ওসি প্রদীপের সাজানো ৬টি মামলায় সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফার জামিন

fec-image

মেজর (অব.) সিনহার হত্যা মামলার আসামি ও বরখাস্তকৃত টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপের ‘সাজানো মামলায় জামিন পেয়েছেন সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তাফা খান।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১১ টায় কক্সবাজার জেলা যুগ্ম দায়রা জজ ১ম আদালত নির্যাতিত ফরিদুল মোস্তফাকে জামিন প্রদান করেন।

এতে করে ১১ মাস কারাভোগ করে ফরিদুল মোস্তফার কারামুক্ত হতে আর বাধা থাকলনা।

ইতোমধ্যে ৫টি মামলা থেকে সে জামিন লাভ করে। আজ চাঁদাবাজির শেষ মামলায়ও জামিন লাভ করে সে। ফলে বৃহস্পতিবার সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা বিকালেই জেল থেকে মুক্তি পাচ্ছেন বলে তার আইনজীবীরা জানিয়েছেন ।

আদালত সূত্র জানায়, ‘ টাকা না দিলে ক্রসফায়ার দেন টেকনাফের ওসি’ সংবাদ প্রকাশ করায় গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে ওসি প্রদীপের নিজস্ব বাহিনী দিয়ে ঢাকা পল্লবী ভাড়া বাসা থেকে ধরে এনে সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তাফা খানের উপর চালানো হয় লোমহর্ষক নির্যাতন ও নিপীড়ন।

অবৈধ অস্ত্র, ইয়াবা, বিদেশী মদসহ ৬টি সাজানো মামলা দিয়ে প্রেরণ করা হয় জেলে।

এই দিকে সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফার উপর যে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল সেই কথা নিজেই স্বীকার করেছেন বরখাস্তকৃত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ।

সম্প্রতি টেকনাফের আরেক সাংবাদকর্মী রহমত উল্লাহর সঙ্গে ওসি প্রদীপের একটি কথোপকতনের অডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে।

সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা নিযুক্ত প্রধান আইনজীবী আবদুল মান্নান জানান, ৬ জুলাই ২০১৯ সালে বহিস্কৃত ওসি প্রদীপের নির্দেশে টেকনাফের হ্নীলার দরগাপাড়ার মৃত তাজর মল্লুককে বাদী করে টেকনাফ থানায় জিআর ৫৭৭/১৯ চাঁদাবাজির মামলাটি দায়ের করেন।

আসামি পক্ষে মামলার জামিন শুনানী করেন এড .মো. আব্দুল মান্নান, এড.আবুল কালাম ছিদ্দিকী, এড. রেজাউল করিম রেজা ও এড.সাইফুদ্দিন খালেদ প্রমূখ।

এর আগে গত বুধবার সকাল সোয়া ১২টায় কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল ফৌজদারী মিস মামলার মূলে জি/আর ১০২৫/২০১৯,ও জি/আর ১০২৬/২০১৯, পুলিশের সাজানো মামলায় ফরিদুল মোস্তফাকে জামিন প্রদান করেন । এর আগে গত ১ মার্চ ২০২০ ইংরেজিতে একই আদালত জি/আর মামলায় জামিন প্রদান করেন।

তিনি আরো জানান, টেকনাফ থানার বরখাস্তকৃত ওসি প্রদীপের দালাল মৌলভী মুফিজ ইকবাল ও জহিরের চাঁদাবাজি ‘গায়েবি মামলা’ অভিযোগে টেকনাফ থানা মামলা নং-১১৫/২০১৯, কক্সবাজার জেলা ও দায়রাজজ মোহাম্মদ ইসমাইল আদালত ১৩ আগস্ট জামিন প্রদান করেন।

এছাড়া টেকনাফ থানা মামলা নং-৪২/২০১৯, জি/আর ৭৭৮/২০১৯ টেকনাফের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তামান্না ফারাহার আদালত জামিন প্রদান করেন। এ নিয়ে ফরিদুল মোস্তফার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত ৬টি মামলায় জামিন পেলো।

সিনিয়র আইনজীবী আবদুল মান্নান আরো বলেন, সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা টেকনাফ ও কক্সবাজারের মাদক ইয়াবা কারবারীদের নিয়ে পুলিশের সম্পৃক্ততা নিয়ে সিরিজ সংবাদ প্রকাশ করেন।

এর জের ধরে ফরিদুল মোস্তফাকে নিধন মিশনে নামেন ওসি প্রদীপ দাশ। ফরিদ মোস্তফাকে যেখানে পাবে সেখানেই ক্রসফায়ারের ঘোষণা দেয়া হয়। তাই প্রাণের ভয়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমান কিন্তু শেষ রক্ষা হলোনা ফরিদুল মোস্তফার।

