কথায় আছে রাজায় রাজায় যুদ্ধে উলুখাগড়ারা মারা যায়। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে জাপান আমাদের দ্বার প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছেনি। বোমায় জর্জরিত করেনি। তারপরও যুদ্ধের রসদ জোগাতে বাংলায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। লক্ষ লক্ষ লোক অনাহারে মৃত্যু বরণ করে।
মধ্য প্রাচ্যে যুদ্ধ হচ্ছে হাজার মাইল দূরে। আমরা বোমার শব্দ শুনছি না! বোমায় মরছি না। তাই বলে আমরা যুদ্ধের উওাপ থেকে মুক্ত নই। পেট্রোল পাম্পের দীর্ঘ লাইনের আড়ালে আরো ভয়াবহ সংকট অপেক্ষা করছে। তা হলো খাদ্য নিরাপত্তা, রেমিট্যান্স প্রবাহে ধস। ডিজেল না থাকলে সেচ হবে না। খাদ্য উৎপাদন কমে যাবে। রেমিট্যান্স না আসলে রিজার্ভ শূন্যে নেমে আসবে। প্রবাসীরা কেমন আছে? আমরা কি ভাবছি।
আজ সকালে আমার অগ্রজ একজন মেসেজ পাঠিয়েছেন, তিনি ওভার নাইট নিঃস্ব হয়ে গেছেন। তিনি এগারো বছর ধরে সারজায় আছেন। তার পেট্রোকেমিক্যালের ব্যবসা। তার সব টাকা আটকে গেছে। এখানের বড় বড় লগ্নিকারীরা চলে গেছে, যাচ্ছে। তার অবস্থা নদীর পাড়ে ভাঙ্গনের শিকার সেই বড় কৃষকের মত রাতারাতি তার ১০০ বিঘা জমি নদীর জলে। সকালে তিনি কর্পদক শূন্য!
সুপার রীচ বনেদী লগ্নি কারক হাজার হাজার লোক, কোম্পানি ব্যবসা বন্ধ করে প্রান হাতে নিয়ে উচ্চ মূল্যে বিমান টিকেট কেটে দুবাই ছাড়ছে। চোখ ধাঁধানো চাকচিক্য ও বিলাসবহুল অট্টালিকা, সুপারমল এখন খা খা করছে। আরবদের ঐশ্বর্য ও অহমিকার প্রতীক পৃথিবীর সুউচ্চ হোটেল ” দূর্জ খলিফা”- এখানে রুম পেতে সপ্তাহ খানেক অপেক্ষা করতে হতো, যার অকুপেন্সী ৯০% শতাংশ, সেখানে আপনি এখন সহজেই প্রচুর ডিসকাউন্টে রুম পেয়ে যাবেন।
বিশ্ববিখ্যাত সব ব্রান্ডের দোকানে এখন আর কোন ক্রেতার সমাহার নেই। দুবাই বিমানবন্দর যা কিনা যুদ্ধের আগে পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যস্ততম বিমানবন্দর ছিলো তা আজ নিরব। দুবাইয়ে র রাস্তায় দামী সব ব্রান্ডের গাড়ি পড়ে আছে, ধুলার স্তরে ঢেকে আছে তার আভিজাত্য। লগ্নি কারীরা চলে যাচ্ছেন সাইপ্রাস সিঙ্গাপুর বা লন্ডনে।
কিন্তু বাংলাদেশ সহ গরীব দেশের শ্রম বেচা মানুষের হয়েছে দূর্দশা। মালিকরা নেই, পাওনা টাকা পাচ্ছে না। দেশে আসার মত অর্থ তাদের নেই। উচ্চ মূল্যে বিমান টিকেট কাটার সামর্থ্য নেই। আমার সুহৃদ অগ্রজের রাত কাটে বোমায় প্রকম্পিত দালানে। এখানে ইসরায়েলের মত বোম্ব শেল্টার নেই। দুবাই শেখ রা কোন দিন দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি গাজার ফিলিস্তিনদের মত তাদেরও বোমারু বিমানের ড্রোনের শব্দে বিনিদ্র রাত পার করতে হবে। আরব আমিরাত সহ এসব দেশের সুপার রীচ রা নগদ অর্থ আর স্বর্ন নিয়ে সটকে পড়েছে। বাংলাদেশের মত গরীব মিসকিন রা অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে সময় পার করছে।
গাল্ফ আরব দেশগুলো কি আবার আগের মত ফিরে আসবে? কি হবে এখানের শ্রম বেচা মানুষের? তারা কি দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হবে? দেড় কোটি প্রবাসীর যদি বানের পানির মত দেশে ফিরতে হয় তবে আমাদের আর্থিক সামাজিক ক্ষেএে কি কেয়ামত নেমে আসবে তা কি আমরা ভাবছি। এলএনজি না হলে কলকারখানা গার্মেন্টস কিভাবে চলবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি না থাকলে আজ শহরের হাইরাইজ ভবনের লিফ্ট গুলো নিশ্চল হয়ে যাবে। ভাবুন কি হবে যদি ডিজেলের অভাবে ট্রাক চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, শস্য ক্ষেত গুলোর সবুজ ধানগাছ গুলো পানির অভাবে হলুদ হয়ে যায়!
বাস্তবিক অর্থেই যুদ্ধ ক্ষেএ থেকে হাজার মাইল দূরে থেকেও যুদ্ধের ক্লাস্টার বোমার ন্যায় অর্থনীতির প্রতিঘাতে আমরা ১৮ কোটি মানুষ কিভাবে বেঁচে থাকবো। দুর্ভিক্ষ অনাহারে মৃত্যুর এক অশনিসংকেত আমাদের ললাটের লিখন কিনা আর কিছুদিনের মধ্যে আমরা টের পাবো। জাতি হিসেবে আমরা কি প্রস্তুতি নিচ্ছি? আমরা পড়ে আছি “সংবিধান সংবিধান” খেলা নিয়ে। কোন নেতা তার কন্যা সহ মুভি দেখছেন তার তর্জমা চলছে।
ভাতের থালে যখন টান পড়বে লক্ষ লক্ষ বেকার যখন রাস্তায় নামবে তখন পালানোর হরমুজ প্রণালী আর খুঁজে পাবেন না। আসুন যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মত আসন্ন অর্থনৈতিক সামাজিক দূর্যোগের মোকাবিলা করার জন্য জাতীয় ঐক্য ও প্রস্তুতি গ্রহন করি।
