আবারো বিকট শব্দে কেঁপে উঠলো টেকনাফ সীমান্ত, আতঙ্কে স্থানীয়রা

fec-image

কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তের এপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রাতভর বিমান হামলা, গোলাগুলি ও মর্টারশেল বিস্ফোরণের বিকট শব্দ ভেসে এসেছে। থেমে থেকে চলা শব্দে এপারের মানুষ আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। রাখাইনে বিদ্রোহীদের সঙ্গে মিয়ানমারের সামরিক (জান্তা) বাহিনীর তুমুল লড়াই চলছে। রাজ্যটির অনেক এলাকা জান্তার হাতছাড়া হলেও তারা বিমান থেকে হামলা অব্যাহত রেখেছে।

রবিবার (৭ জুলাই) রাত ১২টা থেকে সোমবার দুপুর পর্যন্ত কিছুক্ষণ পরপর ভারী গোলার শব্দ শোনা যায়।

রাখাইনে বিদ্রোহী সংগঠন আরাকান আর্মি ও জান্তা বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় টেকনাফ সীমান্তের এপারের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে আবারও অনুপ্রবেশের ঝুঁকি বেড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে গতকাল নাফনদীতে কাঁকড়া শিকারে যাওয়া এক রোহিঙ্গার লাশ উদ্ধার করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি মাইন বিস্ফোরণের আঘাতে নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও দুই রোহিঙ্গা আহত হন। এ পরিস্থিতিতে টেকনাফের নাফ নদীতে জেলেদের মাছ শিকারে না যেতে মাইকিং ও সর্তক করেছে নৌ-পুলিশ।

টেকনাফের নৌ-পুলিশের ইনচার্জ পরিদর্শক তপন কুমার বিশ্বাস বলেন, নাফ নদীতে কাঁকড়া শিকারে যাওয়া এক রোহিঙ্গার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া আরও দুই রোহিঙ্গাকে আহত অবস্থায় পাওয়া গেছে। তারা মাইন বিস্ফোরণ নাকি মর্টার শেলের আঘাতে হতাহত হয়েছেন, তা বলা মুশকিল। তবে কীভাবে মৃত্যু হয়েছেন, তা চিকিৎসকরা স্পষ্ট বলতে পারবেন।

তিনি বলেন, সীমান্তে রাতভর গোলার বিকট শব্দ শোনা যায়। ফলে এখন থেকে জেলেরা যাতে নাফ নদীতে না যান, সেজন্য মাইকিংয়ের পাশাপাশি সর্তক করা হয়েছে। এছাড়া নাফ নদীতে রোহিঙ্গাকে মৃত উদ্ধারের বিষয়ে মামলার প্রস্তুতি চলছে।

সীমান্তের বাসিন্দারা বলছেন, মিয়ানমারে চলমান যুদ্ধের কারণে সীমান্তের বাসিন্দাদের আতঙ্কে দিন কাটছে। রোববার রাতে গোলার বিকট শব্দে তাদের বাড়িঘর কেঁপে ওঠে। এমন শব্দ তারা আগে কখনো শোনেনি।

টেকনাফ সীমান্ত এলাকা জালিয়া পাড়ার বাসিন্দা আব্দুল কাদির বলেন, ‘ওপারে টানা কয়েকমাস ধরে চলা যুদ্ধে এপারে মানুষের আতঙ্ক দিন দিন বাড়ছে। গতকাল রাতে যুদ্ধ বিমান ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। আমাদের বাড়িঘরের দরজা-জানালা কেঁপে ওঠে। ভয়ে আমরা পরিবারের লোকজন নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি। এমন বিকট শব্দ আগে শুনিনি। সারারাত আমরা নির্ঘুম রাত কাটিয়েছি।’

টেকনাফ ২-বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মহিউদ্দীন আহমেদ বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বিভিন্ন জায়গায় গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। নতুন করে যাতে কেউ অনুপ্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য সর্বোচ্চ সর্তক আছি। সীমান্তে বসবাসকারী লোকজনকে জরুরি কাজ ছাড়া ঘুরাঘুরি না করতে বলা হয়েছে।’

স্থানীয়রা জানান, রোববার গভীর থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত কক্সবাজারের টেকনাফের হোয়াইক্যং, হ্নীলা, পৌরসভা, সদর, সাবরাং ও সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের সীমান্তে ভারী গোলার শব্দ শোনা যায়। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিস্ফোরণের কথা জানিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছেন অনেকে।

ব্যাংক কর্মকর্তা মোহাম্মদ হানিফ একজন লিখেছেন, মিয়ানমারে এ যাবত যত সব মর্টার শেলের বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে আজ ভোরে সব শব্দকে হার মানিয়েছে। আমরা যারা নাফনদীর সীমানায় বাস করি তারা কেউ ভয়ে ঘুমাতেও পারছি না।

শাহপরীর দ্বীপ জেটি ঘাটের দোকানি শফিউল আলম বলেন, সকালেও মিয়ানমারের বিকট গোলার বিকট শব্দ শোনা গেছে। টেকনাফ-সেন্টমার্টিনে মানুষ সাবধানে চলাচল করছেন।

হৃীলার বাসিন্দা মো. আলম বলেন, ‘আমার এলাকায় রাতে অনেক ভারী গোলার শব্দ শোনা গেছে। সকাল থেকে শব্দ কমেছে। তবে আতঙ্ক কমেনি।’

সূত্র জানায়, মিয়ানমারের রাখাইনে জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে যুদ্ধে রাখাইনের মংডু শহরের উপকণ্ঠ ছাড়াও অনেক স্থানে হেলিকপ্টার হামলা হয়েছে। এসব এলাকার প্রায় চার হাজার লোক বাড়িঘর ছেড়ে সীমান্তের গ্রামে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। তারা সুযোগ বুঝে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় আছেন।

টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপ ৭ নম্বর ওর্য়াডের ইউপি সদস্য আব্দুল মন্নান বলেন, ‘রাতে সীমান্তে ভারী গোলার শব্দ পাওয়া গেছে। সকালে কিছুটা শব্দ কমেছে। আমরা বিজিবির সহায়তায় সীমান্তের লোকজনকে জরুরি কাজ ছাড়া অযথা সীমান্তে ঘুরাঘুরি না করতে নিষেধ করেছি।’

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আদনান চৌধুরী বলেন, প্রায় সাড়ে তিন মাসের বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে বিকট শব্দ ভেসে আসছে। তবে গতকাল রাতের শব্দগুলো ছিল ভয়ংকর। সীমান্তের বসতবাড়ি ও দালান কেঁপে উঠছে।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন