কতিপয় পার্বত্য সন্ত্রাসীদের অনৈতিক দাবীর কাছে বাংলাদেশের জনগণ নতি স্বীকার করতে পারে না

fec-image

প্রথমেই আমি শুরু করতে চাই একটি প্রশ্ন দিয়ে। আচ্ছা! স্বাধীনতা মানে কি? দেশের সবটুকু অংশে সমান অধিকার নাকি কিছু বিশেষ অংশের বিশেষ জনগণকে বিশেষ অধিকার প্রদানের মাধ্যমে অন্যদেরকে বঞ্চিত করা? আপনাদের মনে হতে পারে যে আমি এমন একটা নির্বোধের মত প্রশ্ন করলাম কেন? প্রশ্নটা করার কারণটাও আমার কাছে আছে। সম্প্রতি আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে অনেক ঘটনা ঘটছে যা আমাদের সাধারণ জনগনের কাছে অজানা রয়েছে। যারা বিষয়গুলো জানেন না প্রশ্নটা তাদের কাছে অহেতুক মনে হতে পারে, কিন্তু যারা পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে ওয়াকিবহাল তাদের কাছে প্রশ্নটি এতটা অপ্রাসঙ্গিক মনে হবে না।

১৯৭১ সালে অনেক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা অর্জন করেছি আমাদের মহান স্বাধীনতা। যেখানে ৩০ লক্ষ প্রাণ হারিয়েছি আমরা। এত কষ্টে অর্জিত স্বাধীনতাকে আমরা কিছু সন্ত্রাসীর হাতে ছেড়ে দিতে পারি না। পার্বত্য চট্টগ্রামে রয়েছে কতিপয় উপজাতি সন্ত্রাসীদল। যাদের দাবী হচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত করা।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তির উদ্দেশ্যে ২রা ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত হয় ‘শান্তিচুক্তি’। যেখানে উপজাতি নেতা সন্তু লারমার পিসিজেএসএস কৌশলী পদক্ষেপে শান্তির আওতায় আসতে চেয়েছে। ঠিক তখন থেকেই প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে আরেকটি উপজাতি সন্ত্রাসীদল শান্তিচুক্তির বিরুদ্ধে ছিল।

আজ শান্তিচুক্তির প্রায় ২২ বছর পর সেই সন্ত্রাসীগোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থের তাগিদে নিজেদেরই ভেতর মারামারি করে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ টি গ্রুপে। এখন তাদের সবার দাবী একটি ‘স্বাধীন জুম্মরাষ্ট্র’। যেটা কখনই একটি সুস্থ মস্ত্বিস্কের দাবী হতে পারে না। যদি এটাই তাদের দাবী হয়ে থাকে তাহলে তারা শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করল কেন? আমরা যুদ্ধ করেছি আমাদের সম্পুর্ণ বাংলাদেশের জন্য। এই ভূমির কোন অংশ ছেড়ে দেয়ার জন্য আমরা মুক্তিযুদ্ধ করিনি। যেখানে পার্বত্য চট্টগ্রাম আমাদের দেশের প্রায় ১/১০ ভাগ জুড়ে রয়েছে সেখানে কিভাবে আমরা সেটি ছেড়ে দেবো উপজাতি সন্ত্রাসীদের হাতে?

যদি আমরা সন্ত্রাসীদলের আচার আচরণ এবং কার্যবিধি পর্যালোচনা করি তাহলে দেখব যে তারা আজ পর্যন্ত যা যা করেছে তার সবই হচ্ছে নিজেদের স্বার্থ আদায়ের উদ্দেশ্যে। তারা বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার চাঁদা আদায় করে।

প্রশ্ন হচ্ছে কেন? কারন, তারা যে সন্ত্রাসীদল পরিচালনা করে তাদের বেতন প্রদান, অস্ত্র ক্রয়-বিক্রয়, সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা এবং নানান ধরনের সুবিধা ভোগ করার জন্য এই চাঁদাবাজি করে থাকে। এই টাকায় নেতারা বিলাসবহুল জীবনযাপন করে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের কষ্টে রেখে। তাহলে সাধারণ জনগনের পাওনা কোথায়?

যিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চাঁদা আদায় করছেন তার বেতন ৮০০-১০০০ টাকা, আর যিনি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে রাত্রিযাপন করছেন আর আদেশ দিচ্ছেন সেই তিনি বিলাসবহুল গাড়ি চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বিদেশে বাড়ি-গাড়ি করছেন, নিজের সন্তানদেরকে বিদেশে পড়ালেখা করাচ্ছেন। আর সেই সাথে সাধারণ জুম্ম জনগণকে জুম্ম জাতির অধিকারের কথা বলে একটি মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে নিজের স্বার্থসিদ্ধির এক চরম খেলা শুরু করেছে উপজাতীয় সন্ত্রাসী ও তাদের পৃষ্ঠপোষক নেতৃবৃন্দ। আর পাহাড়ের জনগণ সাদামনে তাদের কথায় অস্ত্র হাতে নিয়ে তাদের জীবন বাজি রেখে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে পড়ছে। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘Misleading’ বা ভুল পথে পরিচালনা করা।

সংগ্রাম করে কি লাভ? রাষ্ট্রের পক্ষ হতে তাদের কি কম সুবিধা দেয়া হয়? মোটেও না। বরং আমাদের সাধারণ বাঙ্গালীদের থেকে আরও বেশি সুবিধা উপভোগ করে উপজাতিরা। তাদের জন্য আয়কর মাফ, তাদের জন্য ব্যাংকে সুদের হার কম, তাদের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে রয়েছে বিশেষ সুবিধা, তাদের জন্য রেশন প্রদান করা হয় আরও কত কি!! সেখানে আমাদের পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকৃত বাঙ্গালীরা কিছুই পায় না। পার্বত্য বাংগালীদেরকে সকলকিছু একজন সাধারণ জনতার মতই বহন করতে হয়। অথচ এত সুবিধা দিয়েও উপজাতিদের মন ভরছে না। বাংলায় একটি প্রবাদ রয়েছে-‘‘আসতে দিলে বসতে চায়, বসতে দিলে শুতে চায়”। পাহাড়ি উপজাতিদের এখন এই দশা।

শান্তিচুক্তির সময় তাদের এইসব দাবী ছিল না। এখন তাহলে কেন এইগুলো সামনে আসছে? তার কারণ বিবেচনা করতে গেলে আমাদেরকে একটু পিছে ফিরে তাকাতে হবে। ১৯৫৭ সালে প্রথম আইএলও কনভেনশন-১০৭ প্রবর্তিত হয়। সেখানে বাংলাদেশ সরকার ১৯৭২ সালের ২২ জুন তা অনুমোদন করে। যার ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল উপজাতীয় জনগোষ্ঠীকে দেশের মূলধারার সমকক্ষ হতে সহায়তা প্রদানের ঘোষণা প্রদান করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

পরবর্তিতে, যখন সেই কনভেনশন রিভাইস করে আইএলও কনভেনশন-১৬৯ প্রবর্তন করা হলো তখন উপজাতিদের কিছু বিশেষ সুবিধা দেয়া হল। যা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, তারা তাদের জায়গায় সম্পূর্ণ রাজত্ব পাবে- যা আমাদের রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী। তাই বাংলাদেশ সেই কনভেনশনকে অনুমোদন করেনি। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অধিকাংশ দেশই অনুমোদন করেনি। এই কনভেনশনের প্রতিপাদ্য বিষয়কে খুঁটি বানিয়ে ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায়, সন্তু লারমা, প্রসীত বিকাশ খীসা, ঊষাতন তালুকদার প্রমূখের মত কিছু সুবিধাবাদী পাহাড়ি নেতারা সাধারণ পাহাড়ি জনগনকে উস্কানী দেয়া শুরু করল যেন তারা সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে এবং সরকার তাদের দাবী মেনে নিয়ে তাদেরকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। যখন দেখল যে সরকার তাদের কথা মেনে নিচ্ছে না তখন তারা অস্ত্র হাতে নিয়ে আন্দোলনে নেমে পড়ল এবং অদ্যাবধি তা চালিয়ে যাচ্ছে।

‘আদিবাসী’ হচ্ছে তারা যারা একটি দেশের জন্ম থেকে ঐ দেশের নাগরিক। আমাদের দেশে বাঙ্গালীরাই হচ্ছে আসল আদিবাসী। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ইত্যাদি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের লোকজন তো এই দেশে এসেছে আরাকান, মিজোরাম, তিব্বত এইসব অঞ্চল থেকে। তাহলে তারা কিভাবে আদিবাসী হয়? তার মানে তাদের দাবী ঠিক নয়। এখন তারা যেসকল সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাচ্ছে সবই নিজেদের স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে।

যাই হোক, মূল বিষয় হচ্ছে যে- আমাদের কষ্টে অর্জিত স্বাধীন দেশকে আমরা কখনই অন্যের হাতে তুলে দিতে পারিনা। এর প্রত্যেকটি ইঞ্চি রক্ষা করা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব। পার্বত্য সন্ত্রাসীদের অনৈতিক দাবীর কাছে বাংলাদেশের জনগণ কখনই নতি স্বীকার করবে না। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা বীর বাংগালী রক্ষা করবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের উপর দেশের সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব বহাল রাখার জন্য প্রয়োজনে আমরা আবার যুদ্ধ করতে রাজি আছি।

– লেখক: খাগড়াছড়ি থেকে

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × 1 =

আরও পড়ুন