বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়া কোন সাধারণ খবর নয়। ইতিহাসে ইতোপূর্বে আর একবার বাংলাদেশ এই পদে নির্বাচিত হতে পেরেছিল। সে বিচারে এটি বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় সাফল্য। একজন বাংলাদেশী হিসেবে এ নিয়ে আমার গর্বিত হওয়া উচিত। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমি সেটি হতে পারছি না। কারণ এই পদে যিনি নির্বাচিত হয়েছেন তার কারণেই আমার এই অস্বস্তির কারণ।
খলিলুর রহমান যিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রোগার রহমান নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি ইউনুস সরকারের ক্যাবিনেটে ফেরার আগে বাংলাদেশী নাগরিক ছিলেন কিনা তা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে পানি ঘোলা হয়েছে। যদিও তিনি এর জবাব দিয়েছেন, কিন্তু মানুষের মন থেকে এই সন্দেহ মিলে যায়নি। তিনি যে দলীয় সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, সেই দল একসময় তার পদত্যাগ দাবি করেছিল জোরালোভাবে। এরপর রহস্যজনকভাবে পাশার দান উল্টে যায়। তিনি আবার লন্ডনে আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে রিসিভ করলেন ড. ইউনুসের সাথে বৈঠকে।
কার পাশা যে কার টেবিলে গেল বুঝলাম না, ইউনুস সরকারে একের পর এক প্রমোশন ঘটতে থাকল তার। রোহিঙ্গা বিষয়ক দায়িত্বের পাশাপাশি ইউনুস কারো সাথে আলোচনা ছাড়াই তাকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ঘোষণা করলেন। অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই পদে নিযুক্তির আগে প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট কারো সাথে আলোচনার প্রয়োজন বোধ করেননি ইউনুস। এরকম একজন দীর্ঘদিন প্রবাসে বসবাসকারী ব্যক্তি যার মাল্টিন্যাশনাল ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড রয়েছে তাকে এই পদে বসানোয় বাংলাদেশের নিরাপত্তা সেক্টরে যথেষ্ট অস্বস্তি ছিল।
তিনি প্রথম দায়িত্বে ছিলেন রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই ভ্যালু অ্যাডভাইজার। এই দায়িত্বে তিনি কেবল পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন তা নয়, বরং মানবিক করিডর প্রদানের নামে এমন এক প্রকল্প আমদানি করেছিলেন যাতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়েছিল। তার এই প্রজেক্ট সেনাবাহিনী এবং দেশপ্রেমিক বাংলাদেশীদের প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়ে। এমনকি বিএনপি সরাসরি এই প্রজেক্টের বিরোধিতা করে। ফলে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি স্বরূপ তার এই প্রজেক্ট আপাতত বাদ দিতে বাধ্য হয় ইউনুস সরকার। রোহিঙ্গা বিষয়ে তিনি কয়েকটা হাই ভ্যালু মিটিং করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেননি। বরং এই সময়ে আরো ২ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
ইউনুস সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা নামক দায়িত্বে থাকলেও তিনি ডি ফ্যাক্টো উপপ্রধান উপদেষ্টার মতো দায়িত্ব পালন করতে শুরু করেন। তার তৎপরতার কারণে ডিফেন্স এডভাইজার পদে সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত তিন তারকা জেনারেল থাকলেও তিনি কর্নার্ড হয়ে পড়েন। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা উজিরে খামোখায় পরিণত হয়। বাণিজ্য, রাজনীতি- সর্বত্র তার হস্তক্ষেপ শেষ কথায় পরিণত হয়। তাকে ক্ষমতায় নিরঙ্কুশ করার জন্য একটি কুচক্রী মহল পেছন থেকে মদদ দিয়েছে সব সময়। তার নিরঙ্কুশ ক্ষমতার জন্য যিনিই চ্যালেঞ্জ হয়েছেন তাদেরকে নানাভাবে ট্যাগ লাগিয়ে বিতর্কিত করেছে এই কুচক্রীমহল। এই মহলের যিনি স্পোকসম্যান তিনি দাবি করতেন খলিলুর রহমান নাকি তার চয়েস এবং তার পক্ষে সব সময় নানা ন্যারেটিভ তৈরি করেছেন। তার জন্য চ্যালেঞ্জ হয় এমন প্রত্যেককে সরাসরি আক্রমণ করে একের পর এক ভিডিও তৈরি করতেন। এভাবেই পররাষ্ট্র সচিব জসিম উদ্দিন সাহেবকে বিতর্কিত করে দায়িত্ব ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ সাহেবকে জনগণের সামনে ভিলেন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর সবই করা হয়েছে খলিল সাহেবের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিশ্চিত করার জন্য।
