কক্সবাজার সদর থানায় দালালদের অত্যাচারে অতিষ্ট আইনি সহযোগিতা নিতে আসা লোকজন

 

কক্সবাজার প্রতিনিধি:

কক্সবাজার সদর থানার সোর্স নাম ধারী দালালদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে উঠেছে আইনি সহায়তা নিতে আসা লোকজন। তারা পুলিশের সাথে বিভিন্ন অভিযানে যাওয়াসহ নানা কাজে লিপ্ত থাকায় সাধারণ লোকজন তাদেরকে পুলিশের লোক মনে করে। আর এটিকেই দালালেরা পুঁজি হিসেবে কাজে লাগায়। এসব দালারের হাপ-ভাবে তা প্রকাশ পায়।

কেউ সদর থানায় আইনি সহায়তার জন্য আসলে দালারেরা চেষ্টা করে তাদের ফাঁদে ফেলতে। তারা অভিযোগ লিখা থেকে শুরু করে মামলা করিয়ে দেওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব নেয়। আর দাবি করে মোঠা অংকের টাকা। যা থানাকে দিতে হবে বলে জানায়। এছাড়া আটক কাউকে ছাড়াতে আসলেও তারা ছাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে বলে লোকজনের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়। অনেক সময় তারা করেও দেখাচ্ছে। এমনটাই অভিযোগ ভোক্তভূগীদের।

এসব দালালের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায়না। কারণ তারা যখন চায় তখন পুলিশ উপস্থিত করতে পারে। যাকে ইচ্ছা তাকে আটক করে দেখাতে পারে। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তারা নানাভাবে লোকজনকে হয়রানি করে টাকা হাতাচ্ছে। এমনও অভিযোগ রয়েছে তারা সাধারণ লোকজনকে ইয়াবা ব্যবসায়ী বলে হয়রানি করছে টাকার জন্য। এছাড়া পুলিশকে ভুল বুঝিয়ে নিরপরাধ লোকজনকে আটক করাচ্ছে। পরে তারাই ছাড়িয়ে নেওয়ার বানিজ্যে’র চেষ্টা করে। এ বিষয়টিকে পুলিশের অবহেলা হিসেবে দেখছে সচেতন মহল।এসব দালালেরা অল্প দিনেই ভাল টাকার মালিক হয়ে উঠে। অপরাধীরাও পুলিশের সোর্স নামধারী এসব দালালদের ভাল রাখতে টাকা দেয়।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, লালদিঘীর আশ-পাশ এবং হোটেল-মোটেল জোনের যেসব হোটেলে পতিতাবৃত্তিসহ নানা অপকর্মে চলে ওসব থেকে চাঁদা উঠায় এসব দালালেরা। এছাড়া তারা বড় বড় সন্ত্রাসীদের কাছ থেকেও টাকা নেয় পুলিশ আসার খবর দেওয়া আশ্বাসে। এতে করে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হচ্ছে বলেও জানান, সচেতন মহল। এসব কাজ করেন কক্সবাজার সদর থানায় আবসার, জাহাঙ্গীর, সোহাগ, হারুনসহ আরো বেশ কয়েকজন দালাল।

বেশিরভাগ লোকজনই আবসার দালাল নামে জানেন। তাকে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিও ভয় পায়। সে কাকে কখন কিভাবে ফাঁসিয়ে দিচ্ছে তার কোন পাত্তা নেই। যদিও সে কিছুদিন আগে অপরাধের দায়ে জেল হাজতে ছিল। জেল থেকে বের হওয়ার পর থেকে আবার পুরোদমে শুরু করেছে থানার দালালী। সে শুধু থানার দালাল নয়। সে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয়ও দেয়। যদিও সে আদৌ পত্রিকা’ই পড়তে জানেনা। সাংবাদিক পরিচয়কে বাস্তব দেখাতে বোগলের নিচে সবসময় পত্রিকা রাখে। তার অত্যাচারে অতিষ্ট আইনের সহযোগিতা নিতে আসা লোকজন।

