কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের নাজুক অবস্থা

fec-image

অতিরিক্ত যান চলাচল, দীর্ঘদিন যাবৎ সংস্কারের অভাবের কারণে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের নাজুক অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। সড়ক জুড়ে খানা-খন্দক ও গর্তে ভরে গেছে। এতে দুর পাল্লার যাত্রী, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা পড়ুয়া ছেলে/মেয়েরা সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সড়কে চলাচল করতে গিয়ে সাধারণ যাত্রীরা প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে আহত ও নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। শনিবার উখিয়ার বিভিন্ন স্থান ঘুরে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

সরেজমিন উখিয়ার পালংখালী, থাইংখালী, বালুখালী, কুতুপালং, উখিয়া সদর, কোটবাজার, মরিচ্যা বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, উখিয়ার মরিচ্যা লাল ব্রিজ থেকে পালংখালী সীমান্ত ব্রিজ পর্যন্ত দীর্ঘ ৪৫ কিলোমিটার সড়কে বড় বড় পাঁচ শতাধিক খানাখন্দ ও ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। খানাখন্দ অতিক্রম করে মালবাহী ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাস চলছে ঝুঁকি নিয়ে। সড়কের এসব খানা-খন্দক সৃষ্টি হওয়ায় যান চলাচল ও পথচারীরা ব্যাপক দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে।

বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মালবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও এনজিওদের মাত্রাতিরিক্ত যানবাহন চলাচলের কারণে কক্সবাজার টেকনাফ সড়কের এই করুন অবস্থা বলে মনে করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তবে এসব দেখার বা বলার কেউ না থাকায় সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ বাড়ছে।

ট্রাফিক পুলিশ সুত্রে জানা গেছে, রোহিঙ্গা আসার কারণে এ সড়কে যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে গেছে। বর্তমানে সড়কে ছোট–বড় ১০ হাজার যানবাহন চলছে। কিন্তু সড়কের উন্নয়নকাজের ধীরগতিতে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। তাদের পক্ষ থেকে দিনরাত দায়িত্ব পালন করে সড়কে যানজট মুক্ত রাখার চেষ্টা করছেন বলে তারা জানান। যদিওবা অতিরিক্ত যানবাহনের কারণে যানজট সৃষ্টি হয়ে থাকে।

সুত্রে আরো জানা যায়, রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মরত আছেন ২ হাজার বিদেশিসহ অন্তত ১১ হাজার চাকরিজীবী। তাঁদের আনা–নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার হচ্ছে ২ হাজারের বেশি প্রাইভেট কার। রোহিঙ্গা শিবিরে দৈনিক গড়ে ৪ শতাধিক ট্রাকে মালামাল পরিবহন হচ্ছে। এ ছাড়া টেকনাফ সীমান্ত বাণিজ্যে আমদানি-রপ্তানির ট্রাক, পর্যটকদের গাড়ি, যাত্রীবাহী বাস চলাচল করছে আরও এক হাজারের বেশি। ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, অটোরিকশা, জিপ, মাইক্রোবাস ও ট্রাক চলে আরও ৭ হাজার। ফলে সড়কটিতে যানবাহনের চাপ বেড়েছে অতিথের চেয়ে অনেক গুণ।

জানা গেছে, কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের ৭৯ কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিয়ে কক্সবাজার পৌঁছাতে সময় লাগত এক ঘণ্টা। বর্তমানে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কে এই দূরত্ব অতিক্রম করতে সময় লাগে প্রায় চার ঘণ্টা। সড়কজুড়ে শত শত খানাখন্দের কারণে তৈরি হচ্ছে তীব্র যানজট। যার ফলে অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব ধরনের সরকারি-বেরসকারি দপ্তরে কর্মরত চাকরিজীবিরা সঠিক সময়ে কর্মস্থলে পৌছনে না পেরে নানান সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এছাড়াও স্কুল,কলেজ,মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্র/ছাত্রীরা যথাসময়ে প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারছেনা বলে অভিযোগ উঠেছে।

কক্সবাজার চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের পেশকার আমির হোসেন অভিযোগ করে জানান, ২ বছর পূর্বে আমি প্রতিনিয়ত উখিয়া থেকে এসে কক্সবাজার অফিস করতাম। কিন্তু এখন আর পারছিনা, কারণ আগে যেখানে উখিয়া থেকে কক্সবাজার পৌঁছুতে ৪৫ মিনিট সময় লাগত, সেখানে এখন দুই থেকে আড়াই ঘন্টা সময় লাগে, এরপরও কর্মস্থলে পৌছাতে মুসকিল হয়ে দাঁড়ায়।

উখিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ছাত্র মোঃ শহিদুল ইসলাম অভিযোগ করে জানান, তার বাড়ী মরিচ্যা পাতাবাড়ী এলাকায়। তাকে মরিচ্যা হয়ে ঘুরে উখিয়া কলেজে আসতে হয়। আগে সেখানে ৩০মিনিট সময়ের প্রয়োজন ছিল। সেখানে বর্তমানে ২ ঘন্টার বেশি সময় অতিবাহিত হয়। এ ধরনের অভিযোগ অহরহ পথচারীদের।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নিকারুজ্জামান চৌধুরী জানান, কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কটি সংস্কারের জন্য সরকার ইতিমধ্যে কাজ আরম্ভ করেছে। সড়কটি সংস্কার কাজ হয়ে গেলে আর কোন যানজট বা ঝুঁকি থাকবেনা। এরপরও সড়কে বর্তমানে যে সমস্ত সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে এতে তিনি যানবাহন চলাচলে সতর্কতা অবলম্বের পরামর্শ দেন।

সড়ক নির্মাণে ধীরগতি:

কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক সংস্কারে ধীরগতির কারণে যানজটে নাকাল হতে হচ্ছে জেলার সাধারণ যাত্রীদের। সড়কের ৫০ কিলোমিটার অংশের সংস্কারকাজ শুরু হলেও গত ৮ মাসে কাজ এগিয়েছে মাত্র ৩০ শতাংশ। সড়ক ও জনপদ বিভাগের (সওজ) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সম্প্রতি টানা বৃষ্টির কারণে সড়কের ওপরে আগে থেকে থাকা বিটুমিনের আস্তরণ তোলা সম্ভব হয়নি। এ কারণে সড়কের মূল কার্পেটিংয়ের কাজও শুরু করা যায়নি। এখন পুরোদমে কাজ চলছে।

কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের তিনটি পৃথক প্রকল্পের আওতায় ৭৯ কিলোমিটার সড়কের সংস্কার ও উন্নয়নকাজে ৪৫৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)। সড়ক বিভাগের সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এই কাজের তত্ত্বাবধান করছে। গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে দুটি প্রকল্পের অধীনে ৫০ কিলোমিটারের সংস্কারকাজ শুরু হয়। ৮ মাসের কাজে অগ্রগতি হয়েছে ৩০ শতাংশ।

এর কারণ জানতে চাইলে সওজ কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা সম্প্রতি এক গণমাধ্যমকে জানান, সড়কের দুই পাশে নালা খনন, বৈদ্যুতিক খুঁটি, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, ভূগর্ভস্থ টিঅ্যান্ডটি ও ইন্টারনেট ব্রডব্যান্ড লাইন অপসারণ ও মাটি ভরাটের কাজ শেষ হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারী বর্ষণে সড়কের উন্নয়নকাজ ব্যাহত হয়েছে। বৃষ্টির কারণে সড়কের ওপরে ‘কালো চামড়া’ অর্থাৎ বিটুমিন তুলে ফেলা সম্ভব হয়নি। বিটুমিন তুলে ফেলার পরই সেখানে পাঁচ ইঞ্চি পুরু কার্পেটিং হবে। আগামী ২০২০ সালের জুনের মধ্যে অবশিষ্ট ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করা হয়ে যাবে।

সওজ কার্যালয়ের তথ্য থেকে জানা গেছে, প্রথম প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজারের লিংক রোড থেকে উখিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশন পর্যন্ত ২৫ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে তিন ফুট করে সম্প্রসারণ করে সড়কটি ২৪ ফুট প্রস্থে উন্নীত করা হচ্ছে। এ প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ১২২ কোটি টাকা । একইভাবে দ্বিতীয় প্রকল্পে উখিয়া ফায়ার সার্ভিস থেকে টেকনাফের উনচিপ্রাং পর্যন্ত ২৫ কিলোমিটারে সড়ক উন্নয়নে ব্যয় হচ্ছে ১৫৪ কোটি টাকা।

২০২০ সালের জুনের মধ্যে এই ৫০ কিলোমিটারের কাজ শেষ হলে তৃতীয় প্রকল্পে অবশিষ্ট ১৮২ কোটি টাকায় টেকনাফ পর্যন্ত আরও ৩০ কিলোমিটার সড়কের উন্নয়নকাজ শুরু হবে।

স্থানীয় এলাকাবাসির অভিযোগ, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পর সরকারের নির্দেশে তারা মানবিক বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে তাদের বাপ-দাদার দিনের দখলীয় জমিতে। এরপর রোহিঙ্গাদের সেবার নামে দেশি-বিদেশী ২শতাধিক এনজিও সংস্থা এবং আর্ন্তজাতিক সংস্থা কাজ করলেও স্থানীয়দের উন্নয়নে উল্লেখ্যযোগ্য কাজ করতে কেউ এগিয়ে আসেনি।

২ বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যে পরিমাণ উন্নয়ন হয়েছে তার ১% উন্নয়ন উখিয়া-টেকনাফ হয়েছে কিনা সন্দেহ তাদের। এমনকি রোহিঙ্গাদের সেবায় নিয়োজিত আইএনজিও, এনজিও, ইউএন সংস্থা আসা-যাওয়া করতে গিয়ে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি। যানজট থেকে মুক্তি পেতে দ্রুত সড়ক উন্নয়নে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন এসব স্থানীয়রা।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: এনজিও, রোহিঙ্গা, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × 5 =

আরও পড়ুন