আগামীকাল ভয়াল ২৯ এপ্রিল!

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল মহা প্রলয়ংকারী ঘূর্ণি ঝড়ে লণ্ড-ভণ্ড হয়ে যায় কক্সবাজারসহ দেশের ৪শ’ ১৭ কিমি উপকূল। আগামীকাল সোমবার (২৯ এপ্রিল) সেই ভয়াল দিন।

কিন্তু ভাগ্য বিড়ম্বিত কক্সবাজার জেলার উপকূলের মানুষের কান্না শেষ হয়নি। এখনো জেলার যেকোন দিকে তাকালেই দেখা যায় সেই ২৯ এপ্রিলের ভয়াল দিনের ক্ষত চিহ্ন। ২৯ বছরেও সেই ক্ষত চিহ্ন নিয়ে গুমরে গুমরে কাঁদে জেলার ক্ষতবিক্ষত মানুষগুলো। ওইদিন জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পুরো জেলা লণ্ডভণ্ড হলেও বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় মহেশখালী, কুতুবদিয়া, টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপ ও সেন্টমার্টিন। এর মধ্যে নব্বই শতাংশ বেড়ীবাঁধ ভেঙ্গে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয় মহেশখালীর মাতারবাড়ী-ধলঘাটা, টেকনাফ, শাহপরীরদ্বীপ, উখিয়া, পেকুয়া, চকরিয়া ও কুতুবদিয়ার বিভিন্ন এলাকা।

আর সেই থেকে অদ্যবদি অরক্ষিত বেড়ীবাঁধ নিয়ে এখনো জানমালের ঝুঁকিতে বেঁচে আছে পুরো জেলাবাসী।

এখন তাদের একটিই প্রশ্ন উপকূলের কান্না থামানোর কি কেউ নেই? বিগত ২৯ বছর অরক্ষিত বেড়িবাঁধ নিয়ে জীবনের ঝুঁকিতে দিনাতিপাত করলেও তাদের নিরাপত্তার একমাত্র দাবি টেকসই বেড়িবাঁধ নিমার্ণে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া হয়নি এতো বছরেও।

আবার মড়ার উপর খাড়ার ঘাঁ হিসেবে কয়লা বিদ্যুতের করাল ঘ্রাসে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে তাদের বেঁচে থাকার সব উৎস। প্রতিবারই জাতীয় নির্বাচন আসলে উন্নয়নের রূপকথাসহ অনেকেই বেড়িবাঁধ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিলেও নির্বাচিত হওয়ার পর তাদের কথায় আর কাজের কোন মিল খুঁজে পায়নি অবহেলিত জেলাবাসী।

অনেকেই জানান, জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হওয়ার পর অবহেলিত মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের কথা বলে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে বলে স্বাধীনতা লাভের ৪৮ বছরেও দ্বীপের এ অবস্থা। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলের লাখ লাখ মানুষ দীর্ঘদিন থেকে ধুক ধুকে মরছে একটি টেকঁসই বেড়ীবাঁধের জন্য। ঠেকঁসই বেড়িবাঁধ না থাকায় ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল উপকূলীয় এলাকায় হানা দেয়া স্বরণকালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়, মূহূর্তেই লণ্ডভণ্ড করে দেয় উপকূলের মানুষের সাজাঁনো সংসার। কোটি কোটি টাকার সস্পদের ক্ষয়ক্ষতি ও ব্যাপক প্রাঁণহানি ঘটলেও টেকসই বেড়িবাঁধ না থাকায় এখনো আতংকে উপকূলীয় জনগোষ্ঠির।

প্রতি বছরের ন্যায় ২৯ এপ্রিল, জেলাবাসীর স্বজন হারানোর কান্নায় ভারি হয়ে উঠে আকাশ বাতাস। দেশের উপকূলীয় এলাকায় ২৯ এপ্রিলে বিভিন্নভাবে স্বরণসভা পালন করা হলেও এই দিনে অবহেলিত কক্সবাজারবাসীর খোঁজ নেয় না কোন জন প্রতিনিধি।

অনেকের প্রশ্ন এভাবে আর কতদিন। আমরা কি দেশের মূল ভূ-খন্ডের বাইরে বলে অভিভাবকহীন? আমাদের জান মালের নিরাপত্তা দেওয়া কি সরকারের দায়িত্ব নয়? প্রতি বছরই ২৯ এপ্রিলের পূর্বে সংবাদকর্মীরা গেলে আক্ষেপের সাথে কান্না জড়িত কন্ঠে বলতে থাকেন অনেক অসহায়ত্বের কথা, কিন্তু কে শুনে কার কথা, এদের শান্তনা দেবে কে? একের পর এক সরকার পরিবর্তন হলেও উপকূলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি কোন কালে।

