আফগানিস্তান-পাকিস্তান সংঘাতের অচলাবস্থা নিরসন চাইছে রাশিয়া। ক্রমবর্ধমান সীমান্ত সংঘর্ষের মধ্যে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়ে বলেছে, অন্তর্নিহিত মতপার্থক্য নিরসন এবং রক্তপাত প্রতিরোধের একমাত্র কার্যকর উপায় হলো দু দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা একটি বিবৃতি জারি করে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষের দ্রুত বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং এই পরিস্থিতিটিকে তিনি একটি “বিপজ্জনক সংঘাত” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একই সাথে তিনি ইসলামাবাদ ও কাবুলকে অবিলম্বে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
রাশিয়া আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে অবিলম্বে “সংঘাতের এই অন্তহীন পথ” পরিহার করে তাদের অভিন্ন সীমান্তে বিরাজমান তীব্র সামরিক উত্তেজনা প্রশমনের জন্য সংলাপের পথ অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে উল্লেখ করে ১৮ মার্চ এ বিষয়ে টাইমস অব ইসলামাবাদ খবর প্রকাশ করেছে।
খবরে বলা হয়, নিয়মিত সেনা ইউনিট, বিমান এবং ভারী অস্ত্রশস্ত্রের অংশগ্রহণে হওয়া এই লড়াইয়ে উভয় পক্ষেই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে সীমান্ত এলাকার বেসামরিক নাগরিকরাও রয়েছেন।
কয়েক সপ্তাহ ধরে বাড়তে থাকা উত্তেজনার পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে সংঘর্ষ শুরু হয়, এবং পাকিস্তান ২১ ফেব্রুয়ারি আফগানিস্তানের নানগারহার, পাক্তিকা ও খোস্ত প্রদেশে কথিত জঙ্গি শিবির লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায়।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এই অভিযানগুলোকে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত ও সুনির্দিষ্ট বলে বর্ণনা করেছে, যার লক্ষ্য ছিল তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-এর গোপন আস্তানা ও সহযোগী সংগঠনগুলো, যার মধ্যে ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত সদস্যরাও রয়েছে।
ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে আফগান তালেবান-নেতৃত্বাধীন সরকারকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলাকারী টিটিপি যোদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার জন্য অভিযুক্ত করে আসছে।
দুই পক্ষের মধ্যে হতাহতের সংখ্যায় ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে, যা সংঘর্ষের তীব্রতাকে প্রতিফলিত করে।
প্রাথমিক সংঘর্ষে পাকিস্তান ১২ জন সৈন্য নিহত ও ২৭ জন আহত হওয়ার খবর দিয়েছে, অন্যদিকে আফগান সূত্রগুলো পাকিস্তানি পক্ষে এর চেয়ে অনেক বেশি ক্ষয়ক্ষতির দাবি করেছে।
এর প্রতিশোধ হিসেবে আফগান বাহিনী খাইবার পাখতুনখাওয়ার মতো অঞ্চলে পাকিস্তানি সামরিক চৌকির ওপর হামলাসহ আন্তঃসীমান্ত অভিযান পরিচালনা করে।
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আফগানদের দাবির মধ্যে বেশ কয়েকটি পাকিস্তানি চৌকি ধ্বংস এবং পাকিস্তানি সৈন্যদের ব্যাপক হতাহতের ঘটনা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
মার্চের শুরুতেই ২ হাজার ৬৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ ডুরান্ড লাইনের একাধিক পয়েন্ট জুড়ে লড়াই ছড়িয়ে পড়েছিল এবং এতে গোলাবর্ষণ, বিমান হামলা ও স্থল আক্রমণের আদান-প্রদান ঘটে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা আফগানিস্তানে সহিংসতার কারণে বাস্তুচ্যুত ১ লাখ ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষ এবং পাকিস্তানে বাস্তুচ্যুত অতিরিক্ত ৩ হাজার মানুষের তথ্য নথিভুক্ত করেছে।
শুধু প্রথম সপ্তাহেই প্রায় ৬৬,০০০ আফগান বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে জানা গেছে, কারণ গোলাবর্ষণ ও বিস্ফোরণের ফলে পরিবারগুলো সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে।
এই সংঘাতের সবচেয়ে বেশি শিকার হয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বেসামরিক নাগরিকরা, যাদের বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে।
এই উত্তেজনা বৃদ্ধি অক্টোবর ২০২৫-এর আগের সংঘর্ষের তুলনায় একটি উল্লেখযোগ্য অবনতি নির্দেশ করে, যখন পাকিস্তান কাবুলে টিটিপি নেতা নূর ওয়ালি মেহসুদকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল।
ওই ঘটনাগুলোর ফলে আফগানরা প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেয় এবং একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি হয়, কিন্তু চাপা অসন্তোষগুলো রয়েই গিয়েছিল বলেও টাইমস অব ইসলামাবাদের খবরে উল্লেখ করা হয়।
