জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বিচারের নামে অবিচার নয়, আইন মেনে স্বচ্ছতার সঙ্গে জুলাই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার হবে।
শনিবার সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই ২৪ শহিদ পরিবার সোসাইটি’ এবং ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন-২০২৬’-এ তিনি এ কথা বলেন।
‘জুলাই ২৪ শহিদ পরিবার সোসাইটি’ ও ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ এ স্মরণসভার আয়োজন করে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদ পরিবার এবং আহত যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি।
তিনি বলেন, যারা অন্যায় করেছে, যারা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের বিচার অবশ্যই হবে। তবে আমরা চাই, বিচারের নামে যেন আরেকটি অবিচার না ঘটে। বিচার হতে হবে ন্যায়সঙ্গত ও আইনের ভিত্তিতে।
তারেক রহমান বলেন, যাদের হারানো হয়েছে তারা আর কখনো ফিরে আসবেন না। কিন্তু তাদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না।
তিনি বলেন, আমাদের দায়িত্ব এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে মানুষের অধিকার নিশ্চিত হবে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গর্ব করে বলতে পারবে-এই পরিবর্তনের পেছনে শহিদদের আত্মত্যাগ রয়েছে।
সরকারপ্রধান বলেন, জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী ৬৫ জন শিশু জুলাই আন্দোলনে শহিদ হয়েছে। এছাড়া প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ শহিদ হয়েছেন। এই আত্মত্যাগ বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশাকে আরও বড় করেছে। মানুষ চায় একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র।
তারেক রহমান বলেন, একজন মা তার সন্তানকে গুলি করে হত্যা হতে দেখেছেন, কেউ দেখেছেন সন্তানকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, কেউ ভাইকে হারিয়েছেন। এই বেদনা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
তিনি বলেন, আপনাদের কষ্ট অনুভব করতে পারি। শারীরিক যন্ত্রণা হোক কিংবা মানসিক কষ্ট আমি অন্তত উপলব্ধি করতে পারি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আমরা দেশকে কী দিতে পারি। রাষ্ট্র যদি সব দাবি পূরণও করে, তবুও হারানো আপনজন ফিরে আসবে না, হারানো দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসবে না, শারীরিক ক্ষতও পুরোপুরি মুছে যাবে না।
তিনি বলেন, কিন্তু আমরা যদি দেশকে এগিয়ে নিতে পারি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে গর্ব করে বলতে পারবেন—আপনাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে।
প্রতিশোধ চান না জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, যদি আজ আমার মাকে জিজ্ঞেস করতে পারতাম, গত ১৭ বছরে তার ওপর যে নির্যাতন হয়েছে, তিনি কি তার প্রতিশোধ চান? আমি নিশ্চিত, তিনি বলতেন—প্রতিশোধ নয়, দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে সামনে এগিয়ে যাও।
একইভাবে নিজের ভাইয়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, যদি আমার ভাইকে জিজ্ঞেস করতে পারতাম, তার সঙ্গে যে অন্যায় হয়েছে তার প্রতিশোধ নিতে হবে কি না, আমি নিশ্চিত, সেও একই কথা বলত। দেশকে এগিয়ে নেওয়াই হবে সবচেয়ে বড় জবাব।
তারেক রহমান বলেন, আপনারা যখন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছিলেন, তখন আপনাদের লক্ষ্য ছিল এই দেশকে এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত করা, যেখানে মানুষ সম্মান নিয়ে বাঁচবে, অধিকার পাবে এবং নিরাপদে চলতে পারবে।
তিনি বলেন, আজ যখন একটি পরিবর্তন এসেছে, তখন আমাদের ভাবতে হবে যে উদ্দেশ্যে মানুষ জীবন দিয়েছে, সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমরা কতদূর এগোতে পারলাম।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৫ আগস্টের অর্জন কোনো একক ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর নয়। এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী এবং শান্তিপ্রিয় সব মানুষের সম্মিলিত অর্জন।
এ সময় বিএনপি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ত্যাগ সে-ই করতে পারে যার ত্যাগ করার সাহস ও শক্তি আছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ এবং বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক শক্তির কর্মীদের সেই সাহস আছে।
তিনি বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য আমি না, আমাদের মূল লক্ষ্য আমরা। আমাদের মূল লক্ষ্য দেশ, দেশের মানুষ এবং দেশের মাটি। জুলাই শহিদ, জুলাই যোদ্ধা এবং ১৭ বছরের আন্দোলনের সব যোদ্ধার প্রতি প্রকৃত সম্মান দেখাতে হলে তাদের আত্মত্যাগের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হবে।
সবাইকে দেশের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, এই সম্মেলন থেকে আমাদের শপথ হোক কোনো বিভাজন নয়, ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথে আমরা এগিয়ে যাব।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।
চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে আয়োজিত এই স্মরণসভায় জুলাই শহিদ পরিবারের সদস্য ও আহতরা তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। এছাড়া সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, কূটনীতিক, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে এই অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরে জুলাই শহিদদের রুহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
