খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার সদর ইউনিয়নের এক পাহাড়ি গ্রামে বসবাস রমিতা ত্রিপুরার। বয়স পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই। জীবনের এই পড়ন্ত সময়ে এসে যখন বিশ্রামের কথা ভাবার কথা, তখন রমিতার জীবনজুড়ে শুধুই সংগ্রাম আর দায়িত্বের ভার।
অসুস্থ স্বামী লেদামনি ত্রিপুরাকে নিয়ে সংসারের হাল ধরেছেন একাই। প্রতি সপ্তাহে পানছড়ি হাটে মুরগি বিক্রি করেই চলে তাদের জীবন। একসময় এই কাজটিই করতেন লেদামনি ত্রিপুরা। তখন সংসারে অভাব ছিল না, দিনগুলো ছিল তুলনামূলক স্বচ্ছল। কিন্তু পাঁচ বছর আগে হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেন দৃষ্টিশক্তি, চলাফেরার সক্ষমতাও। সেই সঙ্গে বদলে যায় পুরো সংসারের চিত্র।
স্বামীর অসুস্থতার পর থেকেই সংসারের সব দায়িত্ব এসে পড়ে রমিতা ত্রিপুরার কাঁধে। একদিকে উপার্জন, অন্যদিকে অসুস্থ স্বামীর সেবাযত্ন—দুই দায়িত্বই নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে চলেছেন এই পাহাড়ি নারী।
রমিতা ত্রিপুরা জানান, হাটে মুরগি বিক্রি করে বাড়ি ফিরেই শুরু হয় আরেক যুদ্ধ। স্বামীর সেবা, রান্নাবান্না—সবই তাকেই করতে হয়। অল্প আয়ের এই টাকাতেই সংসারের খরচ চালাতে হয়, পাশাপাশি শোধ করতে হয় ঋণের কিস্তি।
মুরগি বিক্রির কাজটি যে কতটা কষ্টের, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তবুও দমে যাননি তিনি। গভীর রাতে না ঘুমিয়ে মুরগি ড্রেসিং করতে করতেই ভোর হয়ে যায়। এরপর ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে বাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দেন রমিতা। কখনো সন্ধ্যা, কখনো গভীর রাতে বাড়ি ফেরা হয় তার।
তিনি বলেন, ঋণ শোধ করার পর হাতে খুব অল্প টাকা থাকে। ছেলে সন্তান নেই, এই অল্প টাকাতেই সংসার চালাই আর স্বামীর চিকিৎসা ও যত্ন নিই।
চরম দারিদ্র্য, শারীরিক পরিশ্রম আর মানসিক চাপের মাঝেও জীবনযুদ্ধে হার মানেননি রমিতা ত্রিপুরা। অসুস্থ স্বামীকে ছেড়ে যাওয়ার কথা কখনো ভাবেননি তিনি। বরং অদম্য সাহস আর ভালোবাসা নিয়ে আঁকড়ে ধরে আছেন সংসারটিকে।
রমিতা ত্রিপুরার জীবন কেবল একটি পরিবারের গল্প নয়, এটি পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে লড়াই করে বেঁচে থাকা সংগ্রামী নারীর প্রতিচ্ছবি। এই গল্প সত্যিকারের জীবনযুদ্ধের—যেখানে ভালোবাসা আর পরিশ্রমই বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা দেয়।
