অন্যের সিদ্ধান্তে পথ চলা

সমীরণ চাকমা

চাকমা সম্প্রদায়ে জন্ম নিয়ে জীবনের শুরুতেই দেখেছি অন্যের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তে আমার বাবাকে চলতে। বাবার মুখে শুনেছি উনার পূর্ব পুরুষগণও এভাবেই চলেছেন। আমরা চাকমা সম্প্রদায়ের সাধারণ জনগন কখনো আমরা উপজাতি, কখনো ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা, কখনো বা আদিবাসী- যে যেভাবে পারছে সেভাবেই তাদের সিদ্ধান্ত আমাদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে। রাঙামাটির প্রত্যন্ত একটি গ্রামে জন্ম নিয়ে জীবনের শুরুতেই দেখেছি হেডম্যান কারবারীরা আমাদের দেখভাল করতেন। মাঝে মাঝে দেবতাতুল্য রাজাবাবুদেরও দেখতাম আমাদের খোঁজ খবর নিতে। আস্তে আস্তে যখন কিছুটা বুঝে ওঠা শুরু করলাম তখন অনুধাবন করলাম জীবনে প্রতিষ্ঠা পেতে পড়াশুনার কোন বিকল্প নেই।

তৎকালীন সময়ে আমার গ্রামের নিরক্ষর মানুষগুলোর জীবনযাপন দেখে আমার মনে হতো, একটা অর্থহীন সময় পার করা হচ্ছে। আমার বাবাও বোধহয় এ বিষয়ে কিছুটা বুঝতেন। তিনি রাঙামাটি শহরের আমার এক মাসির বাড়ীতে রেখে আমাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। সময়টা তখন পাকিস্তান আমলের শুরুর দিকে। স্কুলের গণ্ডি পার হতেই কলেজে ভর্তি হবার পালা কিন্তু কোথায় পাড়বো! রাঙামাটিতে তো কোন কলেজ নেই।


লেখকের আরো লেখা:

চাকমা রাজা বাবুর কাছে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি


আমাদের দেবতাতুল্য রাজা বাবুরা আমাদের পড়াশুনার বিষয়টি বিবেচনায় আনতে চাননি। পরে বুঝেছি অশিক্ষিত লোকদের নিয়ন্ত্রণ করা সহজ এ বিবেচনায় রাজা বাবুরা চাইতেন না আমরা শিক্ষিত হই। আমি যখন কলেজে ভর্তির জন্য উম্মুখ তখন শুনেছি রাজপুত্র আর তার স্বজনেরা কেউ কলকাতায় আবার কেউ চট্টগ্রাম বা ঢাকাতে পড়াশুনা করছে। তাই আমাদের জন্য কোন ব্যবস্থা রাখার প্রয়োজন তারা মনে করেননি ।

পরে অবশ্য ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারের উদ্যোগে রাঙামাটিতে একটি কলেজ তৈরীর চেষ্টা করা হলে তৎকালীন রাজা ত্রিদিব রায় আর বাঁধা হয়ে দাঁড়াননি। কলেজে ভর্তির জন্য উদ্বেগ থাকায় চট্টগ্রাম গিয়ে আমি বিভিন্ন বাড়ীতে লজিং থেকে, টিউশনি করে চট্টগ্রাম এর একটি কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের পাহাড়ি সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে যখন ভাবি, মনে হয় আমাদের শাসক শ্রেণী বিশেষত রাজা বাবুরা আমাদের অন্যের দয়ায় বেঁচে থেকে একটি মেরুদণ্ডহীন জাতিতে পরিণত করেছিলেন।

চাকমা রাজারাতো নিজেদের ঐতিহাসিক আড়ম্বর নিয়ে গর্ব করেন। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে তাদের অনেক ভূমিকা রয়েছে বলেও প্রচার করেন। কিন্তু গত কয়েকশত বছর ধরে এমন ঐতিহাসিক ক্ষমতাধরী রাজাগণ আমাদের এমনভাবেই গড়ে তুলেছেন যে, আমাদের তারা পশ্চাৎপদ বলে প্রচার করতে পছন্দ করেন। এখনও আমাদের কোটা পদ্ধতিতে, বিশেষ সুবিধা নিয়ে বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি অথবা চাকুরীতে যোগদান করতে হয়। ১০০ নম্বরের এর ভিতরে ৪০ নম্বর পেয়েও বিশেষ কোটায় উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমরা ভর্তি হতে পারি। অন্যদিকে বাঙালীরা আমাদের চেয়ে পড়াশুনায় ভালো করলেও এবং আমাদের চেয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অনেক বেশি নাম্বার পেলেও তারা সুযোগ পায় না। আমাদের রাজা বাবুরা হয়তো বোঝেন না, বিশেষ কোটায় সুযোগ পেয়ে ভর্তি হওয়ার সময় বাঙালীদের তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি আমাদের আহত করে।

গত এক দশক ধরে রাজা বাবুরা আমাদের আদিবাসী হতে বলছেন। এ বিষয়ে আমি কিছুটা পড়াশুনা করে আমাদের ইতিহাস নিয়ে ঘাটাঘাটি করে নিশ্চিত হয়েছি যে, আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী নই। তবে রাজা বাবুরা হঠাৎ করে কেন আমাদের আদিবাসী বানাতে চাইছেন? আমাদের জন্য কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ, আমরা আদিবাসী হতে চাই কি না? এই মতামত কি কেও আমাদের কাছ থেকে নিয়েছেন? রাজাবাবুরা কি গণভোট করে দেখেছেন, সাধারণ চাকমা সম্প্রদায় আদিবাসী হতে চায় কিনা?

