অসাংবিধানিক ধারা পরিবর্তন ও সংশোধন ব্যতিরেকে শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন অসম্ভব

fec-image

পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যু নিয়ে যে কোন কথা বলতে গেলেই ঘুরে ফিরে যে বিষয়টি চলে আসে তা হলো “শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন”। আমাদের দেশের বড় বড় স্বঘোষিত বুদ্ধিজীবী আর বোদ্ধাগণ উপজাতি নেতা সন্তু লারমা ও তার সমর্থকদের সাথে সুর মিলিয়ে শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়া নিয়ে একতরফাভাবে বাংলাদেশ সরকারকে দোষারোপ করে থাকেন। কিন্তু আমার মনে হয় যে, ঐ সমস্ত বুদ্ধিজীবী আর বোদ্ধারা হয়তো শান্তিচুক্তি সম্পর্কে ততটা ওয়াকিবহাল নয়। তাদের কথাবার্তা শুনে মনের মধ্যে সন্দেহ উঁকি দেয় এই ভেবে যে, তারা কি আদৌ উনাদের নিজেদের মতামত ব্যক্ত করেন নাকি কারো শেখানো অথবা লিখে দেয়া বুলিগুলো তোতা পাখির মত আওড়ে যান। ঐ সমস্ত শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী আর বোদ্ধাদের উচিৎ কোন কথা বা মতামত ব্যক্ত করার আগে বিষয়বস্তু সম্পর্কে নিরপেক্ষভাবে জানা ও বোঝা।

তাদের জ্ঞাতার্থে কিছু জানা কথা আবারো জানাচ্ছি। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ ২১ বছরের বিচ্ছিন্নতাবাদী  সংঘাত এবং আধিপত্য বিস্তারের আন্তঃদলীয় সংঘর্ষের, রক্তপাতের অবসান ঘটে। তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অন্য কোন তৃতীয়পক্ষের সংশ্লিষ্টতা ছাড়াই এই শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়- যা বিশ্বের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। চুক্তি স্বাক্ষরিত হবার পর থেকে বিগত প্রায় ২২ বছরে এর বাস্তবায়নে সরকার বেশ আন্তরিকতার পরিচয় দিলেও চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী সন্তু লারমাদের অভিযোগ, বাস্তবায়ন হয়নি চুক্তির মৌলিক অনেক বিষয়।

অথচ, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায় যে, চুক্তির অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়েছে। এ পর্যন্ত শান্তিচুক্তির মোট ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টির পূর্ণ বাস্তবায়ন, ১৫টির আংশিক বাস্তবায়ন এবং ৯টি ধারার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তিন পার্বত্য জেলায় হস্তান্তরযোগ্য ৩৩টি বিষয়/বিভাগের মধ্যে এ পর্যন্ত রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদে ৩০টি, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদে ৩০টি এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদে ২৮টি বিষয়/দফতর হস্তান্তর করা হয়েছে।

অপরদিকে সরকারের ঐকান্তিক ইচ্ছা ও প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শান্তিচুক্তি সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত না হওয়ার পিছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম কারণ হলো শান্তিচুক্তির বেশ কিছু ধারা বাংলাদেশ সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। এছাড়া শান্তিচুক্তির বেশ কিছু ধারা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা মামলার রায়ে উচ্চ আদালত চুক্তির বেশ কিছু ধারা সংবিধান বিরোধী বলে বাতিল করে দিয়েছে। উচ্চ আদালতের এ রায়ের কার্যকারিতা আদালতের নির্দেশে স্থিতাবস্থায় রয়েছে এবং মামলাটি আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে।

শান্তিচুক্তির শর্তানুযায়ী চুক্তি স্বাক্ষরের ৬০ দিনের মধ্যে জেএসএস নেতা সন্তু লারমাকে তার দলসহ অস্ত্র সমর্পন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সন্তু লারমার দল পুর্ণাঙ্গভাবে অস্ত্র সমর্পন করেনি। এমনকি তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি অবিচল আনুগত্য পোষণ করতেও ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের নাগরিক পরিচয়পত্র গ্রহণ, রাষ্ট্রীয় দিবস পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। এ সমস্ত বিষয়সহ শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের পথে অন্যান্য যে সমস্ত অন্তরায় রয়েছে সেগুলোর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তবে বর্তমান সরকার চুক্তির যে ধারাগুলো বাস্তবায়িত হয়নি সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে।

