পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় পাহাড়ি সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) নতুন করে তাদের পরিধি বাড়াচ্ছে বলে জানিয়েছেন দেশের নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকর্তারা। সংগঠনটির নতুন সদস্য সংগ্রহ অভিযান পাহাড়ে বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে এবং তা আবারও একটি জটিল হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ভূত এই পরিস্থিতি দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সামরিক ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, এই সংগঠনটি সম্প্রতি পাহাড়ি যুবকদের দলে টানার প্রক্রিয়া জোরদার করেছে। এমনকি সীমান্তের কাছাকাছি দুর্গম বনাঞ্চলে নতুন সদস্যদের একাংশকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
নিরাপত্তা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাহাড়ের সাম্প্রতিক এসব ঘটনা সরকারের সর্বোচ্চ মহলকে জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেওয়া না হলেও পাহাড়ি জেলাগুলোর সামগ্রিক নিরাপত্তার ওপর এর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা খতিয়ে দেখছে কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয় বেশ কয়েকটি সূত্র দেশীয় গণমাধ্যম ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানিয়েছে, ইউপিডিএফ-এর তিনজন শীর্ষ নেতা—প্রসিত বিকাশ খিসা, রবি শঙ্কর চাকমা ও মাইকেল চাকমা—বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে এবং একই সাথে বাংলাদেশের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। একই সূত্রগুলো অভিযোগ করেছে যে, অব্যাহত আর্থিক ও লজিস্টিক সহায়তা সংগঠনটিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জুড়ে নিয়োগ কার্যক্রম জোরদার করতে সক্ষম করেছে।

শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও আওঙ্গে মারমা দলের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র হিসেবে কাজ করছেন। মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, রাঙ্গামাটিতে দলের বিষয়াদি পরিচালনা করেন অর্কিড চাকমা, আর খাগড়াছড়িতে কার্যক্রম তদারকি করেন নিরন চাকমা। এছাড়াও, ইউপিডিএফ-এর প্রধান ঘাঁটি খাগড়াছড়িতে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের (পিসিপি) প্রাক্তন নেতা অমল ত্রিপুরা গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করছেন।
সূত্রগুলোর দাবি, ইউপিডিএফ ইতোমধ্যে তাদের সশস্ত্র শাখাকে আকার ও সংখ্যার দিক থেকে বেশ শক্তিশালী করে তুলেছে। এই শাখার নেতৃত্বে রয়েছেন আনন্দ প্রকাশ চাকমা। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) দাবি অনুযায়ী, আনন্দ প্রকাশ চাকমা ছিলেন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (এমএন লারমা) হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত গ্রুপের সদস্য।
সূত্র জানায়, ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় কমান্ড এবং প্রধান ঘাঁটিগুলো রাঙ্গামাটির কাউখালী উপজেলা এবং খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত।
খাগড়াছড়ি জেলার একটি বড় অংশ জুড়ে সংগঠনটির উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। রাঙ্গামাটিতে নানিয়ারচর, কাউখালী, লংগদু এবং বাঘাইছড়ির একাংশে তাদের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। এ ছাড়া রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি মহাসড়কে অবস্থিত রাঙ্গামাটি সদরের কুতুকছড়ি এলাকাটি তাদের অন্যতম প্রধান আস্তানা হিসেবে পরিচিত।
চলমান নজরদারির সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা দাবি করেন, এই গোষ্ঠীর অর্থায়ন ও অস্ত্রের সম্ভাব্য উৎস সম্পর্কে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কাছে তথ্য রয়েছে। একই সঙ্গে দেশে ও দেশের বাইরে অবস্থানরত শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কারা যোগাযোগ রাখছেন, সেই সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্যও তাদের কাছে আছে।
তবে ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমা তাদের সংগঠন সশস্ত্র কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন। তিনি এই দাবিকে তাদের সংগঠনের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি ষড়যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করেন।
অংগ্য মারমা টাইমসের কাছে দাবি করেন, ইউপিডিএফ একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংগঠন। তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীদের অধিকার আদায়ের জন্য রাজনৈতিক সংগ্রাম করছেন। তিনি আরও বলেন, তাদের অবস্থান হলো একমাত্র অর্থপূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমেই পার্বত্য চট্টগ্রামের এই অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব। কোনো ধরনের সন্ত্রাসী বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে এই যুক্তি দেখিয়ে আসছে, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি পাহাড়িদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
অবশ্য নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ইউপিডিএফের এই বক্তব্যকে খণ্ডন করেছেন। বেশ কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তার দাবি, এ অঞ্চলে সাম্প্রতিক নিরাপত্তা অভিযানগুলোতে গ্রেপ্তার হওয়াদের একটি বড় অংশ ইউপিডিএফের সঙ্গে জড়িত।
কর্মকর্তারা আরও অভিযোগ করেন, অভিযানের সময় উদ্ধার হওয়া বেশ কিছু অস্ত্র বিদেশি, যার বেশিরভাগই একটি প্রতিবেশী দেশে তৈরি। তবে কর্তৃপক্ষ গ্রেপ্তার বা অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য এখনো প্রকাশ করেনি।
স্থানীয় বাসিন্দা এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নেতারা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান—এই তিন পার্বত্য জেলায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেন। এ অঞ্চল সম্পর্কে অবগত বেশ কয়েকটি সূত্র জানায়, ইউপিডিএফ ঐতিহ্যগতভাবেই খাগড়াছড়ির দুর্গম এলাকাগুলোতে শক্তিশালী অবস্থান বজায় রেখেছে। সম্প্রতি তারা আরও নতুন নতুন গ্রামে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেছে। বান্দরবানের কিছু অংশেও তাদের তৎপরতা বেড়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, রাঙ্গামাটি এখনো পিসিজেএসএসের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে রয়ে গেছে। এই প্রভাবশালী আঞ্চলিক সংগঠনটির নেতৃত্বে রয়েছেন প্রবীণ নেতা জ্যোতিরিদ্র বোধিপ্রিয় লারমা, যিনি সন্তু লারমা নামে ব্যাপকভাবে পরিচিত।
