আমরা ভাল আছি, শান্তিতে আছি: দু’মারমা কিশোরী

নিজস্ব প্রতিনিধি:

আমরা ভাল আছি, শান্তিতে আছি। খাওয়া-দাওয়া ঠিক মতো করছি। আর কোন অসুবিধা নেই আমাদের। আমাদের মা-বাবা এবং ভাই-বোনকে নিয়ে ভাল সময়  কাটাচ্ছি। এ ভাবে আনন্দ-উল্লাসে অনুভূতিগুলো প্রকাশ করেন রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলায় কথিত নির্যাতিত দুই মারমা কিশোরী।

মঙ্গলবার (২০ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ওই দু’কিশোরী সাংবাদিকদের কাছে তাদের অভিব্যক্তিগুলো এভাবেই প্রকাশ করে।

ওই দু’কিশোরীর বাবা জানান, এ অঞ্চলের কিছু আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের রাজনীতির শিকার হয়েছে আমার মেয়েরা এবং আমার পরিবার। প্রতিনিয়ত ভয়ে থাকতাম আমার মেয়েদের হারানোর এবং নিরাপত্তা নিয়ে। আর আমার মেয়েদের নিজের কাছে রাখতে চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন করি এবং উচ্চ আদালত আমার এ আবেদন শুনে আমার মেয়েদের আমার কাছে রাখার নির্দেশ প্রদান করেন। এর চেয়ে আনন্দ আর কি হতে পারে?

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ওই দু’কিশোরীর মা আনন্দ অভিব্যক্তি প্রকাশ করে জানান, আমার আর কিছুই চাওয়ার নেই। আমার মেয়েরা আমার কাছে আছে। এটাই আমার বড় পাওনা। যারা আমার মেয়েদের আমার কাছে রাখার জন্য সহযোগিতা করেছেন তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আমরা এখন নিরাপদে রয়েছি।

ঘটনার বিবরণ:

কথিত নির্যাতনের শিকার দু’কিশোরীর পরিবার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ২১জানুয়ারি রাতে প্রতিদিনের ন্যায় বিলাইছড়িতে নিরাপত্তা বজায় রাখতে ওই উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নে সন্ত্রাস বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি দল টহল দেয়। একই রাতে অভিযান চালিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দু’জনকে আটক করে। এছাড়া ওই উপজেলায় আ’লীগ নেতাদের উপর জেএসএস’র হামলায় পুরো উপজেলায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

এদিকে নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান চালিয়ে দুই ব্যক্তিকে আটকের পরের দিন আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) পক্ষ থেকে গণমাধ্যমের কাছে একটি বিবৃতি পাঠিয়ে দাবি করা হয় যে, অভিযানের রাতে নিরাপত্তা বাহিনীর কতিপয় সদস্যের হাতে ওই এলাকায় দু’জন মারমা কিশারী ধর্ষণের শিকার হয়। আর এ ঘটনার পর থেকে পাহাড়ের বিভিন্ন আঞ্চলিক রাজনৈতিক এবং সশস্ত্র দলগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকসহ নানা মাধ্যমে কথিত এ ঘটনাকে রং, রূপ রস দিয়ে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে  তুলতে থাকে।  সন্ত্রাসী আটক অভিযানকে  ভিন্ন খাতে প্রবাহিতের চেষ্টা চালালে শান্তির পাহাড় আবারো উত্তপ্ত হয়ে উঠে। এদিকে ঘটনার পরের দিন কথিত ধর্ষিত দুই কিশোরীকে কে বা কারা দুর্গম বিলাইছড়ির ফারুয়া ইউনিয়ন থেকে এনে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেয়।  খবর পেয়ে প্রশাসন দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে ঘটনার সতত্য যাচাইয়ের তৎপরতা শুরু করে। পুলিশ ও  জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ হাসপাতালে পৌঁছে দু’কিশোরীর জবানবন্দী রেকর্ড করানোর ব্যবস্থা নেয়।

হাসপাতালে রাণীর রহস্যজনক অবস্থান নেয়া:

ঘটনার তৃতীয় দিন  (২৩ জানুয়ারি)  দু’কিশোরীকে নিজের জিম্মায় নেয়ার জন্য পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নেতা-কর্মীদের নিয়ে রানি ইয়েন ইয়েন হাসপাতালে অবস্থান নেয় এবং প্রশাসনের সাথে ঔদ্ধত্বপূর্ণ আচরণ করেন।  এদিকে হাসপাতালে গিয়ে দুই কিশোরীর সাথে কথা বলেন, চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য বাঞ্চিতা চাকমা, এডভোকেট সুষ্মিতা চাকমাসহ আরো বেশ কয়েকজন। পরিদর্শন শেষে চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় ও রানি ইয়ান ইয়ান সাংবাদিকদের বলেন, হাসপাতালে কিশোরী দুটি মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছেন তাই তাদেরকে রানীর জিম্মায় নিতে চান তারা

২৪জানুয়ারি কিশোরী পরিবারের সংবাদ সম্মেলন:

বাড়ি থেকে তুলে এনে ২৩ জানুয়ারি দুই কিশোরীকে বা কারা হাসপাতালে ভর্তি করানোর পরের দিন অর্থাৎ ২৪ জানুয়ারি রাঙামাটি আসেন কিশোরীদ্বয়ের পরিবার। ওইদিনেই তারা  (দুপুরে) রাঙামাটি প্রেসক্লাবে  এক সংবাদ সন্মেলনের আয়োজন করে। আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নিজের দুই মেয়ের কথিত ধর্ষণ নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। তার দুই মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে তা  তারা সম্পূর্ণটাই মিথ্যা বলে দাবি করেছেন। পাহাড়ের একটি আঞ্চলিক দল বরং ধর্ষণের মিথ্যা অপবাদ ছড়িয়ে তাদেরকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে এবং রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে হীন ষড়যন্ত্রে লীপ্ত বলে তারা জানান।