সরকারের এত আন্তরিকতা আর স্বদিচ্ছার পরও যারা “শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন” নিয়ে এক তরফাভাবে সরকারকে দোষারোপ করে যাচ্ছেন তারা কি জানেন যে, বিগত ২২ বছরে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে সরকার বেশ আন্তরিকতার পরিচয় দিলেও চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী সন্তু লারমাদের পক্ষ থেকে আন্তরিকতার লেশমাত্র পাওয়া যায়নি। বরং প্রতি পদে পদে সন্তু লারমারা শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করে চলেছেন। তাহলে কি শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সরকারের একার দায়িত্ব? চুক্তি স্বাক্ষরকারী সন্তু লারমাদের কি কোনই দায়িত্ব নেই? নাকি প্রতিনিয়ত শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করা আর চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারকে বাঁধা সৃষ্টি করাটাই সন্তু লারমা ও তার সমর্থকদের প্রধান দায়িত্ব? এ বিষয় নিয়ে ইতিপূর্বে আমি শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে উপজাতিরা কতটুকু আন্তরিক? এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করছে স্বার্থান্বেষী উপজাতি সংগঠনগুলো এই শিরোনামে দুটি লেখা লিখেছিলাম। প্রিয় পাঠক, লেখা দুটি পড়ে দেখতে পারেন তাহলে অনেক বিষয় বুঝতে আপনাদের নিকট সহজতর হবে।

আমি আগেই বলেছি যে, শান্তিচুক্তি সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত না হওয়ার পিছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে যার মধ্যে অন্যতম কারণ হলো শান্তিচুক্তির বেশ কিছু ধারা বাংলাদেশ সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। যেটি সমাধানে সরকার কাজ করছেন। এ জন্য সরকারকে সময় এবং সহযোগিতা উভয়ই দিতে হবে। পাশাপাশি এটাও আমাদেরকে বুঝতে হবে যে, একটা দেশের সংবিধান প্রণয়ন করা হয় সেই দেশের সমস্ত অঞ্চল, জনগোষ্ঠী, আইন, নিয়ম, রাষ্ট্রীয় নীতি ইত্যাদি বিষয়কে কেন্দ্র করে। তাই দেশের এক দশমাংশ নিয়ে গঠিত তিন পার্বত্য জেলা আর সেখানে বসবাসরত মাত্র ৮ লক্ষ উপজাতি (দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০০ ভাগের ১ ভাগ মাত্র) জনগনের জন্য সমস্ত দেশের আইন ও সংবিধান পরিবর্তন করাটা কি যৌক্তিক- এ প্রশ্ন রইলো দেশবাসীর কাছে।

উল্লেখ্য যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত মোট জনগোষ্ঠীর ৪৯% বাঙালী। শান্তিচুক্তিতে এই বাঙালী জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। তাদের অস্তিত্ব, জাতীয়তা ও পরিচিতিকে অস্বীকার করা হয়েছে।

প্রিয় পাঠক, এখন আসুন জেনে নেয়া যাক শান্তিচুক্তির কোন কোন ধারা বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক।

ক। শান্তিচুক্তির “ক” খণ্ডের ১নং অনুচ্ছেদে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা স্ট্যাটাস (উপজাতি অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল) দেয়া হয়েছে। এতে করে চুক্তির শুরুতেই পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩ জেলা (রাংগামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি)’কে দেশের অন্য ৬১টি জেলা থেকে আলাদা করা হয়েছে যা বাংলাদেশ সংবিধানের ১নং অনুচ্ছেদের পরিপন্থি। সংবিধানে বলা হয়েছে যে “বাংলাদেশ একটি একক, স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র, যাহা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামে পরিচিত হইবে”।  তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে “উপজাতি অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল” ঘোষণা করে সমতলের বাকী ৬১টি জেলা থেকে আলাদা করা কতটুকু যৌক্তিক? তাছাড়া এ ঘোষণার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের ৪৯% বা প্রায় ৮ লাখ বাঙালি জনগোষ্ঠীকেও অস্বীকার করা হয়েছে।

খ। শান্তিচূক্তির “গ” খণ্ড অনুযায়ী “পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ” গঠিত হয়েছে এবং পরবর্তীতে আঞ্চলিক পরিষদ আইন ১২/১৯৯৮ প্রণয়ন করা হয়েছে। ১৯৯৮ সালে এই আঞ্চলিক পরিষদ গঠিত হবার পর থেকে “অনির্বাচিত” সন্তু লারমা এই পরিষদের চেয়ারম্যানের পদটি যক্ষের ধনের মত আঁকড়ে ধরে আছেন। অথচ এই আঞ্চলিক পরিষদ গঠন রাষ্ট্রের একক সত্ত্বা (Unitary Form)’র পরিপন্থি যা বাংলাদেশ সংবিধানের ১ এবং ৫৯ অনুচ্ছেদের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। সংবিধানের ১নং অনুচ্ছেদ আমি আগেই বলেছি। সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, “আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক এককাংশের স্থানীয় শাসনভার প্রদান করা হইবে”। এখন প্রশ্ন হলো: আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমা এবং তার পরিষদের অন্যান্য সদস্যরা কি “নির্বাচিত” প্রতিনিধি?

