তুরস্কের ইস্তাম্বুলে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে চলমান মামলায় আর্থিক সহায়তা এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক তহবিল বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন।
তুরস্কে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা বা ওআইসি’র পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে ‘রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন’ শীর্ষক সেশনে উপস্থিত বিশ্বের ৪৩টি মুসলিম দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সামনে বক্তব্য দেন তিনি। ২২ জুন রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, অপর্যাপ্ত তহবিলের কারণে কক্সবাজার ও ভাসানচরে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা ব্যাহত হচ্ছে। জাতিসংঘ ২০২৪ সালের জন্য যে তহবিল চেয়েছিল, তার মাত্র ৬৮ শতাংশ গত বছর পাওয়া গেছে। চলতি বছরের ৩ জুন থেকে তহবিল সংকটের কারণে ইউনিসেফ তার শিক্ষাকার্যক্রম বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) খাদ্য রেশন কমিয়ে দিয়েছে এবং সেপ্টেম্বরের মধ্যে আরও সংকোচন ঘটতে পারে।
বাংলাদেশ এই পরিস্থিতিতে ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, যেন তারা মানবিক সহায়তা ও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত বা আইসিজের আইনি লড়াইয়ে আর্থিক অবদান বাড়ায়। সভায় উপস্থিত থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন রোহিঙ্গা ইস্যুকে সামনে রেখে যে বক্তব্য রাখেন তা বিভিন্ন কারণেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত মুসলিম সংখ্যালঘুদের মধ্যে একটি- রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানো উম্মাহর জন্য এক ঐতিহাসিক ও নৈতিক দায়িত্ব। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা নিয়ে ওআইসি রেজ্যুলেশন গ্রহণ করায় তিনি সংস্থাটিকে ধন্যবাদ জানান।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির পর থেকে বাংলাদেশ ১৩ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে ব্যতিক্রমধর্মী মানবিক দায়িত্ব পালন করে আসছে। রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যাকে জাতিসঙ্ঘ ‘পাঠ্যপুস্তকের জন্য জাতিগত নিধনের উদাহরণ’ বলে অভিহিত করেছে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, রাখাইনে সংঘাত আরো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে এবং এখন আরাকান আর্মি পুরো অঞ্চলসহ বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করছে। নতুন করে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।
তিনি সতর্ক করেন, বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাচ্ছে।
উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সঙ্কটে নিজেদের ওপর যে দায়িত্ব ছিল, সম্ভবত তার চেয়েও বেশি কিছু করেছে। এখন আমরা ওআইসি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দিকে তাকিয়ে আছি, তাদের নৈতিক ও আইনগত দায়িত্ব পালনের প্রত্যাশায়। আমাদের আবেদন কেবল দান-সহায়তার জন্য নয়, বরং ন্যায়বিচার, সংহতি ও যৌথ দায়বদ্ধতার জন্য।
উল্লেখ্য, ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা বা সংক্ষেপে ওআইসি একটি আন্তর্জাতিক ইসলামি সংস্থা। ১৯৬৯ সালে গঠিত সংস্থাটিতে ৫৭টি দেশ প্রতিনিধিত্ব করছে যার মধ্যে ৪৯টি মুসলমান প্রধান দেশ। সংস্থাটির মতে তারা ‘মুসলিম বিশ্বের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর’ হিসেবে এবং ‘আন্তর্জাতিক শান্তি ও সম্প্রীতি প্রচারের চেতনা নিয়ে মুসলিম বিশ্বের স্বার্থ ধারণ ও সুরক্ষায়’ কাজ করে আসছে। ওআইসির ইস্তাম্বুল সম্মেলনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক তহবিল বৃদ্ধির আহ্বানে ইসলামী দেশসমূহ আশানুরূপ সাড়া দেবে এমনটাই আশা করছে বাংলাদেশ।
