parbattanews

কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের জয়, দীর্ঘ ব্যর্থতার প্রতিশোধের আশঙ্কা

ভারতের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। পশ্চিমের কেরালায় কংগ্রেসের হাতে ধরাশায়ী হয়েছে বিজেপি। পুদুচেরির ফলাফল রাজনীতিতে তেমন প্রভাব ফেলতে না পারলেও দক্ষিণের তামিলনাড়ুতে বিধানসভায় কোমর সোজা করতে পারেনি বিজেপি। সেখানে সিনেমার নায়ক বিজয় থালাপতির নতুন দল তামিলাগা ভেটরি কাজাগাম-টিভিকের উত্থান ঘটেছে।

বিজেপি বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম অভাবনীয় ফলাফল করেছে। বলা হয় সীমান্তঘেঁষা আসামে আগেই হিন্দুত্ববাদী বিজেপির উত্থান ঘটলেও এবারের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসকে পরাজিত করে বিজেপির বিজয়ের মাধ্যমে হিন্দুত্ববাদের উত্থান ঘটেছে। দক্ষিণ-পশ্চিমের রাজ্যগুলোর ব্যর্থতার প্রতিশোধ আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের সরকার গঠনের মাধ্যমে নেবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। খবর ইনকিলাবের

আসামে এবং পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির যারা আগামীতে মুখ্যমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন তারা কট্টর হিন্দুত্ববাদী এবং মুসলিমবিদ্বেষী। ভারতের নির্যাতিত মুসলমান ও অন্য ধর্মের মানুষ এমনকি রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারী এবং আসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্বশর্মা কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে খুশি করতে নিজ নিজ রাজ্যকে সংখ্যালঘু নাগরিকদের জন্য নরকে পরিণত করবেন।

হিন্দুত্ববাদী রাজ্যের উত্থান দেখিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে শত্রু শত্রু খেলবেন। আর নরেন্দ্র মোদিও দক্ষিণে এবং পশ্চিমের রাজ্যের পরাজয়ের প্রতিশোধ আসাম-পশ্চিমবঙ্গের মাধ্যমে নেবেন। দিল্লির অনুগত এবং আওয়ামী লীগের অলিগার্ক হিসেবে পরিচিত বিবিসির এক সময়ের সাংবাদিক নবনিতা রায় চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি নরেন্দ্র মোদির অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় বিএনপি সরকারের চীনের দিকে ঝুঁকে পড়া ছাড়া উপায় নেই। আন্তর্জাতিক রাজনীতির খোঁজখবর রাখেন দেশের এমন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠন করলে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আরো খারাপ হবে। আরএসএস পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু মুসলমানদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করবে এবং বাংলাদেশকে শত্রুরাষ্ট্র পর্যায়ে নিয়ে যাবে। কারণ শুভেন্দু অধিকারী ও হেমন্ত বিশ্বশর্মা আগে থেকেই ঢাকার সঙ্গে দিল্লির সুসম্পর্কে বিরুদ্ধে। এ অবস্থায় আঞ্চলিক রাজনীতির কারণে বাংলাদেশের উচিত চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে আরো উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া। ভারতে চাপে রাখতে চীনের অর্থায়নে তিস্তা মহাপ্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করা। তিস্তায় চীনের উপস্থিতি থাকলে শিলিগুড়ির ‘চিকেন নেকের’ কারণে দিল্লি মুসলমান এবং বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন কিছু করার সাহস দেখাবে না।