এভাবেই খলিল সাহেবের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করে এই মহলটি তাকে দিয়ে ক্ষমতা ছাড়ার তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি দেশ বেচার চুক্তি করে ফেলে। এবং এ নিয়ে তারা নীরব থাকে। ইউনুস- খলিল গং মানবিক করিডরের নামে ডিপ স্টেটের পারপাস সার্ভ করতে ব্যর্থ হলেও নির্বাচনের তিনদিন পূর্বে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তির নামে এর চেয়েও ভয়ংকর রাষ্ট্রবিরোধী একটি চুক্তি সম্পাদন করে ফেলে। সম্প্রতি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ সাহেব সরাসরি বলেছেন, এই চুক্তির ব্যাপারে উপদেষ্টা হিসেবে তিনি বা তার মন্ত্রণালয় কিছুই জানতো না। খলিল সাহেব, বাণিজ্য উপদেষ্টা এবং ড. ইউনুস মিলে এই চুক্তি করে দেশকে আমেরিকার কাছে জিম্মি করে ফেলেছেন। এর সাথে কেবল ইন্দিরা-মুজিব গোলামী চুক্তির তুলনা করা চলে। আর জানা মতে, এর চেয়ে খারাপ চুক্তি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটাই আছে তা হল, মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসী সরকার কর্তৃক ভারতের সাথে কৃত সাত দফা গোলামী চুক্তি। খলিলের এই বাণিজ্য চুক্তির কিছু ধারার সাথে উক্ত সাত দফা চুক্তির বেশ মিল রয়েছে।
যদিও তিনি বলেছেন, এই চুক্তি করার পূর্বে তৎকালীন বিএনপি ও জামাতের সাথে আলোচনা করেছিলেন। কিন্তু এই বয়ানের মধ্য দিয়ে তিনি দেশবাসীর সাথে একটি ধোঁকাবাজি করছেন নিজের অপকর্মকে জাস্টিফাই করার জন্য। প্রথমত, এই চুক্তি করার জন্য এমন একটি সময়কে বেছে নেওয়া হয়েছে যখন নির্বাচন একেবারে মুখোমুখি এবং একটি গোষ্ঠী নানাভাবে চেষ্টা করছে নির্বাচনকে বানচাল করার জন্য। সেই মুহূর্তে বিএনপির মত রাজনৈতিক দল যারা নির্বাচনের জন্য মরিয়া হয়েছিলেন তাদের পক্ষে নির্বাচন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে এমন কোন বিষয়ে নারাজি দেয়া সম্ভব ছিল না। দ্বিতীয়ত, বাণিজ্য চুক্তির ব্যাপারে বিএনপি ও জামায়াতের সাথে আলোচনা করা বা সম্মতি নেয়া হলেও চুক্তির বিতর্কিত ধারাগুলোর ব্যাপারে তাদেরকে জ্ঞাত করা হয়েছিল কিনা সে ব্যাপারে কিন্তু তিনি সম্পূর্ণ চেপে গিয়েছেন।
অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি করা কোন খারাপ কিছু নয়। যেকোনো সরকার এটা করতে চাইবে। কিন্তু কোন কোন শর্তে আপনি করছেন সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। সেই সকল শর্তে দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব জলাঞ্জলি দেয়া হয়েছে, নাকি সুরক্ষা দেয়া হয়েছে- সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চুক্তি নিয়ে কোন প্রশ্ন করছি না। প্রশ্ন তুলছি, চুক্তির যে সমস্ত শর্তগুলোতে দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব জলাঞ্জলি দিয়ে এসেছেন তা নিয়ে। প্রশ্ন করছি যে, সেই সকল শর্তগুলো নিয়ে যাতে তিনি ও বশির সাহেব দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জিম্মি করে ফেলেছেন। ন্যূনতম দেশপ্রেম থাকলে কোন মানুষ একটি দেশ স্বাধীন দেশকে এভাবে আরেকটি দেশের কাছে জিম্মি করতে পারে না। কিন্তু ইউনুস, খলিল, বশির গাদ্দার গং সেই কাজটি করেছেন। এই গাদ্দার গং বাংলাদেশকে এমন একটি চুক্তির জালে আবদ্ধ করে ফেলেছেন যা বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা, চরিত্র ও ভূমিকা পালনে প্রচন্ড প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছে। এবং এই জাল ছিঁড়ে বের হল বাংলাদেশের জন্য বর্তমান বাস্তবতায় অত্যন্ত কঠিন।
এই রাষ্ট্র বিরোধী কর্মকাণ্ডের কারণে ডক্টর ইউনুস, ডক্টর খলিল, আজিজের বশির সাহেব স্থায়ীভাবে আমার দৃষ্টিতে গাদ্দার হিসেবে বিবেচিত হবেন এবং এদের পেছনে যারা মদদ যুগিয়েছেন, রহমান গং তাদেরকেও আমি একইভাবে বিবেচনা করি এবং চিরকাল করব।
ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, Once a bitraiyer always bitraiyer. গাদ্দার চিরকাল গাদ্দার ই থাকে। কাজেই এরকম একজন গাদ্দার কোথায় কি হলো তাতে আমার খুশি হওয়ার কোন কারণ থাকতে পারে না। বরং আমি আতঙ্কিত এই পদ ব্যবহার করে সে পুনরায় কোন গাদ্দারি করে বসে কিনা। তাই সরকারের কাছে অনুরোধ থাকবে, দীর্ঘমেয়াদী ছুটি নয়, খলিল সাহেবকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অপসারণ করে একজন দেশপ্রেমিক ব্যক্তিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হোক।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, গবেষক ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির বিশ্লেষক
