কপ২৬ সম্মেলন ও পার্বত্য চট্টগ্রামের জলবায়ু পরিবর্তন ভাবনা

fec-image

স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে গত ৩১ অক্টোবর হতে ১৩ নভেম্বর ২০২১ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো ২৬তম জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন সংক্ষেপে COP26 (Conference of Party 26)। ১২ নভেম্বরে সমাপ্তি পূর্ব নির্ধারিত থাকলেও ধনী দেশসমূহ এবং অংশগ্রহণকারী সকল পক্ষ চূড়ান্ত ঘোষণা সম্পর্কে একমত হতে না পারায় সম্মেলন আরো একদিন বর্ধিত করা হয়। বর্ধিত সময়ের পরেও এই সম্মেলন দরিদ্র ও জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এবং প্রভাবিত দেশসমূহের জন্য শুকনো আশ্বাস ব্যতীত কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে ও সফলতা খুবই নগন্য।

বাংলাদেশ ভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিসিসিএডি এর পরিচালক অধ্যাপক ড. সালিমুল হক ১২ নভেম্বর বিবিসি বাংলাকে বলেন, “বাংলাদেশের জন্য এটা ভালো না, একেবারেই ভালো না, কিন্তু আমাদের উপায় নেই। কনফারেন্সে এসে চিল্লাচিল্লি করা, দাবি-দাওয়া দেয়া ছাড়া আমাদের আর পথ নাই।” তিনি ১৩ নভেম্বর টুইটারে লিখেন, “যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইইউ COP26 কে ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত না করে দরজার আড়ালে উন্নয়নশীল দেশসমূহকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে, এটার অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা ও পন্থা মেনে নিতে। সরকারগুলোকে হয়তো ভয়ভীতি প্রদর্শন সম্ভব, কিন্তু জনগণ এটা মেনে নিবে না।” অধ্যাপক ড. সালিমুল হক একেবারে যথার্থই বলেছেন, এই COP26 হতে উল্লেখযোগ্য বা নতুন কোন প্রাপ্তি খুবই সীমিত হলেও সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে বৈশ্বিক জনসচেতনতা ও গুরুত্বারোপ। বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী তরুণ সমাজ এখন এবিষয়ে পূর্বের অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সোচ্চার।

১২ বছর পূর্বে কোপেনহেগেনে ধনী দেশসমূহ জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে এবং বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি কমিয়ে আনতে ২০২০ সালের মধ্যে দরিদ্র দেশগুলোতে বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিলেও জাপান বা ফ্রান্স ব্যতীত কোন দেশই প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি। অত্যন্ত দুঃখজনক হলো, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও প্রতাপশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের হতাশাজনক ভূমিকা পালন, যুক্তরাষ্ট্র আনুপাতিক হারে প্রযোজ্য অর্ধেকের অর্ধেক অর্থায়নও করেনি, উল্টো ২০২০ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প “প্যারিস এ্যাগ্রিমেন্টে” হতে বেরিয়ে গিয়েছিলেন এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাইডেন তাঁর প্রথম কর্ম দিবসে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পুনঃ যোগদান ঘটিয়েছেন, তবে তিনিও বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় এখনো শুকনো আশ্বাস ব্যতীত কার্যকরী কোন পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছেন। গত বছর জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয় বাস্তব পরিস্থিতি নির্দেশ করছে বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ নাগালের বাইরে।



