আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফারের চোখে সেন্ট মার্টিন সাগরতলের জীববৈচিত্র

fec-image

বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফার ও ডাইভার শরীফ সারওয়ার। যিনি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সেন্ট মার্টিন দ্বীপসহ বঙ্গোপসাগরের তলদেশের জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতির ছবি তুলে আসছেন। ২০১২ সাল থেকে তিনি সাগরের গভীরে ডুবে ডুবে ছবি তুলে জলদুনিয়ার রহস্য উন্মোচন ও গবেষণায় সহায়তা করছেন। আবারও সেন্টমার্টিনে ৫৭ দিন ধরে ঘুরে দেখলেন সাগরতলের জীববৈচিত্র।

সেন্টমার্টিনে ৫৭ দিনে সাগরতলের জীববৈচিত্র দেখার অভিজ্ঞতা তুলে ধরলেন দেশের জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর এক সাক্ষাৎকারে।

শরীফ সারওয়ার বলেন, টানা কিছুদিন ঢাকায় থাকলেই কেমন যেন হাঁসফাঁস লাগে। জলজ প্রাণী ডাঙায় আটকা পড়লে যেমন পানির জন্য ছটফট করে, আমারও সেই দশা। গত আগস্টে প্রায় এক মাস মালদ্বীপে গিয়ে ডাইভ করেছি, ডাইভমাস্টার হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়ে সনদ পেয়েছি। তারপর দেশে ফিরে দুই মাস কেটেছে। সেন্ট মার্টিন খুলে দেওয়ার পরপরই গত ১৯ নভেম্বর ঢাকা ছাড়ি।

সেন্ট মার্টিনের পূর্ব বিচে আমার এক বন্ধুর স্কুবা ডাইভিং সেন্টার আছে। স্কুবা টেক বিডি নামের প্রতিষ্ঠানটি তিন বছর ধরে খুলেছেন তিনি। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটকদের স্কুবা করায় এই প্রতিষ্ঠান। ২০ নভেম্বর ওই সেন্টারেই গিয়ে উঠি।

২০১২ সাল থেকে সেন্ট মার্টিনে আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফি করি। বিগত কয়েক বছর সমুদ্র গবেষণাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যেতাম। এবার প্রতিষ্ঠানগুলো অনুমতি না পাওয়ায় আমারও কাজের চাপ ছিল না। নিজের মতো নির্ভার সেন্ট মার্টিন অন্বেষণের সুযোগ পেলাম। দিনে–রাতে যখন–তখন বেরিয়ে পড়তাম, ঘুরতাম দ্বীপের আনাচকানাচ। আর স্কুবা? সে তো ছিলই। মাস্ক, স্নোরকেলিংসহ স্কুবার অধিকাংশ সরঞ্জামই সঙ্গে ছিল। সেন্টার থেকে স্কুবা ট্যাংক আর স্কুবা কম্প্রেসর নিলেই হতো। ২০ নভেম্বরও পৌঁছে সন্ধ্যার পরই নেমে পড়েছিলাম পূর্ব বিচের ৩০০ মিটার দূরের সাগরে। এরপর প্রায় দুই মাসে দিনে–রাতে ২০–২৫ দিন ডাইভ করেছি।

উৎকণ্ঠিত মানুষের মুখ

নিয়ম অনুযায়ী অভিজ্ঞ একজন ডাইভার সঙ্গে নিয়ে স্কুবা করতে হয়। নিজে ডাইভমাস্টার হলেও এটি অনুসরণ করতে হয়। ২৫ কি ২৬ নভেম্বর এমনই সমুদ্রে নামি দুজন। সহ–ডাইভার এক ঘণ্টার মধ্যে উঠে যান। আমি পানির নিচেই থেকে যাই। এত স্বচ্ছ পানি! মায়ায় পড়ে যাই। ছবি তুলতে থাকি। অক্সিজেন পর্যাপ্ত, অন্য কোনো জটিলতাও নেই। তাই দীর্ঘ সময় কাটাতে থাকি। এদিকে ওপরে শোরগোল পড়ে যায়। আমি কোনো দুর্ঘটনায় পড়েছি, ধারণা করে কোস্টগার্ড ডাকা হয়।

ওপরে কী হচ্ছে সেসবের তো কিছুই আমি জানি না। নিজের মতো ছবি তুলে যাই। প্রায় তিন ঘণ্টা পর বুঝতে পারি ওপরে কোনো বোট এসেছে। উঠে এসে তো রীতিমতো থ! আমাকে উদ্ধার করতে সৈকতে মানুষজনের ভিড় লেগে গেছে। আমি আর তখন কী বলব!