বিশ্লেষক এবং স্থানীয়রা বলছেন, ১৯৯৭ সালের শান্তি চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ায় পাহাড়ি সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ তাদের রাজনৈতিক মনোভাব তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
স্থানীয় বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি টাইমসের কাছে উল্লেখ করেন, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে পাহাড়ি জেলাগুলোর কিছু অংশে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ঘটনার পর এই অসন্তোষ আরও তীব্র হয়েছে।
এসব সূত্রের মতে, ইউপিডিএফ এই অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের সমর্থক গোষ্ঠী বাড়ানোর চেষ্টা করছে। কেউ কেউ এমনও অভিযোগ করেন, পিসিজেএসএসের তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা শীর্ষ নেতাদের অনুমতি ছাড়াই নির্দিষ্ট কিছু স্থানীয় ইস্যুতে ইউপিডিএফ সদস্যদের সঙ্গে সহযোগিতা করছেন।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের (বিআইপিএফ) সাধারণ সম্পাদক ইন্তুমনী তালুকদার টাইমসকে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার বহু মানুষ শান্তি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নকে একটি প্রধান দাবি হিসেবে দেখেন। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বাসিন্দাদের মধ্যে একটি নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে যে দীর্ঘদিনের অধিকার সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর সমাধান হবে। এই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে তা জনগণের অসন্তোষ বাড়িয়ে দিতে পারে। এটি এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে যা এ অঞ্চলে অশান্তি সৃষ্টি করতে চাওয়া গোষ্ঠীগুলো নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ এই অঞ্চলের রাজনৈতিক আলোচনায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। স্থানীয় নেতাদের যুক্তি, শান্তি চুক্তির সঙ্গে সংগতি রেখে এই মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে পাহাড়িদের কোনো প্রতিনিধি থাকা উচিত।
দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের পর এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তরিত হয়। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ে রয়ে গেছেন প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিন, যিনি পাহাড়ের কোনো ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী সদস্য নন। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কিছু মানুষ মনে করেন, মন্ত্রণালয়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নেতৃত্বের এই অনুপস্থিতি অসন্তোষ বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের মনে এই ধারণার জন্ম দিচ্ছে যে, শান্তি চুক্তির মূল নীতিগুলোকে উপেক্ষা করা হচ্ছে।
পিসিজেএসএসের একজন শীর্ষ নেতা টাইমসের কাছে দাবি করেন, ইউপিডিএফ এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে রাঙ্গামাটিতে পিসিজেএসএসের তৃণমূল কর্মীদের নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করছে।
ইউপিডিএফ এবং পিসিজেএসএসের মধ্যকার এই দ্বন্দ্বের শিকড় প্রায় তিন দশক পুরোনো।
একসময় পিসিজেএসএসের নেতৃত্বের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন প্রসিত খীসা ও রবি শংকর চাকমা। ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সরকার ও পিসিজেএসএসের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পর সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন সংগঠনটি অস্ত্র সমর্পণ করে মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ করে।
অন্যদিকে, প্রসিত খীসার নেতৃত্বে চুক্তির বিরোধী একটি পক্ষ দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে ইউপিডিএফ গঠন করে। তাদের যুক্তি ছিল, এই চুক্তি অঞ্চলের পাহাড়িদের জন্য অর্থপূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
স্থানীয় বেশ কয়েকটি সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আর্থিক ও সাংগঠনিক সমস্যার কারণে ইউপিডিএফের কার্যক্রম অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছিল। তবে তারা মনে করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যে রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে, তা সংগঠনটিকে আবারও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) তামিম আহমেদ চৌধুরী টাইমসকে বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং সরকার পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বেসামরিক জনগণের আড়ালে থেকে সাধারণ মানুষকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে। এটি নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। কারণ, যেকোনো অভিযানের সময় বেসামরিক নাগরিকদের ক্ষতি এড়ানোর পাশাপাশি নিরাপত্তা হুমকিও মোকাবিলা করতে হয়।
এই বিশেষজ্ঞের মতে, পার্বত্য অঞ্চলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো নিরপরাধ মানুষের ক্ষতি না করে শত্রুতামূলক উপাদানগুলোকে চিহ্নিত করা। কারণ, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কোনো প্রথাগত যুদ্ধক্ষেত্রে কাজ করে না এবং তাদের কোনো নির্দিষ্ট পোশাক, স্থায়ী অবস্থান বা দৃশ্যমান পার্থক্য থাকে না।
টাইমসের কাছে তিনি বলেন, এই পরিস্থিতির জন্য একটি সামগ্রিক অথচ সাহসী পদক্ষেপের প্রয়োজন। অবশ্যই রাষ্ট্র এবং এ অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের অধিকার—উভয়ই রক্ষা করে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যেকোনো নিরাপত্তা পদক্ষেপকে সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের এই সংকটের প্রকৃতি কেবল নিরাপত্তা বাহিনীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চলবে না। এর জন্য রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, উন্নয়নমূলক উদ্যোগ এবং পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধির পদক্ষেপেরও প্রয়োজন রয়েছে।
উৎসঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম ফেসবুক পোস্ট ও টাইমস অফ বাংলাদেশ ( ২২ জুন ২০২৬)
