আরাকান আর্মিকে দুর্বল করে রাখাইন দখলে মরিয়া মিয়ানমার জান্তা


কয়েক বছর ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। রাজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে কেবল সিত্তে, কিয়াকফিউ ও মানাউং সামরিক জান্তার হাতে তাও দুর্বলভাবে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপের কারণে কয়েকটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী জান্তার সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে গেছে। এতে পুনর্গঠনের সুযোগ পেয়ে জান্তা আবারও রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার কৌশল নিচ্ছে। আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযান শুরু করেছে দেশটির সরকারি সেনাবাহিনী। রাখাইনের দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে সমন্বিত স্থল, নৌ ও বিমান হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত বিমান হামলাও অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও বিশ্লেষকদের মতে, জান্তা এখন বঙ্গোপসাগরীয় রুটে গোলাবারুদ ও সেনা পরিবহন জোরদার করেছে। দক্ষিণ রাখাইনের কিয়াকফিউ ঘাঁটি থেকে রামরি দ্বীপ হয়ে আন, থান্দওয়ে ও তাউংগুপ এলাকায় প্রবেশের কৌশল নিচ্ছে। সাবেক জান্তা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জিন ইয়াউ বার্মা নিউজ ইন্টারন্যাশনালকে জানিয়েছেন, জান্তার মূল লক্ষ্য আরাকান আর্মিকে দুর্বল করা এবং বিশেষ করে দক্ষিণ রাখাইন পুনর্দখল করা।
চীনের বড় অবকাঠামো প্রকল্প থাকায় কিয়াকফিউ শহরটি জান্তার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকদের ধারণা, কিয়াকফিউয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পর জান্তা সেখান থেকেই দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরগুলোর দিকে আক্রমণ জোরদার করতে পারে।
অন্যদিকে রাজধানী সিত্তে থেকেও পন্নাগিউন টাউনশিপে ঢোকার চেষ্টা করছে জান্তা বাহিনী। সেতু মেরামতের পর তারা ধীরে ধীরে আগাচ্ছে এবং অগ্রসর হওয়ার আগে নিয়মিত বিমান হামলা চালিয়ে সামরিক বহরকে নিরাপদ পথ করে দিচ্ছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, পন্নাগিউনে প্রতিদিনের হামলাগুলো বড় ধরনের স্থল অভিযানের পূর্ব প্রস্তুতি। পন্নাগিউন দখলে নিতে পারলে সিত্তে শহরের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরো শক্তিশালী হবে এবং এরপর বুথিডং, মংডু ও রাথেডংয়ের দিকে অগ্রসর হওয়ার পথ খুলে যাবে। ক্যাপ্টেন জিন ইয়াউয়ের মতে, দক্ষিণের অভিযানে ব্যর্থ হলেও উত্তরে জান্তা সমান্তরাল চাপ বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মংডু ও থান্দওয়ে উপকূলে জান্তার নৌ-চলাচল বেড়েছে যা সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ অভিযানের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং স্থল যোগাযোগ ব্যাহত থাকায় বড় সাফল্য পাওয়া জান্তার জন্য কঠিন।
অল আরাকান স্টুডেন্টস অ্যান্ড ইয়ুথস কংগ্রেসের সাবেক সম্পাদক কো তাইন উয়ের মতে, জান্তার আক্রমণাত্মক অবস্থান বাস্তবে টেকসই নয়; কারণ আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ বিস্তৃত এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতাও শক্তিশালী। তবে তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অভাব যা জান্তার বিমান হামলাকে মারাত্মক করে তুলেছে। এসব হামলায় বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। জান্তা দাবি করছে, তারা ‘সন্ত্রাসীদের’ লক্ষ্যবস্তু করছে; কিন্তু স্থানীয় সূত্র বলছে, নিহতদের বড় অংশই নারী ও শিশু, আর হামলার শিকার হচ্ছে স্কুল, মসজিদ, শরণার্থী শিবির এমনকি বৌদ্ধ মঠও। ৭ নভেম্বর পকতাউ টাউনশিপের দুটি গ্রামে বিমান হামলায় পাঁচজন নিহত ও নয়জন আহত হয়।
রাখাইন রাজ্য দীর্ঘদিন ধরেই অবরোধের করে রেখেছে সামরিক জান্তা। খাদ্য, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের প্রবেশ বন্ধ। কৃষিপণ্য ও সামুদ্রিক মাছ রপ্তানিতেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সড়ক ও নদীপথ বন্ধ থাকায় মানুষ বিপজ্জনক বিকল্প রুটে সীমিত পরিসরে পণ্য পরিবহন করছে। এতে পণ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়েছে এবং কর্মসংস্থান প্রায় নেই বললেই চলে। কৃষকরা ধান বিক্রি করতে পারছে না, আর স্থানীয় ক্রয়ক্ষমতা এত কমে গেছে যে উৎপাদনের দামও পড়ে গেছে মানুষ খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছে।
আরাকান আর্মি প্রশাসনিকভাবে অধিকাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করলেও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না থাকায় সীমান্ত দিয়ে স্বাভাবিক পণ্য আমদানি সম্ভব হচ্ছে না। ভারতের মিজোরামের পালেতও সীমান্ত দিয়ে সীমিত চাল-তেল আসে, যা অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয়ের কারণে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। অন্যদিকে জান্তা নিয়ন্ত্রিত সিত্তেতে খাদ্য ও জ্বালানি কোটাভিত্তিক বিতরণ হচ্ছে। সেনাবাহিনী নিজেই রেশনিংয়ের মাধ্যমে পণ্য বিতরণ করছে। সামনের দিনগুলোতে সামরিক জান্তা সমন্বিত জোরদার হামলা চালালে রাখাইনে আরো বিপুল পরিমাণ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সামনে জান্তা বড় ধরনের সমন্বিত হামলা চালালে রাখাইনে আরও বিপুল সংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। জান্তা যদি রাখাইনের বিভিন্ন অংশ পুনর্দখল করতে সক্ষম হয়, তাহলে শুধু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিই বদলাবে না, অঞ্চলের ভূরাজনীতিতেও পরিবর্তন আসবে। তবে স্থল যোগাযোগে দুর্বলতা এবং জনসমর্থনের অভাব এ দুটি কারণেই রাখাইন পুরোপুরি পুনর্দখল করা জান্তার জন্য সহজ হবে না।

