গত বছর ২১ সেপ্টেম্বর মোবাইল ট্টাকিং করে রাজধানীর মিরপুর পল্লবী এলাকার ভাড়া বাসা থেকে আটক করে টেকনাফে নিয়ে যায়। সেখানে ওসি প্রদীপেের হেফাজতে তিনদিন আটকে রেখে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করা হয়।

পানির বদলে প্রসাব আর না খাইয়ে চোখে মরিচের গুড়া দিয়ে বেয়োনেট দিয়ে খুচিয়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় রক্তাক্ত করা হয়েছিল। হাত পায়ের নখ প্লাস দিয়ে টেনে উঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। চোখ দুটো প্রায় অন্ধ করে সাজানা মামলা অবৈধ অস্ত্র, ইয়াবা, বিদেশী মদ উদ্ধার দেখিয়ে ৩টি মামলা এবং ওসি প্রদীপের দালাল মৌলভী মুফিজ ইকবাল, জহির আহমদ, আবুল কালামকে বাদি সাজিয়ে আরো ৩টি চাঁদাবাজিসহ ৬টি সাজানো মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

ফরিদের স্ত্রী হাসিনা আক্তার জানিয়েছেন, গত বছর ২৬ জুন ওসি প্রদীপে বিরুদ্ধে রিপোর্ট প্রকাশ করায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন মোস্তফার ওপর।

ওসি প্রদীপের ভয়ে কক্সবাজার সমিতি পাড়ার বাড়ি বিক্রি করে আমরা ঢাকায় মিরপুরে চলে যায়। কিছুদিন পর ঢাকা থেকে তুলে নিয়ে আসে টেকনাফ থানায়।

ওসি প্রদীপ নিজেই আমার স্বামী ফরিদুল মোস্তফাকে লোমহর্ষক নিপীড়ন করে চোখে ও পায়খানার রাস্তায় মরিচের গুড়ো দেন ।

প্লাস দিয়ে আঙ্গুলের নখগুলো তুলে নিয়েছেন। হাতের প্রতিটি আঙুল গুড়িয়ে দিয়েছে। সে যখন একটু পানি খেতে চাইছিল-তখন তাকে পেশাব ও টয়লেটের নোংরা পানি দিয়েছে খাওয়ার জন্য। ওসি প্রদীপ ফরিদুল মোস্তফাকে উলঙ্গ করে ভিডিও করেছিলেন। এমনকি পতিতা ডেকে এনে তার সঙ্গে ছবি তুলে ভাইরাল করার হুমকি দিয়েছে।

ফরিদের বোন ফাতেমা জানান, আমার ভাই গ্রেফতারের পরদিন রাতে ওসি প্রদীপ এসে বাড়ির ভেতর মদের বোতল, ইয়াব ও অস্ত্র রাখে। বেরিয়ে গিয়ে আবার মানুষকে জিজ্ঞাস করে ফরিদুল মোস্তফার বাড়ি কোনটা? আবার এসে বাড়ির গেটগুলো ভেঙ্গে ফেলে।

ঘরে ঢুকেই লাঠি দিয়ে আমাদেরকে মারতে থাকে। তখন মদ ও অস্ত্র উদ্ধারের নাটক করে আশেপাশের লোকজনকে সাক্ষী বানায়। ওই সময় প্রীদপ আমাদের বলতে থাকে-আমাকে চিন? আমি টেকনাফে-মহেশখালীতে মানুষকে ক্রসফায়ার দিয়েছি।

এ দিকে সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফার উপর যে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল সেই কথা নিজেই স্বীকার করেছেন বরখাস্তকৃত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ।

সম্প্রতি টেকনাফের আরেক সংবাদকর্মী রহমত উল্লাহর সঙ্গে ওসি প্রদীপের একটি কথোপকথনের অডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। ওই অডিওতে শুনা যাচ্ছে ফরিদুল মোস্তফার উপর চালানো নির্যাতনের উদাহরণ দিয়ে তিনি সাংবাদিক রহমত উল্লাহকে হুমকি দিচ্ছেন।

ওসি প্রদীপ সাংবাদিক রহমত উল্লাহকে বলছেন, আমার বিরুদ্ধে উল্টাপাল্টা লিখলে খবর আছে। এক পা আমার বাম পায়ের নিচে রেখে আরেক পা টেনে ছিড়ে ফেলমু। আমি জেল-ফাঁস কিছু মানি না। দেখেন না, ফরিদুল মোস্তফারে কি করেছি? উল্টোপাল্টা করলে ধরে এনে রান ফাইড়া ফেলবো।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: টেকনাফ, সাংবাদিক, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

8 + fourteen =

আরও পড়ুন