আদিবাসী না হয়েও আন্তর্জাতিকভাবে প্রদত্ত এ সংক্রান্ত সংজ্ঞার বিশ্লেষণ করে এর মধ্যে ফাঁক-ফোকর বের করে তারা আমাদের আদিবাসী বানাতে চাইছেন। আমরা এই ভ্রান্তভাবে সংজ্ঞায়িত হয়ে নিজেদের আদিবাসী হিসেবে পরিচিতি নিয়ে বিশেষ সুযোগ সুবিধা চাই কিনা এ বিষয়ে আমাদের মতামত কি কেউ গ্রহণ করেছে? এই ধরণের সিদ্ধান্ত যা অন্য জাতির কাছে আমাদের করুণার পাত্র করে তুলবে যে, আমরা বিশেষ সুবিধা আদায়ের জন্য মিথ্যার ইতিহাস রচনা করেছি।

শুনেছি আমাদের আদিবাসী বানানোর জন্য দেশে বিদেশে রাজাবাবুরা অনেক দৌঁড়-ঝাঁপ করছেন। কিন্তু আমরা কি পেয়েছি তাদের এই দৌঁড়ঝাঁপের মাধ্যমে? আমাদের সন্তানেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চাইলে তো’ রাঙামাটির বাহিরে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। সরকার রাঙামাটিতে মেডিকেল কলেজ আর প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় করতে চাইলে এই রাজাবাবুরা তাতে বাঁধা দিয়েছেন। আদিবাসী বিষয়ক ভ্রান্ত মিথ্যার আবর্তের কলঙ্ক আমাদের মধ্যে জড়িয়ে না দিয়ে রাজা বাবুরা পারতেন আমাদের উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা করতে।

তারাই বলেন, তাদের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। তারা চাইলেতো প্রতিটি গ্রামে গ্রামে ভালো ভালো স্কুল, কলেজ স্থাপন করতে পারতেন। গ্রাম পর্যায়ে আমাদের সন্তানেরা সু শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারতো। তখন কোটা পদ্ধতির সুযোগ নিয়ে অন্যের করুণার পাত্র হতে হতো না।

চাকমা জাতির মেধা রয়েছে, সক্ষমতা রয়েছে, যুগে যুগে রাজা বাবুদের চাপিয়ে দেওয়া পশ্চাৎপদ সিদ্ধান্ত সত্ত্বেও দেশ বিদেশে নিজ যোগ্যতায় আমরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছি। এ জাতির জন্য শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব হলে তারা দেশ ও জাতির জন্য কার্যকরী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। তাই রাজাবাবু আর সন্তু লারমারাসহ যারা গত কয়েক দশক ধরে আমাদের নিয়ে রাজনীতি করছেন, তাদের বলছি, যুগে যুগে আপনাদের কর্মকাণ্ডে চাকমা সম্প্রদায় ছাড়াও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠি ব্যপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আমাদের জীবন একটাই। আমরা আত্মসম্মানবোধ নিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই। আমরা কারো করুণার পাত্র হতে চাই না। আমাদের সক্ষমতা রয়েছে আমরা এ সক্ষমতা ব্যবহার করে বাংলাদেশের উন্নয়নে অংশগ্রহণ করতে চাই। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিক্রমায় স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও বেঁচে থাকার যে স্বাদ আমরা পেয়েছি তাকে পুঁজি করে সামনে এগিয়ে যেতে চাই। আমরা কোন নেতার ব্যক্তিস্বার্থগত সিদ্ধান্ত, যা’ শুধুমাত্র তাদেরকে এবং তাদের পারিবারকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সুনাম-স্বীকৃতি প্রাপ্তিতে সহায়তা করবে এবং অপরদিকে আমাদের বাংলাদেশের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর কাছে করুণার পাত্র করে তুলবে সেই পরিবেশ আমরা চাই না। অন্যের সিদ্ধান্তের এই পথ চলা এখনই বন্ধ হোক, শুরু হোক ব্যক্তি স্বাধীনতার স্বাদযুক্ত অবারিত এই ধরনীর বুকে দৃপ্ত পথ চলা।

লেখক: রাঙামাটি থেকে।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 − seven =

আরও পড়ুন