parbattanews

আওয়ামী আমলে মনিপুর স্কুলে লুট ৬০২ কোটি, নথি গায়েব

স্কেচ : প্রতীকী

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হয় দেশ গড়ার পাঠদান। সঙ্গে নীতি, নৈতিকতা ও সততা শেখান গুরুরা। কিন্তু রাজধানীর মিরপুরের মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে ঘটেছে ভিন্ন কিছু; এখান থেকে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন সভাপতি ও অধ্যক্ষ। শিক্ষার্থীদের পকেট কাটা, সরকারি অর্থ তছরুপ, নিয়োগ-বাণিজ্যসহ লাগামহীন অনিয়ম-দুর্নীতি করেছে এই জুটি। দেড় দশকে হাতিয়েছেন ৬ শতাধিক কোটি টাকা।

স্বনামধন্য এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে ২৯ হাজার শিক্ষার্থী। তাদের জন্য ভবন নির্মাণ থেকে শিক্ষক নিয়োগ, বিশেষ ভাতা, মুদ্রণ ব্যয়, বিজ্ঞাপন কিংবা সরকারি কর-ভ্যাটের নামে লুট করা হয়েছে বিপুল অর্থ। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই ১৬ বছরে সভাপতির পদ দখলে রেখে ‍দুর্নীতিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন ঢাকা-১৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য কামাল আহমেদ মজুমদার। অর্থ বেহাতে সহায়তা করেছেন তারই নিয়োগ করা ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ফরহাদ হোসেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে করা যায়নি টুঁ শব্দও। নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও হয়নি তদন্ত বা অডিট। অবশেষে সেখানে অনুসন্ধান চালিয়েছেন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) কর্মকর্তারা। তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে দুর্নীতির এই ভয়াবহ চিত্র। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে শিক্ষা পরিদর্শক আবু দাউদ ও রাশিদুল হাসানের নানা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেখানে অনুসন্ধান চালিয়েছেন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) কর্মকর্তারা। প্রতিবেদনে দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে শিক্ষা পরিদর্শক আবু দাউদ ও রাশিদুল হাসানের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিটি। অবশ্য কামাল মজুমদার হত্যাসহ একাধিক মামলায় কারাগারে আছেন এবং সাবেক অধ্যক্ষ ফরহাদ পলাতক। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিতে গত ১৬ বছরে লুট হয়েছে ৬০২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে আটটি বহুতল ভবন নির্মাণ ও উন্নয়ন খাতে ৪৩৬ কোটি, অ্যাকাডেমিক ও নগর ভাতায় ৮৭ কোটি ৮৪ লাখ, ভ্যাট-আয়কর ফাঁকিতে ৩৬ কোটি ৭৫ লাখ এবং মুদ্রণ-ছাপানোর নামে ১১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে। নিয়মিত অডিটের কথা থাকলেও মনিপুর স্কুলে সবশেষ অডিট হয়েছিল ২০০৯ সালে। কামালের ক্ষমতার দাপটের কাছে অডিট করার সাহস দেখায়নি কোনো সংস্থা। স্কুলের কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগমুহূর্তে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সরিয়ে ফেলে আগের প্রশাসন। তারও আগে ২০১৩-১৪ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে ট্রাস্ট করার নামে নষ্ট করা হয় দলিলসহ গুরুত্বপূর্ণ নথি।

অবৈধভাবে ৬৬২ শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ, দুর্নীতি ঢাকতে নথি গায়েব
ভুতুড়ে নিয়োগ :
গত ১৬ বছরে অবৈধভাবে নিয়োগ দেওয়া হয় ৬৬২ শিক্ষক-কর্মচারী, যা মোট শিক্ষকের তিন-চতুর্থাংশ। এমনকি ৭৪ জনের নেই শিক্ষক নিবন্ধন সনদ। এসব নিয়োগে ছিল না বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষা বা যাচাইয়ের বালাই। ৬২টি সেকশন সচল রাখতে তাদের এখনো বহাল রাখা হয়েছে বলে দাবি বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলামের।

ভবন নির্মাণের নামে লুট ৪৩৬ কোটি :
প্রতিষ্ঠানটিতে অবকাঠামো উন্নয়নে পুকুর নয়, চুরি হয়েছে সাগর। মূল ক্যাম্পাস ছাড়াও গত ১৬ বছরে ইব্রাহিমপুর, শেওড়াপাড়া এবং রূপনগর শাখায় আটটি বহুতল ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন খাতে ৪৩৬ কোটি ১২ লাখ টাকা লুটপাটের প্রমাণ পেয়েছে ডিআইএ।

ছাপায় আত্মসাৎ ১১ কোটি টাকা :
২০০৯-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত মুদ্রণ খাতে মোট ১১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে; কিন্তু বিপরীতে যেসব নথি দেখিয়েছে, তা সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করেছে নিরীক্ষা দল। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রেস থাকার পরও শুধু মুদ্রণে ১১ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো অস্বাভাবিক। এটি সরাসরি আত্মসাৎ।

নগর ভাতায় ৮৭ কোটির অনিয়ম :
অ্যাকাডেমিক উন্নয়ন ভাতা ও নগর ভাতা নামে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম হয়েছে স্কুলটিতে। বিধিবহির্ভূতভাবে শিক্ষক-কর্মচারীদের দুই খাতে ৮৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা দেওয়া হয় নিয়মনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে। এর মধ্যে অ্যাকাডেমিক উন্নয়ন ভাতা বাবদ ৬৩ কোটি ৪৮ লাখ এবং নগর ভাতা ২৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়। মেলেনি এসব ভাতা দেওয়ার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র।

শতকোটির কর-ভ্যাট আত্মসাৎ :
প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন খাতে উৎস আয়কর ও ভ্যাট কেটে সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে বছরের পর বছর এই অর্থ লোপাট করা হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২৫ পর্যন্ত বিশেষ ক্লাসের সম্মানী, পরিচালনা কমিটির সম্মানী এবং সম্পত্তি খাতে ভ্যাট-ট্যাক্স বাবদ আদায় করা ৩৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকাও জমা হয়নি সরকারি কোষাগারে। সেই অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে বলেছে নিরীক্ষা দল। নিরীক্ষা করে যে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন তা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানালেন ডিআইএ পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম। এখন মন্ত্রণালয় সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। নিরীক্ষা দলের প্রতিবেদনটি এখনো দেখার সুযোগ পাননি শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন। তিনি দেশের বাইরে থাকায় কিছুটা দেরি হয়েছে।

Exit mobile version