আরেক প্রভাবশালী দালালের নাম জাহাঙ্গীর। সে পুলিশের বেশিরভাগ অভিযানের সাথে থাকে। ভোক্তভূগীদের অভিযোগ, সে বিভিন্ন লোকজনকে ইয়াবা আছে বলে হয়রানি করে। আর টাকা পয়সা হাতিয়ে নেয়। গত ঈদের ৩ দিন আগে রাতে ফিরোজা শপিং কমপ্লেক্সেএর সম্মুখে এক নারীকে ইয়াবা আছে বলে আটকায়। আর হুমকি দেয়ে দুই’মিনিটের মধ্যে ওই জায়গায় পুলিশ আনছে। পরে স্থানীয় লোকজনের চাপে সে সরে পড়ে। এ জাহাঙ্গীর’ই বিভিন্ন হোটেলে গিয়ে চাঁদা তুলে আনে। আর পুলিশের নাম ভাঙ্গিয়ে সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে।

দালাল সোহাগ। কিছু দিন আগেও সে বিমান বন্দর সড়কের মুখে সৈকত বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় তালা-চাবি ঠিক করার সরঞ্জাম নিয়ে বসত। কোথা থেকে ডাক আসলে ওখানে গিয়ে কাজ করত। এর মধ্যে সে কানাইয়া বাজার এলাকা থেকে এক গৃহবধুকে নিয়ে পালিয়ে যায়। আর ওইটি ছিল তার ৩ নম্বর বিয়ে। এছাড়া সে ইয়াবা সেবন ও ব্যবসা করত। পরে পুলিশ তাকে আটক করে। কিছুদিন পরে দেখা যায়, সে থানার দালালির কাজ শুরু করেছে। সেই এখন ইয়াবা ব্যবসায়ীদের ধরিয়ে দেওয়ার নামে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। কারণ তার সাথেই রয়েছে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা বিশাল সিন্ডিকেটের পরিচয়। এছাড়া পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়ানো লোকজনের কাছ থেকেও টাকা নিচ্ছে। নয়ত ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে।

আরেক দালারের নাম হারুন। তার বাড়ি শহরের মোহাজের পাড়ায়। সে ছিল মূলত শিবির ক্যাডার। পরে কিছুদিন পৌরসভার টমটম থেকে টাকা উঠাত।  এরই মধ্যে সে মাদক সেবন ও ব্যবসা শুরু করে। শুরু করে চাঁদাবাজি। বিভিন্ন দোকানে দোকানে গিয়ে চাঁদা দাবি করে। সে কখনও নিজেকে সাংবাদিক আবার কখনও পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয় দেয়। এরই মধ্যে এক অপকর্মের দায়ে তাকে কক্সবাজার সদর থানায় আনা হয়। সেই থেকে পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ শুরু করে। তাকে নিয়ে পুলিশ বেশ কয়েকবার অভিযানও চালায়। হারুন এখন পর্যটকদের হয়রানি করে নিজের পুলিশের লোক দাবি করে। গত ৪ মাস আগে কুমিল্লার এক যুবকের মোটরসাইকেল নিয়ে কেটে পড়ে নিজেকে ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তা বলে। হারুন সবসময় পরিপাটি পোশাক পরে নিজেকে কখনও সাংবাদিক আবার কখনও পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয় দেয়।

এ ব্যাপারে এডভোকেট সোলতান আহম্মদ জানান, যে ব্যক্তিকে অপরাধের দায়ে থানায় আনা হয় সে কিভাবে পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করে।  সোর্স পুলিশের প্রয়োজন হতে পারে। তবে তার অত্যাচারে আইনের আশ্রয় নিতে আসা লোকজন হয়রানি হবে এইটা কোনভাবে মেনে নেওয়া যায়না। এছাড়া দালালেরা যে এত অপকর্ম করছে নিশ্চয় তার পিছনে ইন্ধন রয়েছে। তাই কক্সবাজার সদর থানার ওসি’কে বিষয়টি ভালভাবে তদারকি করতে হবে। নয়ত দালালদের হাতে জিম্মী হয়ে আরো অত্যাচারের স্বীকার হবে লোকজন।

এ ব্যাপারে কক্সবাজার সদর থানার ওসি রঞ্জিত কুমার বড়ুয়া জানান, নতুন দায়িত্ব নেওয়াতে সোর্সদের বিষয়ে তিনি অবগত নন। তবে আবচারকে মোটামোটি চিনেন। কেউ এখনও এসব সোর্স বা দালালদের বিরুদ্ধে কোন ধরনের অভিযোগ দেয়নি। যদি দেয় তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fifteen − nine =

আরও পড়ুন