পার্বত্য চট্টগ্রাম একক কোন জেলা নয়, বরং রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান- এই তিনটা জেলার সমষ্টি। পার্বত্য চট্টগ্রামকে আঞ্চলিক পরিষদ আইনের কোন বিধানে “প্রশাসনিক ইউনিট” হিসাবে পরিস্কার বলা হয় নাই। তাই আঞ্চলিক পরিষদকে সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের লক্ষ্য অর্জনে প্রশাসনিক ইউনিট এর “স্থানীয় সরকার” বলা যাবে না। একইভাবে স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষের হিসাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কিত পরিচালনা কার্যক্রমও অসাংবিধানিক। চুক্তির বদৌলতে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল একটা প্রশাসনিক ইউনিট হিসাবে প্রকাশ্য আইন দ্বারা নির্দিষ্ট করা ছাড়াই উল্টা স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ হিসাবে কাজ করে যাচ্ছে। তাই আলোচনার সমাপ্তি টেনে বলা যায় যে, এই আঞ্চলিক পরিষদ ও এর আইন এই ক্ষেত্রে সংবিধানের আওতা বহির্ভূত।

গ। শান্তিচূক্তির “খ” খণ্ডের ২৬(ক) অনুচ্ছেদ মোতাবেক পার্বত্য জেলার এলাকাধীন বন্দোবস্তযোগ্য খাসজমিসহ কোন জায়গা-জমি ইজারা প্রদানসহ বন্দোবস্ত, ক্রয়, বিক্রয় ও হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পার্বত্য জেলা পরিষদকে সর্বময় ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। শান্তিচূক্তির এই ধারাটি বাংলাদেশ সংবিধানের ১৪৩ এবং ১৪৪ নং অনুচ্ছেদের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এছাড়াও, পরিষদের অনুমোদন ব্যতিরেকে কোন জায়গা-জমি ইজারা প্রদানসহ বন্দোবস্ত, ক্রয়, বিক্রয় ও হস্তান্তর করা যাবে না বলে যে ধারাটি উল্লেখ করা হয়েছে সেটি বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৬নং অনুচ্ছেদের মতাদর্শের পরিপন্থি। কারণ, শান্তিচুক্তির এই ধারা মোতাবেক পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরের অন্য কোন নাগরিক জমি ক্রয় বা বসতি স্থাপন করতে পারছে না।

ঘ। শান্তিচূক্তির “খ” খণ্ডের ২৯ এবং ৩২নং অনুচ্ছেদ মোতাবেক সরকার জেলা পরিষদের সাথে আলোচনাক্রমে পার্বত্য অঞ্চলের জেলাগুলোর জন্য কোন আইন, সরকারী গেজেট ইত্যাদি প্রণয়ন করতে পারবেন। উক্ত বিধি প্রণীত হবার পরও পরিষদ কর্তৃক তা পুনর্বিবেচনার জন্য সরকারের নিকট আবেদন করার বিশেষ অধিকার দেয়া হয়েছে। এমনকি, পার্বত্য জেলায় প্রযোজ্য এমন কোন আইন যদি জাতীয় সংসদে পাশ বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গৃহীত হয় সেই আইন সংশোধনের বা প্রয়োগ শিথিলের জন্য পরিষদ সরকারের নিকট আবেদন পেশ করতে পারবে। শান্তিচূক্তির এই ধারাটি বাংলাদেশ সংবিধানের ৮০নং অনুচ্ছেদের সাথে সাংঘর্ষিক।

ঙ। শান্তিচূক্তির “খ” খণ্ডের ৪(ঘ) এবং ৯নং অনুচ্ছেদ মোতাবেক পার্বত্য চট্টগ্রামে কোন ব্যক্তিকে ভোটার হতে হলে সংশ্লিষ্ট সার্কেল চীফ কর্তৃক প্রদত্ত “স্থায়ী বাসিন্দা” সনদপত্র গ্রহণ করা আবশ্যক। এই ধারাটি বাংলাদেশ সংবিধানের ১২২নং অনুচ্ছেদের সাথে সাংঘর্ষিক। এখানে উল্লেখ্য যে, জাতীয় পরিচয় পত্র পদ্ধতি চালু হওয়ার পরও সার্কেল চিফ/জেলা প্রশাসক কর্তৃক স্থায়ী নাগরিকত্বের সনদ প্রদান অবান্তর।