কিশোরীর পিতা সংবাদ সন্মেলনে বলেন, চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি রাতে জোড় করে তাঁর দুই কিশোরি মেয়েকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতন চালায় একদল অজ্ঞাত যুবক। কিন্তু প্রাণহানীর ভয়ে প্রতিবাদ করতে পারিনি তারা।  আর এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কে বা কারা ধর্ষণ করা হয়েছে এমন অভিযোগে তার দুই মেয়েকে ২৩ জানুয়ারি দুপুরে  কে বা কারা রাঙামাটি হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায়। অথচ এ ঘটনায় তিনি এবং তার  স্ত্রী কিছুই জানেন না বলেও  জানান।

রানীর রহস্যজনক ভূমিকা:

ঘটনার পর থেকে জেএসএস সরাসরি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনে। ফেসবুকেও এমন ইঙ্গিত দিয়ে স্ট্যাটার্স দেয় রানি ইয়ান ইয়ান। কিন্তু রানি ইয়ান ইয়ান এ ঘটনার তথা ধর্ষণের তদন্ত বা দোষীদের বিচার দাবি না করে দুই কিশোরীকে নিজের জিম্মায় নেয়ার বারবার চেষ্টা চালাতে থাকে। তার এ ধরণের ভূমিকা রহস্যর জন্ম দিতে থাকে। রানি এবার দুই কিশোরীকে নিজের জিম্মায় নিতে রাঙামাটি আদালতের দারস্থ হন। আদালত কিশোরী দুটির ডাক্তারি পরীক্ষা ও বয়স নির্ধারনী পরীক্ষা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দুই কিশোরীকে হাসপাতালে রাখার নির্দেশ দেন। সর্বশেষ দুই কিশোরীকে রানীর জিম্মায় দিতে চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি সুলতানা কামালের নেতৃত্বে উচ্চ আতালতে একটি রিট পিটিশন দাখিল করা হয়। বিষয়টি এখনো আদালতে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ১৬ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটি শহরে সাবরাং রেস্টুরেন্টে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক গৌতম দেওয়ান বলেন, পাহাড়িদের প্রথাগত নিয়মে নির্যাতিত দুই কিশোরীকে রানি নিজের জিম্মায় নিতে চেয়েছেন। এ ঘটনায়  পৃথক পৃথক দিনে রাঙামাটির সাবারাং রেস্টুরেন্ট ও টঙ্গা কার্যালয়ে দু’দফা সংবাদ সন্মেলন  করেছে।

বিজ্ঞ মহলের মতামত:

রানি ইয়ান ইয়ান নিজের জিম্মায় নেয়ার চেষ্টাকে উদ্দেশ্যমূলক বলে মনে করছেন জেলার বিভিন্ন বিজ্ঞ মহল। তাদের অভিমত, আইনের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করা যেতো। কিন্তু রানীর এমন ভূমিকা কখনও কাম্য নয় বলে তারা জানান। তারা বলেন, পাহাড়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের আরো কত নারী ধর্ষিত হয়েছে, কত মানুষের প্রাণ গেছে এ নিয়ে রানীর কোন ভূমিকা দেখা যায়নি। অথচ এ ঘটনায় রানি দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি সন্মান প্রদর্শন না করে বারবার ভিকটিমদের নিজ জিম্মায় নেওয়ার চেষ্টা চালাতে থাকে। রহস্যজনক কারণে তিনি কথিত এ ঘটনাকে জোড়ালো ভাবে সত্য দাবি করে আসছেন এবং এর সাথে তার মনগড়া কিছু লোকের নাম জড়িয়ে শাস্তি দাবি করছেন। আইনকে আইনের গতিতে চলতে না দিয়ে বল প্রয়োগের প্রচেষ্টা চালিয়ে পার্বত্যঞ্চলের শান্ত পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তোলার অপচেষ্টায়  লিপ্ত হয়েছেন।

সর্বশেষ  তথ্যে জানা গেছে, ওই দুই কিশোরীকে মা-বাবার হেফাজতে দেওয়ার সময় হাসপাতালে চাকমা চিফের পত্নী ইয়েন ইয়েনসহ তার ভলান্টিয়ারদের মারধর করার ব্যাপারটি নিয়ে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করেছে। সংগঠনটির রাঙামাটির সদস্য বাঞ্চিতা চাকমাকে প্রধান করে এই কমিটি গঠন করা হয়। মঙ্গলবার থেকে ওই কমিটি রাঙামাটিতে কাজ শুরু করেছে বলে জানাগেছে। তার আগে সোমবার রাঙামাটিস্থ চাকমা রাজবাড়িতে সংহতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। জেলা শহরে প্রবেশ নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর সশস্ত্র নেতাকর্মীরা তাদের সাংগঠনিক ব্যানার ফেস্টুন নিয়ে অংশ নিয়েছে। বিতর্কিত কিছু সংগঠনের অংশ গ্রহণ এই সমাবেশকে ঘিরে শুরু হয়েছে ব্যাপক সমালোচনা।

রাঙামাটি জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক দু’কিশোরীকে তাদের মা-বাবার হেফাজতে দেয়া হয়েছে এবং প্রশাসন তাদের শান্তি ও নিরাপত্তা ব্যাপারটি নিশ্চিত করেছে।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

sixteen − eight =

আরও পড়ুন