জাতিসংঘ মহাসচিব এ্যান্টনিও গুতেরেস বলেন, “আমরা এখনো সেখানে নেই।” উপরন্তু ধনী দেশ সমূহের সিংহভাগ বিনিয়োগ ঝুঁকি প্রশমনমূলক খাতে, যেখান থেকে নিশ্চিত মুনাফাসহ তাদের বিনিয়োগ ওঠে আসবে। দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশসমূহ জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে সাহায্যের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ খুবই সীমিত এবং জলবায়ু পরিবর্তনে স্বীকার হওয়া ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠতে বিনিয়োগ বা সাহায্য প্রদানে ধনী দেশসমূহ প্রকাশ করছে চরম অনীহা। এটা স্পষ্ট প্রতীয়মান প্যারিস এ্যাগ্রিমেন্টের লক্ষ্যমাত্রা বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর মধ্যে সীমিত রাখার পথে বিশ্ব নেই। উন্নত দেশ সমূহের অতি স্বার্থবাদী চিন্তা ও বিশ্বব্যাপী প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা এবং ঐ সব দেশ সমূহের কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর দৌরাত্ম্য হলো এই দূরাবস্থার মূল কারণ। এবারের জলবায়ু সম্মেলনের অন্যান্য আশাব্যঞ্জক দিকগুলো হচ্ছে, বিশ্বের দুই শীর্ষ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় একযোগে কাজ করার ঘোষণা, ২০৩০ সালের মধ্যে বনভূমি ধ্বংস শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার ঘোষণা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব-আমিরাতের নেতৃত্বে ৭৫ টি দেশের আধুনিক কৃষি উন্নয়নে বৃহৎ বিনিয়োগের ঘোষণা।

বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে অতি নূন্যতম অংশ বাংলাদেশের উপর আরোপযোগ্য, বর্তমানে ধনী দেশসমূহের বার্ষিক মাথাপিছু ২০ টন কার্বন নিঃসরণের বিপরীতে বাংলাদেশের বার্ষিক মাথাপিছু নিঃসরণ ০.৩ টন। নিউইয়র্ক টাইমস এর সূত্রমতে, গত ১৭০ বছরে উন্নত ২৩টি দেশ বিশ্বের ৫০ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ ঘটিয়েছে এবং অন্য ১৫০টি দেশ নিঃসরণ ঘটিয়েছে অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ। ক্লাইমেট ভলনারেবল কান্ট্রিজ (সিবিএফ), যাদের মোট জনসংখ্যা ১২০ কোটি, সিবিএফ এর ৫৫ টি দেশ মিলে পৃথিবীর মাত্র ৫% কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী। বিপরীতে এই দেশগুলো মূলতঃ জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং বহু দ্বীপ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। দ্বিতীয় মেয়াদে সিবিএফ এর সভাপতি হিসেবে COP26 এর পূর্বে বাংলাদেশ “মুজিব ক্লাইমেট প্রসপ্যারেটি প্ল্যান” উপস্থাপন করেছে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে কালজয়ী চিন্তা-চেতনা ও পদক্ষেপের উপর ভিত্তি করে এই পরিকল্পনা প্রণীত হয়েছে এবং জন্মশতবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই পরিকল্পনার নামকরণ করা হয়েছে। এই পরিকল্পনা দেশে বিদ্যমান পরিকল্পনা সমূহ বা সাংগঠনিক কাঠামোতে কোন ধরনের পরিবর্তন আনবে না, বরং গতি সঞ্চার করবে ও সফলতা নিশ্চিত করবে। পাঁচটি মূলভাবে প্রণীত এই পরিকল্পনা সিবিএফ দেশ সমূহের মধ্যে ও বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় উন্নয়নশীল দেশ সমূহের জন্য আদর্শ হিসেবে ধরা হচ্ছে। “মুজিব ক্লাইমেট প্রসপ্যারেটি প্ল্যান” এর প্রথম ভাব হলো বিদ্যমান সকল পরিকল্পনা ও কার্যক্রমের মধ্যে কৌশলগত সেতু বন্ধন হিসেবে কাজ করে বাস্তবায়নে গতি সঞ্চার করা, দ্বিতীয় ভাব হলো পাঁচ যোগ পাঁচ বছর কর্মসূচীর মাধ্যমে বিনিয়োগের ভিত্তি তৈরী ও বিনিয়োগের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রযুক্তিক ও অর্থনৈতিক খাতে বাংলাদেশকে স্বনির্ভর করে রূপান্তরকারী পরিবর্তন আনয়ন করা, তৃতীয় ভাব হলো বিদ্যমান অপরিশুদ্ধ জ্বালানি পরিশোধনাগার সমূহ পুনঃসংরক্ষণ করে উচ্চ প্রযুক্তি সম্পন্ন সবুজ জ্বালানি স্থাপনায় রূপান্তর করে দেশের জন্য কৌশলগত জ্বালানি কেন্দ্র গড়ে তোলা, চতুর্থ ভাব হলো অভ্যন্তরীণ সবুজ জ্বালানি খাতের উন্নয়নের জন্য বৈশ্বিক বিনিয়োগের সংস্থান করা, পঞ্চম ভাব হলো যুব সমাজের শিক্ষা ও সক্ষমতার মান বৃদ্ধি করে তাদেরকে দক্ষ কারিগরি জনশক্তি এবং ব্যবস্থাপক হিসেবে গড়ে তোলা।