চ। মূলতঃ শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনের (উপজাতি) সাথে। যাতে শুধুমাত্র উক্ত নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীরই স্বার্থ সংরক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত অপর একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী (বাংগালী) কে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এই শান্তিচুক্তিতে বাংলাদেশের সমতলের জেলাগুলোর মানুষকেও উপেক্ষা করা হয়েছে জমি কেনাবেচা ও বসতি স্থাপনে অন্তরায় সৃষ্টির মাধ্যমে। তাই এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে (উপজাতি) সুবিধা দিতে গিয়ে রাষ্ট্রের একটি বিশাল গোষ্ঠীর (বাংগালী) সংগে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে যা বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭নং অনুচ্ছেদের পরিপন্থি। (সংবিধানের ২৭ নং অনুচ্ছেদঃ সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী)।

ছ। শান্তিচুক্তির “খ” খণ্ডের অনুচ্ছেদ ৪(ঘ) মোতাবেক ‘কোন ব্যক্তি অ-উপজাতীয় কিনা এবং হইলে তিনি কোন সম্প্রদায়ের সদস্য তাহা সংশ্লিষ্ট মৌজার হেডম্যান/ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান/পৌর সভার চেয়ারম্যান কর্তৃক প্রদত্ত সার্টিফিকেট দাখিল সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট সার্কেলের চীফ স্থির করিবেন এবং এতদসম্পর্কে সার্কেল চীফের নিকট হইতে প্রাপ্ত সার্টিফিকেট ব্যতীত কোন ব্যক্তি অ-উপজাতীয় হিসাবে কোন অ-উপজাতীয় সদস্য পদের জন্যে প্রার্থী হইতে পারিবেন না’।

এই ধারাটি বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৮(১) এর পরিপন্থি (সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৮(১)- কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষদের বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না)। একজন ব্যক্তি অ-উপজাতি কি না তা নির্ধারিত হবে সংশ্লিষ্ট সার্কেল চীফের অনুমোদনের ভিত্তিতে। এখন এই বিধান এমন কোন বাস্তব মানদণ্ড নিশ্চিত করে নাই, যার দ্বারা ওই সনদ প্রদান করা হবে কি হবে না তা আইনিভাবে নিশ্চিত করা যায়। তাই এটা সংবিধানের ২৭, ২৮(১), ২৯(১) এবং ৩১নং অনুচ্ছেদ সমূহের লঙ্ঘন। ফলে ‘অ-উপজাতি’ নির্ধারণে গ্রাম প্রধান ও সার্কেল চীফের ক্ষমতা অসাংবিধানিক।

শান্তিচুক্তিতে এরকম আরো বেশ কিছু অসাংবিধানিক ধারা আছে। লেখাটি নাতিদীর্ঘ করার লক্ষ্যে আমি উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ধারা এখানে তুলে ধরেছি মাত্র।

পরিশেষে এ কথা বলতে চাই যে, শান্তিচুক্তিটি ছিলো মূলতঃ রাষ্ট্রের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে সন্ত্রাস ছেড়ে আলোর পথে নিয়ে আসার একটি শুভ উদ্যোগ। তবে সেই শুভ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে শান্তিচুক্তিতে বেশ কিছু অসাংবিধানিক ধারা সংযোজন করা হয়েছে।

পাশাপাশি, পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালী জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। আর তাই এটি এখন সময়ের দাবী যে- শান্তিচুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে উল্লিখিত অসাংবিধানিক বিষয়সমূহ পূনর্বিবেচনা সাপেক্ষে শান্তিচুক্তির পূণর্মূল্যায়ন করা একান্ত প্রয়োজন। কারণ, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক একটি চুক্তির অসাংবিধানিক ধারা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে শান্তিচুক্তিতে বর্ণিত সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক ধারাসমূহ প্রথমে পরিবর্তন/সংশোধন করা একান্তভাবে প্রয়োজন। শুধুমাত্র তারপরই শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা সম্ভব। অন্যথায় দেশবাসী এই চুক্তি কোনভাবেই মেনে নেবে না।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three + 12 =

আরও পড়ুন