চাঁদাবাজি আধিপত্যের রক্তক্ষয়ী লড়াই

উপজাতি সন্ত্রাসীদের কাছে জিম্মি বাঙালিরা

fec-image

পার্বত্য অঞ্চলে চাঁদাবাজি ও আধিপত্যের রক্তক্ষয়ী লড়াই চলছেই। আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আধিপত্যের লড়াই এবং চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিনিয়তই ঘটছে খুনোখুনি। শান্তির পাহাড়কে অশান্ত করে তুলছে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা। আতঙ্ক আর অপরাধের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করছে দেশের পর্যটনের অপার সম্ভাবনার পার্বত্য অঞ্চলকে। উপজাতি পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে সেখানকার নিরীহ বাঙালিরা। প্রতিবাদ বা মুখ খুললেই হত্যা বা নির্যাতন করা হচ্ছে।

সাধারণ পাহাড়ি বাঙালিরা বলছেন পাহাড়ে শান্তি-শৃঙ্খলা স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার পার্বত্য শান্তি চুক্তির আওতায় উপজাতীদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দিলেও ‘বাঁকা পথেই’ রয়ে গেছে পার্বত্যের আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলো। বরং চাঁদাবাজি, জমি দখল ও আধিপত্যসহ নিরীহ পাহাড়ি বাঙালিদের ওপর অত্যাচার নির্যাতনের মাত্রা সীমা ছাড়িয়েছে। এমনকি গত ৭ নভেম্বর পার্বত্য অঞ্চলে ‘অনুদান’ (চাঁদা) আদায়ে শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। যে সংগঠনের প্রধান সন্তু লারমা

সরেজমিনে গত রোববার থেকে বুধবার পর্যন্ত পার্বত্য অঞ্চল ঘুরে ও বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। জেএসএসের ওই চাঁদা আদায় সংক্রান্ত চিঠি গণমাধ্যমের কাছে সংরক্ষিত আছে। স্থানীয় পাহাড়ি বাসিন্দা ও গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যমতে পার্বত্য জেলাগুলোয় চাঁদাবাজির তালিকায় শীর্ষে আছে পার্বত্য অঞ্চলের আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-প্রসীত), ইউপিডিএফ (ডেমোক্রেটিক), জেএসএস (মূল/সন্তু লারমা) এবং জেএসএস সংস্কার।

সূত্রগুলো বলছে, পার্বত্য অঞ্চলে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে। যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে চাঁদাবাজি হচ্ছে খাগড়াছড়িতে। এই বিপুল অঙ্কের চাঁদাবাজির কর্তৃত্ব ও ভাগাভাগি নিয়ে প্রতিনিয়তই চলছে উপজাতীয় আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনের সন্ত্রাসীদের মধ্যে আধিপত্যের লড়াই। এই লড়াইয়ের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে প্রায়ই ঘটছে খুনোখুনির ঘটনাও। ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় দেড় বছরেই পার্বত্য আঞ্চলিক এসব সংগঠনের সন্ত্রাসীদের হাতে চাঁদাবাজি ও আধিপত্যের লড়াইয়ে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৭২ জন।

বান্দরবন পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ক্য শৈ হ্লা বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়িত হলেও পার্বত্য অঞ্চলের সশস্ত্র সংগঠনগুলো এখনও অস্ত্র জমা দেয়নি। এসব অস্ত্র ব্যবহার করে তারা চাঁদাবাজি ও আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ করছে। যেটা শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে বা প্রতিষ্ঠায় বড় বাধা। অস্ত্রের রাজনীতি ও চাঁদাবাজি যেকোনোভাবেই হোক বন্ধ করতে হবে।

ভুক্তভোগী কয়েকজন জানিয়েছেন, ইউপিডিএফ বা জেএসএসের সন্ত্রাসীরা চাঁদাবাজির এই টাকাকে ‘ট্যাক্স’ হিসেবে গণ্য করে থাকে। পার্বত্য অঞ্চল কেবল তাদেরই ভূখণ্ড বলে তারা মনে করে। ফলে এখানে বাঙালি বা অন্য যারাই বসবাস বা ব্যবসা করুক তাদের চাঁদা দিতেই হবে। পাহাড়ের উপজাতি সন্ত্রাসীরা সব জায়গায় চাঁদাবাজি করে। যেকোনো আর্থিক বিনিময়ে ভাগ বসায় ওরা। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের আয়করও দিতে হয় না। অথচ একজন পাহাড়ি বাঙালির ১০০ টাকার উৎপাদিত পণ্য বাজারে বিক্রি করলে ২০ টাকা দিতে হবে সন্ত্রাসীদের। বাঁশ ব্যবসা, কাঠ ব্যবসা ও উন্নয়নমূলক কাজ সব ক্ষেত্রে চলছে সন্ত্রাসীদের এই চাঁদাবাজি।

গত ৭ নভেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) তথ্য ও প্রচার সম্পাদক মঙ্গল কুমার চাকমা স্বাক্ষরিত সংগঠনের প্যাডে দেওয়া এক চিঠিতে বলা হয়েছে ‘আগামী ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তি চুক্তির ২২ বছরপূর্তি উপলক্ষে প্রতি বছরের মতো এবারও দিবসটিকে সামনে রেখে জেএসএসের পক্ষ থেকে নানা আয়োজন করা হয়েছে। এ জন্য আমাদের প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। তাই সব চিফ কলেক্টরকে জানাচ্ছি, আপনার নিজ নিজ এলাকার সব জনসাধারণ, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান, পরিবহন মালিক সমিতি, হোটেল-মোটেল মালিক, পর্যটকসহ সর্বস্তরের মানুষদের কাছ থেকে অনুদান সংগ্রহ করে পার্বত্য শান্তি চুক্তির অনুষ্ঠান পালনে সহায়তা করুন। কেউ অনুদান প্রদানে অস্বীকৃতি বা অসম্মতি জানালে প্রয়োজন অনুযায়ী শক্তি প্রদান করতে নির্দেশ দেওয়া হলো।’