বাংলাদেশ ২০৩১ সালের মধ্যে অর্থনীতির আকার দ্বিগুণ করা ও মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া এবং ২০৩০ সালের মধ্যে মোট জ্বালানি চাহিদার ৩০ শতাংশ রূপান্তরিত উৎস হতে যোগানের দিকে অগ্রসরমান। “মুজিব ক্লাইমেট প্রসপ্যারেটি প্ল্যান” সফলভাবে বাস্তবায়ন হলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের জিডিপি আশানুরূপ হারে বৃদ্ধি পাবে এবং জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন ও মানিয়ে নেওয়া খাতে নতুন ৪১ লক্ষ কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ বার্ষিক ২ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেওয়া সংক্রান্ত প্রকল্পে ব্যয় করছে, যার ৭৫% নিজস্ব অর্থায়ন। ২০৫০ সালের মধ্যে এই ব্যয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে প্রায় তিনগুণ এবং প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য ধনী দেশ সমূহের প্রতিশ্রুত ক্লাইমেট ফান্ডে সুবিধাজনক প্রবেশাধিকার না থাকলে অগ্রগতির গতি অনেক কমে আসবে। ধনী দেশগুলো সম্মেলনে প্রকাশ্যে যেটাই বলুক না কেন তাদের বিনিয়োগ প্রকৃতপক্ষে কৌশলগত, ব্যবসায়িক ও সামরিক প্রভাব বিস্তারের সাথে সম্পর্কিত। দেশের কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা নীতি জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে ধনী দেশ সমূহের বড় বড় বিনিয়োগ প্রাপ্তি যে কোন উন্নয়নশীল দেশের জন্য অনেক কঠিন একটি বিষয়।

বিনিয়োগ প্রাপ্তির অন্য আরেকটি প্রধান বাধা হলো ধনী দেশগুলো তাদের কৃতকর্মের ফলে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেওয়া এবং ইতিমধ্যেই সম্মুখীন হওয়া ক্ষয়ক্ষতির জন্য দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশসমূহকে ন্যায্য অনুদান বা ক্ষতিপূরণ না দিয়ে উল্টো জীবাশ্ম জ্বালানীতে ভর্তুকি কমাতে বলা। যেটা কাঙ্ক্ষিত অবকাঠামোগত, প্রযুক্তিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন লাভের পূর্বে মেনে নেওয়া অযৌক্তিক এবং দরিদ্র জনসাধারণের জীবনযাপনে বিপর্যয়কর প্রভাব ফেলবে। বিষয়টি অনেকটা এরকম জাতির অর্ধেকের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য বাকি অর্ধেককে আত্মহত্যা বা অতি মানবেতর জীবনযাপন বেছে নিতে বলা। ধনী দেশসমূহের অর্থায়নের সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যায্য চাপের ফলে ক্রমেই সম্পদ কুক্ষিগত হচ্ছে মুষ্টিমেয় কিছু লোকের হাতে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে দরিদ্র জনসাধারণ পতিত হচ্ছে আরো কঠোর দূরাবস্থাতে।

জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন ও পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেওয়ার জন্য প্রণীত পরিকল্পনাসমূহ বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ নেহাত কম নয়। “মুজিব ক্লাইমেট প্রসপ্যারেটি প্ল্যান” নিঃসন্দেহে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় গৃহীত সকল প্রকল্পে অভাবনীয় অগ্রগতি আনয়ন করবে ও একবারে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে, কিন্তু দেশের অন্য সকল এলাকার ন্যায় একই প্রক্রিয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামে এই প্ল্যান বাস্তবায়ন করতে গেলে বহুবিধ কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে। দেশের মোট ভূ-খণ্ডের এক দশমাংশ ও কৌশলগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্বত্য চট্টগ্রামে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণের পূর্বে প্রাকৃতিক এবং গতানুগতিক প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি আইন শৃংখলা পরিস্থিতি, ভূমি সমস্যা, জনসাধারণের মধ্যে বিদ্যমান মারাত্মক অসচেতনতা ও পরিবেশ বিরোধী কার্যক্রমসহ আরো বেশ কিছু বিষয় গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন ও পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেওয়া সংক্রান্ত যে কোন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পূর্বে বিবেচ্য বিষয়সমূহ নিম্নে সংক্ষিপ্ত আকারে আলোচনা করা হলো:

প্রাকৃতিক বন ধ্বংসকরণ

পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের বনজ কাঠের অন্যতম উৎস। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন মারাত্মক প্রভাব ফেলছে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক বনের উপর। অর্থ উপার্জন ও বসতি স্থাপনের জন্য নির্বিচারে প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করা হচ্ছে, সরকারি রিজার্ভ ফরেস্টের জায়গায় গড়ে তোলা হচ্ছে জনবসতি, অধিক লাভের আশায় ব্যক্তি মালিকানার কোন পাহাড়ে প্রাকৃতিক বন টিকে থাকা/গড়ে ওঠার কোন সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না, প্রাকৃতিক বনের স্থলে গড়ে তোলা হচ্ছে মূলবান গাছের বা ফলের বাগান। যে কারণে পাহাড়ের পানি ধারণ ক্ষমতা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে এবং ভূমি ক্ষয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত কয়েক বছরে সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান স্থাপনের নাম করে সরকারি ভূমি দখল করে প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করা। বর্তমানে শুষ্ক মৌসুমে পার্বত্য চট্টগ্রামে সৃষ্ট জল সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবেও বিবেচনা করা হয় এই নির্বিচারে প্রাকৃতিক বন ধ্বংসকরণ।

ইট ভাটার দহন
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ (সংশোধিত ২০১৯) এর ধারা ৮(১) ও ৮(৩) অনুসরণ করলে পার্বত্য চট্টগ্রামে ইট ভাটা স্থাপনের কোন সুযোগ নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমির গঠন, পরিবেশ ও জন বসতি বিবেচনায় পার্বত্য চট্টগ্রামে এমন কোন ভূমি খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে বৈধভাবে ইট ভাটা স্থাপন করা সম্ভব। এছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামে অর্জিত উন্নয়নের সুফল জনগণ সঠিকভাবে ভোগ করার জন্য ২০১৯ সালের সংশোধনে বাদ দেওয়া ৮(৩)(চ) ধারাও শুধুমাত্র পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য বলবৎ রাখা একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামকে প্রতিনিয়ত দহন করছে শতাধিক ইট ভাটা! এবিষয়ে বিভিন্ন জাতীয় মিডিয়া ও অনলাইন পত্রিকায় অসংখ্য সরেজমিনে প্রতিবেদন হয়েছে, তবে আশ্চর্যজনকভাবে পরিস্থিতি প্রায় অপরিবর্তিত! লামায় ২৮ ইটভাটাকে ১ কোটি ৮ লক্ষ টাকা জরিমানা(পার্বত্যনিউজ, ৩১ আগস্ট, ২০২১), বান্দরবানে ১০ ইটভাটা মালিককে পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিমানা(পার্বত্যনিউজ, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১) ৩০ ইট ভাটায় পুড়ছে ফাইতং- প্রথম আলো (২৩ ডিসেম্বর ২০১৯), খাগড়াছড়ির ৪৩ ইট ভাটায় পুড়ছে বনের কাঠ- বাংলা ট্রিবিউন (০৯ ডিসেম্বর ২০২০), রাঙ্গামাটির লংগদুতে তিনটি অবৈধ ইটভাটা- ৭১ টিভি (০৩ মার্চ ২০২১), বন উজাড় করে জনবসতি ঘেঁষে পাহাড়ে ৬৪ ইট ভাটা- প্রথম আলো (১৪ জুন ২০২১) এর প্রতিবেদন গুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই প্রতিবেদনগুলোতে বর্ণিত স্থান ছাড়াও রাঙ্গামাটির কাউখালি উপজেলার ৪নং কলমপতি ইউনিয়ন ও রাজস্থলী উপজেলার বাঙ্গালহালিয়া’তেও রয়েছে ইট ভাটা। আশাকরি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পার্বত্য চট্টগ্রামের উপর ইট ভাটার দহনের বিষয়টি আরো গভীর ও সূক্ষ্মভাবে বিবেচনা করবেন।