সরেজমিনে না গেলে বোঝার কোন উপায় নেই, আশ্রয়হীন জেলাবাসী কতটা ব্যথিত, তাদের চেহেরায় ভর করে আছে সহায় সম্বল, ভিটে মাটি ও স্বজন হারানোর চিত্র।

১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণি ঝড়ে হাজার হাজার মানুষের প্রাঁণহানী ও কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হওয়ার প্রেক্ষিতে লণ্ডভণ্ড বেড়িবাঁধের সংস্কারের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করলেও সরকারি আমলা, ঠিকাদার ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের লুটপাটের ফলে মানসম্মতভাবে নির্মিত হয়নি উপকূলবাসীর প্রাণের দাবিচ টেকসই বেড়িবাঁধ। তাই এখনো উদ্বাস্তুর মত ভাঙ্গা বেড়িবাঁধের উপর ঝুঁপড়ি বেঁধে অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে শত শত জেলে পরিবার।

এছাড়া ১৯৯১ সালে অনেকটা দায়সারা ভাবে বালি দিয়ে বেড়িবাঁধ নির্মিত হলেও ১৯৯৭ সালের ঘূর্ণি ঝড়ে মূহূর্তেই ভেঙ্গে যায়। ফলে ১৯৯১ সালের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে না উঠতেই আবারও ক্ষয়ক্ষতির সম্মূখীন হওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে জেলার উপকূলবাসী।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, সরকার বিভিন্ন সময় বেড়িবাঁধ নির্মানে বরাদ্ধ দিলেও তদারকীর অভাবে বরাদ্ধকৃত টাকা লুটপাট করে নামে মাত্র বেড়িবাঁধ নির্মিত হওয়ায় একদিকে ঝুঁকিতে ধলঘাটাবাসি অন্যদিকে বেড়িঁবাধ নির্মাণের নামে অপচয় হচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় দায়সারা গোছের বেড়িবাঁধ নির্মিত হলেও শেষ রক্ষা হয়নি জেলাবাসির। এছাড়া বিগত ২০১২ সালের ১৮ মার্চ বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ে বেড়িবাঁধ নিমিশেই ভেঙ্গে সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিও হয়। জরুরী ভিত্তিতে কোন ব্যবস্থা না নেওয়ায় এখন উপদ্বীপে চলছে জোয়ার ভাটা, ভিটে মাটি হারিয়েছে অনেক পরিবার, ব্যাহত হচ্ছে দ্বীপবাসির জীবিকার প্রধান উৎস লবণ ও চিংড়ি চাষ।

সরেজমিনে দেখা যায়, কুতুবদিয়া দ্বীপে বেড়িবাঁধ সম্পূর্ন অরক্ষিত থাকায় আবারও বর্ষা মৌসুমে বঙ্গোপসাগরের পূর্ণিমার জোয়ারে জনবসতি ও চিংড়ি ঘেরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে।

জীবিকার তাগিদে বর্তমানে অনেকটা ঝুঁকিতে লবণ চাষ শেষ হলেও এখনো বেড়িঁবাধ না হওয়ায় মারাত্মক ঝুঁকিতে চিংড়ি চাষ। বর্তমানে বেড়িঁবাধ না থাকার কারণে চিংড়ি ঘের ব্যবসা দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে।

পাউবো সূত্র জানায়, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পেতে হলে উর্ধ্বতন কর্র্তপক্ষের সাথে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করতে হবে, না হয় কোন অবস্থাতেই ঠেকঁসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ সম্ভব হবে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা জানান, আমরা বিগত কয়েক বছর থেকে অধিক ঝুকিঁপূর্ণ দ্বীপ উপজেলার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের বরাদ্ধ চেয়ে কর্তৃপক্ষকে চাহিদাপত্র প্রেরণ করেছি, কুতুবদিয়ার পাশে পেকুয়া অংশে বাঁধ নির্মান হয়েছে। কিন্তু এ বেড়িবাধ অপ্রতুল। যার কারণে অপ্রতুল বরাদ্দ নিয়ে কাজ করলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। প্রতিবারই বেড়িবাঁধ নির্মানের নামে কোটি কোটি টাকা সাগরে নষ্ট হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে ঝুঁকির মধ্যে পড়া উপকূলবাসির জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের বিশেষ বরাদ্দ থাকলেও যেখানে আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পাওয়ার কথা সেখানে কেনইবা বারবার উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছি এমন প্রশ্ন জেলাবাসির। শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সর্বোপরি আধুনিক সুযোগ সুবিধা থেকে অনেকটা উপেক্ষিত হলেও তবু জেলাবাসির কোন দু:খ নেই, নেই কোন উচ্চ বিলাসী আকাঙ্খা। তাদের চাওয়া পাওয়া, দাবি শুধু একটাই বাচাঁর জন্য চাই টেকসই বেড়িবাঁধ। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নিবেন এটাই বঞ্চিত অবহেলিত জেলাবাসির প্রত্যাশা।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

14 − five =

আরও পড়ুন