সরেজমিনে পার্বত্য অঞ্চলে বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে পার্বত্য জেলাগুলোয় এভাবে চাঁদাবাজি যেন প্রতিষ্ঠিত স্বাভাবিক নিয়ম। পাহাড়ে বসবাসকারী সব নাগরিক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, কাঠুরে (মাঝি), পরিবহন, দোকানপাট, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানসহ প্রায় প্রতিটি খাতে পার্বত্য অঞ্চলের কয়েকটি আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনের সন্ত্রাসীরা চাঁদাবাজির মহোৎসব চালাচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ের চূড়ায় ছোট্ট খুপড়ি ঘর কিংবা একটু ভালো মানের বাড়ি, সে যেমনই হোক সেখানে বাঙালিরা বসবাস করতে গেলে চাঁদা দিতে হয় উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠনের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের। চাঁদা না দিলে বাঙালিদের ওপর হত্যা, হামলা-নির্যাতন ও অপহরণের ঘটনা ঘটছে। তবে উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন মূলত পাহাড়ের সাধারণ নিরীহ বাঙালি ও ব্যবসায়ীরাই বেশি।

সরেজমিনে বান্দরবানের রুমা, নাইক্ষংছড়ি, থানচি, রাজস্থলী, খাগড়াছড়ির গুইমারা, সিন্দুকছড়ি, মাটিরাঙ্গা, রামগড়, লক্ষ্মীছড়ি, মানিকছড়িসহ পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে স্থানীয় লোকজন ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে চাঁদাবাজি ও আধিপত্য সংক্রান্ত ভয়ঙ্কর এসব তথ্য জানা যায়। তবে বিভিন্ন সময়ে বরাবরই আঞ্চলিক এসব সংগঠনের নেতারা চাঁদা আদায়ের কথা অস্বীকার করে আসছে। এ বিষয়ে অভিযোগ উঠলে একপক্ষ অন্যপক্ষকে দোষারোপ করে সহজেই দায় এড়িয়ে নিচ্ছে।

পাহাড়ে এমন দুর্গম এলাকাতেও নিজের ভূমিতে ছোট্ট খুপড়ি ঘর কিংবা একটু ভালো মানের বাড়ি করে বাঙালিরা বসবাস করতে গেলে ১ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয় উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠনের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের। পাহাড়ের বাঁশ ও কাঠের গাড়ি প্রতি ছয় মাসের জন্য দিতে হয় ২৫-৩০ হাজার টাকা চাঁদা। এ ছাড়া ক্রেতা ও বিক্রেতার কাছ থেকেও একই বিষয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করা হয়। পাহাড়ের দুর্গম সড়কে চলাচলকারী চাঁন্দের গাড়ির জন্য ছয় মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। আর চা বাগান হলে তো কথা নেই, এর জন্য চাঁদা বছরে এক থেকে দেড় কোটি টাকা। এ ছাড়া এলাকাভিত্তিক অটোরিকশা মালিক সমিতির কাছ থেকে বার্ষিক ১ থেকে ২ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। চাঁদা আদায়ের পর এক ধরনের রশিদ বা চলাচলে অনুমতির কাগজ দেওয়া হয়।

বান্দরবান জেলা আওয়ামী লীগের সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী মো. মুজিবুর রহমান বলেন, সব খাতেই এখানে চাঁদা দিতে হয়। চাঁদাবাজিই পার্বত্য আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনের প্রধান কাজ। এই চাঁদাবাজির জন্যই তারা বিভিন্ন এলাকা ভাগ করে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে থাকে। আবার আধিপত্য নিয়ে ভয়ঙ্কর সংঘর্ষও ঘটছে। মূলত পাহাড় থেকে সেনাবাহিনীর অনেক ক্যাম্প প্রত্যাহারের কারণে এসব এলাকায় পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের অপতৎপরতা অনেক বেড়েছে।

বান্দরবান জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জাকির হোসেন মজুমদার বলেন, পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর আধিপত্যের নেপথ্যে চাঁদাবাজি অন্যতম। এটা তাদের আয়ের প্রধান উৎস। চাঁদাবাজি টিকিয়ে রাখতেই তারা পার্বত্য অঞ্চলকে বা বান্দরবানকে উত্তপ্ত করার চেষ্টা করছে। পুলিশসহ নিরাপত্তা বাহিনী এ ব্যাপারে সজাগ রয়েছে। এ ব্যাপারে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে রাঙ্গামাটি জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) আলমগীর কবির বলেন, চাঁদাবাজির শিকার ভুক্তভোগীরা জীবনের ভয়ে অনেক সময় মুখ খুলতে চান না। তারপরও পুলিশ যেকোনোভাবে অভিযোগ পেলেই অভিযান চালায়। এসব ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নেই।

পার্বত্য অঞ্চলে কর্মরত মাঠ পর্যায়ের একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের মধ্যে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে সবচেয়ে বেশি উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজি, আধিপত্যের সংঘাত ও পাহাড়ি ভূমি দখলের অপতৎপরতা সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া বান্দরবানে শহর এলাকাগুলোর বাইরে রুমা, থানচি ও রাজস্থলীসহ আরও বেশকিছু এলাকায় পাহাড়ি সংগঠনের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা তৎপর রয়েছে।

সূত্র: সময়ের আলো

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: পার্বত্য অঞ্চল, রক্তক্ষয়ী লড়াই
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eleven − 9 =

আরও পড়ুন