অসামঞ্জস্যপূর্ণ কৃষি ব্যবস্থা
পার্বত্য চট্টগ্রামের কৃষি ব্যবস্থার কথা ওঠলেই অধিকাংশ প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞগণ জুম চাষের পক্ষে সাফাই দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি বিশেষ শ্রেণীর আনুকূল্য অর্জন করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই সম্মানিত বিশেষজ্ঞগণের কেউই পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত জনপদে মাত্র এক বছর বসবাস বা গবেষণা কোনটাই হয়তো করেননি। জুম চাষ অবশ্যই একটি পাহাড় বান্ধব চাষ পদ্ধতি, কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত আগুন লাগালে বা প্রতি বছর একই পাহাড়ে জুম চাষ করলে এই পদ্ধতি মারাত্মক ক্ষতিকর, কেউ এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা কখনোই পরিস্কার করে বলেন না! এবার আসি পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম চাষিদের কথায়, তাদের কি অবস্থা?

জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সাথে সাথে জুম চাষ এখন আর সবার জন্য লাভজনক কোন পেশা নয়, যাদের অধিক পরিমাণে পাহাড়ি ভূমি আছে তারা মূলতঃ নিজেদের পারিবারিক চাহিদা মেটানোর জন্য এখনো ছোট আকারে জুম চাষ করছেন। যাদের স্বল্প পরিমাণে ভূমি তারা কেউ এখন আর জুম চাষ সহজে করেন না। জুম চাষের বদলে পাহাড়ে ড্রাগন ফল, মালটা, কমলা, ফজলি আম, আদা, হলুদ, তামাক এমনকি অবৈধভাবে প্রচুর পরিমাণে গাঁজার চাষ হচ্ছে। পাহাড়ে পোল্ট্রি ও লেয়ার খামার, গবাদিপশুর খামার, কোয়েল ও কবুতরের খামার, মাশরুম চাষসহ নানাবিধ উৎপাদনমুখী কৃষির প্রসার ঘটেছে। অতএব বাস্তবতা বিবর্জিত বক্তব্য না দিয়ে সময়ের দাবী অনুযায়ী জাপানের মতো কৃষি উন্নত দেশকে অনুসরণ করে পাহাড় বান্ধব আধুনিক কৃষি পদ্ধতির প্রসারের চিন্তা করা খুবই জরুরী।

অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা
জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামে অপরিকল্পিত বসতি ও স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে এবং প্রতিটি পাহাড়ের পানি নিষ্কাশনের জায়গাকে ক্রমেই সংকুচিত করে ফেলা হচ্ছে। যার ফলে ভূমি ক্ষয় ও পাহাড় ধসের পরিমাণ মাত্রারিক্ত বেড়ে যাচ্ছে। বড় বড় পাহাড় ধসে প্রাণহানি ব্যতীত হাজারো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাহাড় ধস বা ক্রমশ বর্ধনশীল রেইন কাঠের বৃক্ষগুলো এখনো খবরের শিরোনাম হয়তো না, কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে এগুলোর মাধ্যমে আগামী কয়েক দশকে মারাত্মক সব প্রাকৃতিক বিপর্যয় নিশ্চিত আসন্ন। এছাড়াও অপরিকল্পিতভাবে পাথর উত্তোলন পাহাড়ে পানির উৎস ধংস হচ্ছে, পাহাড় ধস বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অসচেতনতা
পার্বত্যবাসীকে সঠিকভাবে সচেতন করা হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জলবায়ুর বিরূপ পরিবর্তনের সম্ভাবনা ও পরিবেশ বিপর্যয় বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। পার্বত্যবাসীর জীবনযাত্রার মানের অনকেটা উন্নয়ন ঘটলেও এখনো অধিকাংশ প্লাস্টিক বর্জ্য ও পলিথিনের ক্ষতিকারক দিক, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পাহাড় ও পরিবেশ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পাহাড় কাটার কুফল, প্রাকৃতিক বন সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন নন। ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার কল্যাণে প্রতিনিয়ত সচেতনতা বৃদ্ধি পেলেও দূর্গম এলাকা সমূহে ব্যাপকহারে সচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রম গ্রহণের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। পাহাড়বাসীর সরলতার কথা ওঠলে সব সময় একটি মজার গল্প মনে পড়ে যায়, এক শ্রদ্ধেয় চাকমা বড় ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, প্রয়াত চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় কেন কাপ্তাই বাঁধ তৈরীর (১৯৫৬-৬২) অনুমতি দিয়েছিলেন? যে বাঁধের মুখ বন্ধ করার পর তাঁর নিজের রাজবাড়ী পর্যন্ত ডুবে গিয়েছিল! এবিষয়ে ওনার উত্তর শুনে আমি একদম অবাক হয়ে যায়, তিনি বলেন, “আমার আজু’র (দাদার) মুখে শুনেছি রাজা নাকি মনে মনে ভেবেছিলেন যেহেতু সামান্য ছড়ার (পাহাড়ি খালের) গোদা (শুষ্ক মৌসুমে পাহাড়ি খালে সেচ ও ব্যবহারের জন্য পানি জমিয়ে রাখতে গাছের গুড়ি, বাঁশ, মাটি ও খড়কুটোর সমন্বয়ে দেওয়া অস্থায়ী বাঁধ) টিকে না, তাই সরকারও কখনো কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দিয়ে টিকিয়ে রাখতে পারবে না। এবং তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বাঁধের মুখ বন্ধ করলে রাজবাড়ীসহ বিশাল এলাকা ডুবে যাওয়ার প্রকৃত বিবরণ বাঁধের মুখ বন্ধের পূর্বে জরীপের মাধ্যমে জানতে পারলেও রাজবাড়ী ডুবে যাওয়ার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত রাজা ত্রিদিব রায় এর নিকট বিস্তারিত গোপন করেছিল।” প্রশ্নের উত্তরে শুনা এই গল্পের সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার অন্য কোন মাধ্যম আমার নেই এবং হয়তো সম্ভব না, তবে লোক মুখে শুনা এই গল্প সবসময় পার্বত্যবাসীর অসচেতনতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হিসেবে আমার মাথায় থাকে। অবশ্য বর্তমানে কুসংস্কার, অজ্ঞতা ও অসচেতনতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে পাহাড়ে বসবাসরত বাঙ্গালী সম্প্রদায়।

আর্থসামাজিক অবস্থা
পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রাকৃতিক বন ও রিজার্ভ ফরেস্ট উজাড় হওয়া, রাস্তা বা জেলা/উপজেলা শহর ও বাজারগুলোর নিকটবর্তী এলাকায় অপরিকল্পিত বসতি গড়ে ওঠা, প্রাকৃতিক সম্পদের অনিয়ন্ত্রিত ও অতি আহরণের অন্যতম মূল কারণ হলো বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থা। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায় ব্যতীত অন্য সকল সম্প্রদায়ের বিপুল পরিমাণ জনগোষ্ঠী চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে এবং বিকল্প কোন উপায় না পেয়ে অর্থ উপার্জন ও জীবনধারণের জন্য পাহাড়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে বা বেআইনী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামে জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনের অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে বিদ্যমান সুযোগ সুবিধা সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে প্রদান না করে সম্প্রদায়গুলোর পিছিয়ে থাকা জনসংখ্যার ভিত্তিতে সবসময় সমভাবে প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণ একান্ত আবশ্যক।