মমতা ব্যানার্জি ২০১১ সালে তিস্তা চুক্তির বিরোধিতা করলেও পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু মুসলমানদের সহাবস্থান সমর্থন করতেন। আসাম যখন জাতীয় নাকরিকত্ব সনদের (এনআরসি) নামে আসামে বসবাসরত বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানদের বাংলাদেশে পাঠানোর হুঙ্কার দিতেন এবং আসামের মুসলমানদের উপর জুলুম-নির্যাতন করতেন; তখন পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জি তীব্র প্রতিবাদ করেন। তিনি সংখ্যালঘু মুলমানদের পাশে দাঁড়ান এবং মুসলমানদের কেন্দ্রীয় সরকার এনআরসির নামে বিতাড়িত করার চেষ্টা করলে তা প্রতিহতের ঘোষণা দেন। কিন্তু হিন্দুত্ববাদী বিজেপি নেতারা সব সময় মুসলমানদের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের মিশন সক্রিয় রাখেন।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠন করলে কী ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হবেÑ তা শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যে পরিষ্কার। কয়েক মাস আগে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী ভারতবর্ষকে হিন্দুরাষ্ট্র ঘোষণার দাবি জানিয়ে বলেছেন, ‘ইসরাইল যেমন শিক্ষা দিয়েছে গাজাকে; ভারতের উচিত সেভাবে বাংলাদেশকে সবক দেয়া।’ শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, ‘বাংলাদেশ যুদ্ধ লাগাতে চাইছে। বিএসএফ অত্যন্ত ধৈর্য ও সংযমের পরিচয় দিচ্ছে। দিল্লি বাংলাদেশ দখল করতে চাইলে ভারতের কয়েক দিন তো দূরের কথা, কয়েক মিনিটও লাগবে না। বাংলাদেশ দখল করে নিতে পারে দিল্লি।’ শুভেন্দু অধিকারীর চেয়ে হিন্দুত্ববাদ কায়েমে এককাঠি সরেস আসামের হেমন্ত বিশ্বশর্মা। সম্প্রতি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের এই মুখ্যমন্ত্রী বিবিসির সঙ্গে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলছেন, তিনি সবসময়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন যাতে ভারত আর বাংলাদেশের সম্পর্কের উন্নতি না হয়। তিনি বলেন, ‘আমি তো সকালে সবসময়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের যে পরিস্থিতি ইউনূসের সময়ে ছিল, সেটিই যেন তারেক রহমানের সময় থাকে, সম্পর্কের উন্নতি যেন না হয়।’ তিনি আরো বলেছেন, আসাম থেকে বাংলাভাষী মুসলমানদের রাতের অন্ধকারে বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হবে।’

অপ্রিয় হলেও সত্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ইচ্ছায় শেখ হাসিনা পালিয়ে দিল্লি পৌঁছাতে সক্ষম হন। বিজেপি সরকার তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দলটির শত শত সাবেক মন্ত্রী-এমপি এবং কেন্দ্র থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতারা ভারতে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে গিয়ে নিরাপদে বসবাস করার সুযোগ পেয়েছেন, সেখানে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি ক্ষমতায় থাকার জন্য। মমতা ব্যানার্জি হিন্দু ভোটের জন্য মুখে যাই বলুক তিনি মুসলমানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন। অন্য রাজ্যে যখন গরুর গোশত খাওয়ার অপরাধে মুসলমানদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়, মুসলমানদের বাড়িঘরে আগুন দেয়া হয়; তখন মমতা ব্যানার্জির কঠোর হুমকিতে পশ্চিমবঙ্গে সেটি সম্ভব হয়নি। কার্যত মমতা ব্যানার্জি ক্ষমতায় থাকায় পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু মুসলমান, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধসহ সব ধর্মের মানুষ নিরাপত্তা পেয়েছিলেন। দিল্লির লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের এমপিরা মুলমানদের পক্ষে কঠোর অবস্থান নিয়ে হিন্দুত্ববাদী বিজেপিকে ধরাশায়ী করেন। তবে মুসলমানদের অধিকার আদায়ের মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত ভারতে এআইএমআইএমের নেতা তামিলনাড়–র আসাদউদ্দিন ওআইসি লোকসভায় এবং বিভিন্নভাবে বিজেপির হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে এবং মুসলমানদের অধিকার আদায়ের কথা বলে বাহবা নেন। ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট দলের পশ্চিমবঙ্গের নেতা নওশাদ সিদ্দিকীও মুসলমানদের পক্ষের কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত। তারা প্রকাশ্যে হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে এবং সংখ্যালঘু মুসলমানদের পক্ষে বক্তব্য দিয়ে বাহবা নেন কিন্তু এসব লোকদেখানো। প্রকাশ্যে হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে বলে মুসলমানদের পক্ষে নেতা হিসেবে নিজেদের জাহির করলেও পর্দার আড়ালে তারা লোকসভা ও বিধানসভায় নিজেদের আসনের নিশ্চয়তার বিনিময়ে ভেতরে ভেতরে বিজেপির পক্ষেই কাজ করেন। মুসলমান এই দুই নেতার চরিত্র অনেকটা বাংলাদেশের জামায়াতের মতোই। জামায়াত যেমন ইসলামের নামে রাজনীতি করলেও ভোটের জন্য পূজা ম-পে ছুটে যায়, পূজা ম-পে গিতা পাঠ করে এবং রোজা আর পূজা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ ফতোয়া দেয়; তেমনি আসাদ উদ্দিন ওআইসি ও নওশাদ সিদ্দিকীরা মুসলমানদের অধিকার আদায়ের স্লোগান নিয়ে রাজনীতি করলেও পর্দার আড়ালে বিজেপির অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করে। এবারের নির্বাচনেও ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের নেতা নওশাদ সিদ্দিকী দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড় বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছেন।

বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা আসাম রাজ্যে অনেক আগেই হিন্দুত্ববাদের উত্থান ঘটেছে। সেখানে বিজেপির সরকার সংখ্যালঘু মুসলমান নাগরিকদের জন্য ওই রাজ্যকে দোজখখানা বানিয়েছে। এখন পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদের বিজয় সে রাজ্যের সংখ্যালঘু মুসলমান এবং প্রতিবেশী বাংলাদেশের জন্য মহাবিপদ ডেকে আনতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী যখন পশ্চিমবঙ্গে মানুষের কাছে ঘৃণিত এবং পরিত্যাক্ত নেতা হিসেবে চিহ্নিত ছিল তখন মুসলমান এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানান ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে বিতর্কিত হয়েছেন। এখন তার নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন হলে তিনি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারেন। আসামের বিশ্বশর্মা ও পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দুরা আরএসএস ও নরেন্দ্র মোদিকে খুশি করতে নিজ নিজ রাজ্যকে হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন। এ ধরনের চেষ্টা বাংলাদেশের জন্য কাম্য নয়। ফলে স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে নিজেদের বন্ধু বেছে নিতে হবে। এতদিন চীন বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। এখন চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক আরো জোরদার করতে হবে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আমন্ত্রণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান আজ চীন সফরে যাচ্ছেন। তিনি ৫ থেকে ৭ মে চীনে সরকারি সফর করবেন। বর্তমান চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং এই সফর নিয়ে প্রত্যাশা প্রসঙ্গে মুখপাত্র বলেন, চীন ও বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী এবং একটি সমন্বিত কৌশলগত সহযোগী অংশীদার। মুখপাত্র আরো বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে চীন অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় এবং এই সফরকে একটি সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে একযোগে রাজনৈতিক পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি, বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিময় ও সহযোগিতা গভীরতর করা, উচ্চমানের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ এগিয়ে নেয়া এবং চীন-বাংলাদেশ সমন্বিত কৌশলগত সহযোগী অংশীদারিত্বকে আরো জোরদার করতে চায়।

আওয়ামী লীগের অলিগার্ক হিসেবে পরিচিত সাংবাদিক নবনিতা রায় চৌধুরী নিজের ইউটিউব চ্যানেলে বলেছেন, ‘তারেক রহমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সহায়তায় লন্ডন থেকে দেশে ফিরেছেন। কিন্তু নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হওয়ায় নরেন্দ্র মোদি অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং চিঠি লিখে তারেক রহমানও তার স্ত্রী-কন্যাদের দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কিন্তু সংসদে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধের আইন কার্যকর করায় দিল্লি তাকে বিশ্বাস করছে না। এখন তার চীনের দিকে ঝুঁকে পড়া ছাড়া গতন্তর নেই।’ নবনিতা চৌধুরী যথার্থই বলেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আসামের পর পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদের উত্থানের পর বাংলাদেশের উচিত চীনের সাথে সম্পর্ক আরো গভীর করা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান চীনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর নিশ্চিত করতে হবে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরো গভীরের পাশাপাশি তিস্তা মহাপ্রকল্প বাস্তবায়নই হবে হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ।

Exit mobile version