আসামের ইনার লাইন প্রথা পার্বত্য চট্টগ্রামে

fec-image

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর চুক্তি স্বাক্ষরের পর জেএসএস পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিবিরোধী সবচেয়ে কার্যকর যে উদ্যোগটি নিয়েছিল, সেটি হচ্ছে অঘোষিত ইনার লাইন প্রথার প্রবর্তন।

পাহাড়ের যেখানে যেখানে বাঙালি বসতির পর অন্যকোনো বসতি ছিল না, বনভূমি বা রিজার্ভ ফরেস্ট ছিল, সেইসব এলাকাকে শুরুতেই টার্গেট করে তারা। বাঙালি বসতির সীমানা যেখানে শেষ সেখান থেকেই তারা পাহাড়িদের নতুন বসতি গড়েছে পরিকল্পিতভাবে। যাতে বাঙালি বসতিগুলো আর কোনোভাবেই বিস্তৃত হতে না পারে। এর জন্য বিভিন্ন এলাকা থেকে পাহাড়িদের নিয়ে এসেছে তারা।

এটা যেমন দেখতে পাওয়া যাবে সাজেক যাওয়ার পথের দুই পাশে, তেমনি দেখা যাবে লংগদু, বাঘাইছড়ি উপজেলার পূর্বপাড়ের বাঙালি বসতিগুলোর শেষ সীমানার দিকে তাকালেও। লংগদু উপজেলার পশ্চিমপাড়েও এমন উদাহরণ আছে। আমার জানা মতে, এমন উদাহরণ আছে মাটিরাঙ্গা, রামগড়, মহালছড়িতেও। খুঁজলে জানা যাবে হয়তো আরো কত কত এলাকায় পাহাড়িদের এমন নতুন বসতি গড়ে উঠেছে বাঙালি বসতির সংলগ্ন এলাকাগুলোতে।

প্রথমে তারা বাঙালি বসতিগুলোকে পাহাড়ি বসতিগুলো দ্বারা গণ্ডিবদ্ধ করেছে। তারপর পাহাড়িদের উপর জারি করেছে এক বিশেষ বিধান, না খেয়ে মারা গেলেও বাঙালিদের কাছে জমি বিক্রি করা যাবে না। ভুল ক্রমেও যদি কেউ বাঙালিদের কাছে জমি বিক্রি করে তাহলে তার জীবন শেষ।

২০০৫/০৬ সালের দিকে মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক জীবন নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে বিষয়টি প্রথমে উপলব্ধি করতে পারি। কারণ, এই ইনার লাইন প্রথা নিয়ে তিনি এক সময় আসামে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। সেই ইতিহাস পড়তে গিয়েই বুঝতে পারি, অঘোষিতভাবে আমাদের পাহাড়েও জেএসএস সেই প্রথার প্রচলন শুরু করেছে।

তখন যাদের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল, তাদের কারো কারো কাছে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করেছিলাম। কিন্তু তারা এটাকে তেমন একটা পাত্তা দেননি। বলেছিলেন, বাঙালিদের নিষেধ করেছে কে? তারা চাইলেও তো, নতুন নতুন এলাকায় বসতি গড়তেই পারে। কোনো কোনো এলাকায় সম্ভবত তেমন চেষ্টা হয়েও ছিল, কিন্তু নিরাপত্তাহীনতার কারণে সেসব সফল হয়নি।

বাঙালি বসতিগুলোর বিস্তৃতি সম্ভব না হলেও পাহাড়িদের নতুন বসতিগুলো নিত্য সম্প্রসারিত হচ্ছে। লংগদু, দীঘিনালার বাবুছড়া, মহালছড়ির কেয়াং ঘাটসহ বিভিন্ন এলাকায় বাঙালিদের রেকর্ডভুক্ত জমি দখল করে কেয়াং নির্মাণ করাও তাদের একই কৌশলের অংশ। গুচ্ছগ্রামবাসীদের নিজভূমিতে ফিরতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিও সেই কৌশলের অংশ।

প্রত্যাহার করা সেনাক্যাম্পগুলো দখল করে কেয়াং বা বসতি নির্মাণও তাদের সেই লক্ষ্যেরই অন্তর্গত। শুধু তাই নয়, বর্তমানে পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে নতুন নতুন সড়ক নির্মাণ হওয়ার পরই দেখা যাচ্ছে, এর দুই পাশে কোথা থেকে এসে যেন পাহাড়িরা নতুন নতুন ঘর বাঁধতে শুরু করে। এটাও তাদের একই পরিকল্পনার অংশ।

এইসব নতুন বসতি গড়তে যাদের নিয়ে আসা হয়েছে তাদের অনেকেই এখন ২/৩ এলাকার বাসিন্দা। তারা আগে যেখানে ছিলেন সেখানে যেমন তাদের আবাস আছে, ফসলের জমি আছে, তেমনি নতুন এলাকাতেও সেইসব আছে। এই সুযোগ যে শুধু আমাদের দেশের পাহাড়ি নাগরিকরাই নিয়েছে তা কিন্তু নয়, সীমান্তের অপর পাড়ে থাকা তাদের আত্মীয়-স্বজনরাও সুযোগ নিয়েছে বলে প্রচার আছে।

এর ফলে পার্বত্য বাঙালিরা যেমন গণ্ডিবদ্ধ হয়ে পড়েছে, তেমনি তাদের নিরাপত্তা সঙ্কটও বেড়েছে। এখন সেনাক্যাম্প প্রত্যাহারের মাধ্যমে এই সঙ্কটকে চূড়ান্ত করতে পারলেই বাঙালিদের পাহাড়ছাড়া করাটা শুধু সময়ের ব্যাপার হয়ে যাবে।

এতদিন তারা এই ইনার লাইন প্রথাকে নীরবে কার্যকর করে, এখন সেটা প্রকাশ্যে এনেছে। সম্প্রতি জেএসএস সরকারের কাছে দাবি করেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখতে ইনার লাইন প্রথা চালু করার জন্য। যদিও ইতোমধ্যে তারা সেটা কার্যকর করে ফেলেছে। এখন সরকারকে দিয়ে এর চূড়ান্ত ফয়সালা করিয়ে নিতে চাচ্ছে।

তাদের এই চক্রান্ত এখনো যদি কারো বুঝতে অসুবিধা হয়, তাহলে বলার কিছু নেই। তবে সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি, বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবনার অবকাশ এখনো আছে। আমরা প্রত্যাশা করব, যাদের সুযোগ আছে, তারা এটা নিয়ে ভাববেন এবং চক্রান্তের জাল ছিন্ন করতে যা যা করণীয়, সে ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন।

এর প্রথম ধাপ হতে পারে সকল চক্রান্ত এবং বাধা অতিক্রম করে দ্রুততম সময় গুচ্ছগ্রামবাসীকে তাদের নিজ ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত করা। ধাপে ধাপে অন্য পদক্ষেপগুলোও নেওয়া যেতে পারে।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

[email protected]

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × 1 =

আরও পড়ুন