ভূমি সমস্যা
পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যমান সকল সমস্যার জন্মদাত্রী বলে আখ্যায়িত করা হয় ভূমি সমস্যাকে। পাহাড়ে চলমান হানাহানি, সাম্প্রদায়িক সংঘাত, অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন ও রিজার্ভ ফরেস্ট ধ্বংসের অন্যতম কারণও এই ভূমি সমস্যা। ভূমি সমস্যার সুষ্ঠু ও সঠিক সমাধান না হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যমান অন্য কোন সমস্যা পুরোপুরি সমাধান প্রায় অসম্ভব। পার্বত্য চট্টগ্রামের জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন বা পাহাড় ধসের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় রোধে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসজনিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকায় বর্ণিত ভূমির পুনঃ শ্রেণীবিভাগকরণ, জাতীয় পাহাড় ব্যবস্থাপনা নীতিমালা প্রণয়ন, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রকৌশল ব্যবহার করে পাহাড় শাসন, প্রতিটি পাহাড়ের নিরাপত্তার দায়িত্ব বন্টনের মতো সুপারিশগুলোও ভূমি সমস্যা সমাধানের পূর্বে কখনো বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

সন্ত্রাসবাদ
পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাগুলোর বাস্তুসংস্থান চক্রে সবকিছুর উপরে অবস্থান করছে সন্ত্রাসবাদ। স্বার্থান্বেষী মহলসমূহ অন্যান্য সমস্যাগুলোকে পুঁজি করে পাহাড়ি যুবকদের ভুল বুঝিয়ে বিপথগামী করে হাতে অস্ত্র তুলে দিচ্ছে এবং বছরের পর বছর ধরে পাহাড়ে সন্ত্রাসবাদ টিকিয়ে রেখে ফায়দা লুঠছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে যে কোন উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও ভালো কাজের মূল বাধা হলো এই সন্ত্রাসবাদ। হোক সেটা মেডিকেল কলেজ স্থাপন বা শান্তি চুক্তির অবশিষ্ট শর্তসমূহ বাস্তবায়ন। দূর্গম পাহাড়ি এলাকা এবং পাশ্ববর্তী দুটি প্রতিবেশী দেশের সাথে আন্তর্জাতিক সীমানা থাকার সুযোগ নিয়ে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো পাহাড়ে কায়েম করে রেখেছে গুম-খুন- অপহরণ-ধর্ষণ- চাঁদাবাজি- অস্ত্র ও মাদক ব্যবসার সাম্রাজ্য। পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর কার্যক্রমে এটা স্পষ্ট প্রতীয়মান পাশ্ববর্তী দেশ সমূহের কুখ্যাত আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর সাথে এদের নিবিড় সখ্যতা ও সমন্বয় রয়েছে। এবং এরা সীমান্তের উভয় পাড়ে সমন্বয় বজায় রেখে আন্তর্জাতিক অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা পরিচালনা করছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে এমন কোন অপকর্ম নেই যার সাথে এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো জড়িত নয়! আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে রিজার্ভ ফরেস্টের মূল্যবান কাঠ কেটে পাচার, গোপনে গাঁজা ও আফিমের চাষ, ইয়াবা-আইস- গাঁজা-আফিম- হিরোইন পাচার, প্রায় প্রতিটি ব্যবসায়িক/বাণিজ্যিক লেনদেন হতে চাঁদা আদায়, গহীন পাহাড়ে অস্ত্র তৈরী ও সন্ত্রাসী প্রশিক্ষণ পরিচালনাসহ অপরাধ জগতে বিদ্যমান প্রায় সকল কার্যক্রম এরা চালু রেখেছে পার্বত্য চট্টগ্রামে।

প্রত্যেকটি সন্ত্রাসী গ্রুপের সাপ্তাহিক আয়ের পরিমাণ কোটি কোটি টাকা, তাই আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এদের মধ্যে সংগঠিত আন্তঃগ্রুপ সংঘর্ষগুলো হয় অত্যন্ত ভয়াবহ প্রাণঘাতী ও অমানবিক। এরা কোন নিয়মনীতিতে বিশ্বাসী না, এরা মূলতঃ ব্রাশফায়ারে বিশ্বাসী। এদের বিরুদ্ধে গেলেই মরতে হবে ব্রাশফায়ারে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় যে কোন বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে গেলেই দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সকল বাধা আসবে এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীরগুলোর নিকট হতে। প্রকৃতপক্ষে এরা কখনো পাহাড়ের উন্নয়ন চায় না, এরা পাহাড়ি জনসাধারণকে চিরকাল জিম্মি বানিয়ে রাখতে চায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়ন ও শান্তি স্থাপনে এই সন্ত্রাসবাদই হলো মূল বাধা। আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীসমূহ চমৎকার পেশাদারিত্ব ও দক্ষতা এবং অপরিমেয় দেশপ্রেমের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাস দমনে কাজ করলেও রাজনৈতিক মেরুকরণ, আন্তর্জাতিক চক্রান্ত ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর দৌরাত্ম্যে আশানুরূপভাবে কমিয়ে আনা সম্ভবপর হচ্ছে না। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের যে কোন সমস্যা সমাধানের পদক্ষেপে নেওয়ার পূর্বে সবার আগে সন্ত্রাসবাদ আরো দৃঢ় এবং কঠোর হস্তে নির্মূল করতে হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের জলবায়ুর বিরূপ পরিবর্তন সুদূর অতীত বা ভবিষ্যৎ কোনটাই নয়, এটি এখন বর্তমান। ২০০৮, ২০১২ ও ২০১৭ সালে প্রচুর হতাহতের ঘটনা ঘটেছে ভূমিধসে, প্রতি বছরই শুষ্ক মৌসুমে পার্বত্য চট্টগ্রামের বহু উপজেলায় তীব্র জল সংকট দেখা দিচ্ছে, রিজার্ভ ফরেস্ট ও প্রাকৃতিক বনগুলো দিনে দিনে স্মৃতি চিহ্নের আকার ধারণ করছে, কাপ্তাই হ্রদের পানি ধারণ ক্ষমতা ক্রমশ কমে আসছে, বিগত কয়েক বছর ধরে প্রতি বছরই অতিবৃষ্টি ও তাপদাহ হানা দিচ্ছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যাচ্ছে এবং বহু প্রজাতির বন্যপ্রাণী পার্বত্য চট্টগ্রামে বিলুপ্ত হয়ে গেছে/ বিলুপ্তির পথে। বজ্রপাতে মারা যাচ্ছে বিপুল মানুষ।

মোটা দাগে পার্বত্য চট্টগ্রামে জলবায়ুর বিরূপ পরিবর্তন প্রশমন ও জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেওয়ার জন্য প্রতিটি পাড়া বা ওয়ার্ডকে জরুরি ভিত্তিতে “মুজিব ক্লাইমেট প্রসপ্যারেটি প্ল্যান” এর প্রযোজ্য ভাবসমূহের আওতায় নিয়ে আসতে হবে এবং গৃহীত উদ্যোগসমূহে পাড়া/ওয়ার্ডের কার্বারি/হেডম্যান/মেম্বারসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তবে যে কোন পরিকল্পনা বা কার্যক্রমের আশানুরূপ সাফল্য পেতে হলে সবার আগে কঠোর হস্তে সন্ত্রাসবাদ দমন ও ভূমি সমস্যার সমাধান করতে হবে।

তথ্যসূত্রঃ এনার্জি এ্যান্ড পাওয়ার, নেচার, ডয়চে ভেলে, টুইটার

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 + one =

আরও পড়ুন