৯ এপ্রিল সংগঠিত গণহত্যাসহ পাহাড়ে সকল গণহত্যায় শহীদের নাম ও তালিকাসহ স্মৃতি ফলক নির্মাণ করতে হবে।

২. গণহত্যায় নিহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদান ও দোষীদের বিচারের আয়তায় আনতে একটি নিরপেক্ষ কমিশন গঠণ করতে হবে।

৩. ১৯৮৩ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হামলা ও অগ্নি সংযোগে ঘরবাড়ি বাড়ি হারিয়ে গুচ্ছগ্রামে আশ্রয় নেওয়া ৩৮ হাজার বাঙালি পরিবার কে যথাযথ পুনর্বাসনসহ পুনর্বহাল করতে হবে।

৪. ৪ টি সশস্ত্র সন্ত্রাসী দলের অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানী তে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের জান মাল সম্পূর্ণ রুপে অনিরাপদ বিধায় পাহাড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্প বৃদ্ধি করা হউক।

৫. পাহাড়ে প্রতিনিয়ত উগ্রসাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়ানো ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

ঘটনাপ্রবাহ: ১৯৮৬ সালের গণহত্যার বিচারের দাবিতে মানববন্ধন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

15 − two =

আরও পড়ুন