প্রতিবার সমুদ্রে নামলেই কিছু না কিছু শিখি। এটাও একটা শিক্ষা। অন্যদের দুশ্চিন্তায় ফেলা উচিত হয়নি।

ডুব দিলেই মুগ্ধ হই

পুরো সময়ে নতুন কোনো সামুদ্রিক প্রাণীর দেখা পাইনি। তবে আগে দেখা অনেক মাছ, কোরাল, শেওলার ভালো ছবি তুলেছি। যেমন প্রতিবারের মতো ব্রেন কোরালের ছবি তুলেছি। মস্তিষ্কের মতো দেখতে এই ব্রেন কোরাল একটি অসাধারণ সামুদ্রিক প্রাণী, যার বৃদ্ধির হার অত্যন্ত ধীর। এটি বছরে মাত্র ১ থেকে ২ সেন্টিমিটার হারে বাড়ে। এই ধীর বৃদ্ধির কারণে বড় আকারের ব্রেন কোরালের বয়স অনেক হয়ে থাকে। কোনো কোনো ব্রেন কোরাল ৫০০ থেকে ৯০০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে বেঁচে থাকে। আমি যেটার ছবি তুলেছি, সেটা বেশ বড়। আমার মতো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ দুই হাত প্রসারিত করলে যতটুকু হয়, তার চেয়েও বড়। ধারণা করি, ৫০০ বছরের কম হবে না এর বয়স। এই দীর্ঘ জীবনকালের জন্য কোরাল সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা সমুদ্রের পরিবেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।

এবার জেলিফিশের উপস্থিতি বেশি টের পেয়েছি।

পরিত্যক্ত জালে ঢাকা কোরাল

দিনে ও রাতে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের স্থলভাগ ও সাগরতল দেখেছি। এক যুগের বেশি সময় দ্বীপের পরিবেশ, প্রকৃতি এবং জীববৈচিত্র্য খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করার অভিজ্ঞতা থেকে এবারের মতো স্বচ্ছ পানি আগে কখনো পাইনি। অক্টোবরে নাকি একদম মালদ্বীপের মতো স্ফটিকস্বচ্ছ ছিল, জানালেন স্থানীয়রা। তবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সেন্ট মার্টিনের পরিবেশের উন্নতি এবং পর্যটন নিয়ন্ত্রণের ফলে দূষণ কমার যে চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে, আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও চাক্ষুষ করার অভিজ্ঞতায় তার কোনো প্রমাণ পাইনি।

রাতের আঁধারে যখন কৃত্রিম আলোয় প্রবাল প্রাচীরগুলো আলোকিত হয়, তখন এক অদ্ভুত মায়ার সৃষ্টি হয়। নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি কোরালের ‘টেন্টাকল’ বা কর্ষিকাগুলোর খাদ্য গ্রহণ এবং সামুদ্রিক নিশাচর প্রাণীদের জীবনযাত্রা। ক্যামেরার লেন্সে ধরা পড়েছে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণীদের বেঁচে থাকার লড়াই। কিন্তু এই সৌন্দর্যের সমান্তরালে আমি যা দেখেছি, তা রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো। যেখানে স্বচ্ছ জলে রঙিন জীবনের দেখা পাওয়ার কথা, সেখানে কোরালগুলোর ওপর দেখেছি পরিত্যক্ত জালের স্তূপ। এসব জাল প্রবালপ্রাচীরের বৃদ্ধি থামিয়ে দিচ্ছে।

মুগ্ধ করেছে, কষ্টও দিয়েছে

স্রোতের সঙ্গে ভেসে চলা মাইক্রোপ্লাস্টিক বা প্লাস্টিকদানা এখন সাগরতলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর অতিরিক্ত পলি বা সেডিমেন্টেশনের কারণে কোরালগুলো শ্বাসরুদ্ধ হওয়ার দশা। প্রবালগুলো ধীরে ধীরে সাদা হয়ে যাচ্ছে, যাকে আমরা বলি ‘কোরাল ব্লিচিং’। কোরালগুলো যেন বাঁচার জন্য আর্তনাদ জানাচ্ছে।

শুধু জলতলে নয়, হাঁটতে গিয়ে চোখে পড়েছে সৈকতজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অগণিত প্লাস্টিকসামগ্রী। দুই মাসে একাধিক অলিভ রিডলি কচ্ছপসহ অনেক সামুদ্রিক প্রাণীকে সৈকতে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি। গ্রামের অলিগলি থেকে শুরু করে সৈকতের বালু—সবখানেই প্লাস্টিকের অবাধ বিচরণ চোখে পড়েছে। দুঃখজনক বিষয় হলো, গভীর রাতে দ্বীপে হাঁটতে বেরিয়ে দেখেছি, অনেক রিসোর্ট ও হোটেল তাদের বর্জ্য ও ময়লা-আবর্জনা সৈকতের বালুতে পুঁতে ফেলছে।

১৫ জানুয়ারি সেন্ট মার্টিন ছেড়েছি। সব মিলিয়ে এবারের সেন্ট মার্টিন আমাকে একই সঙ্গে মুগ্ধ করেছে, আবার ভীষণ কষ্টও দিয়েছে।

উৎস : প্রথম আলো

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন