কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় কর্ণফুলী পেপার মিল ধ্বংসের পথে

fec-image

শ্রমিকদের পাওনা, শ্রমিক ছাঁটাইসহ নানামুখী সমস্যার কারণে ধারাবাহিক লোকসানে জর্জরিত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ড্রাস্টিজ করপোরেশন’র (বিসিআইসি) প্রতিষ্ঠান কর্ণফূলী পেপার মিলস (কেপিএম)।

কেপিএম সূত্রে জানা যায়, ১৯৫১ সালে কাপ্তাইয়ের চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নে ১লক্ষ ২৬ হাজার একর জায়গা জুড়ে কেপিএম প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৫৩ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে প্রথম বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। এই মিল প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা ছিল আমেরিকা, জার্মানি, ইংল্যান্ড, সুইডেন ও ইতালির। ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির কারণে শুরুতে এটি সফলতা পেতে ব্যর্থ হয়। ফলে ১৯৬৪ সালে এর মালিকানা হস্তান্তরিত হয় পাকিস্তানের দাউদ গ্রুপ অব ইন্ডাষ্ট্রিজের কাছে।

এই গ্রুপটি কারখানার আধুনিকায়ন করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তৎকালীন সরকার বিসিআইসি’র অধীন প্রতিষ্ঠানটিকে ন্যাস্ত করে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা নিয়ে দাউদ গ্রুপের সাথে বাংলাদেশ সরকারের মামলা চলছে।

পার্বত্য এলাকায় বনজ কাঁচামালের সহজলভ্যতা থাকায় অল্প সময়ে লাভের মুখ দেখে কেপিএম। এ লাভের টাকায় সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল কর্ণফুলী রেয়ন মিলস লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠানের তিনটি ইউনিটে দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ১১০ থেকে ১৩০ মেট্রিক টন। লাভের ধারাবাহিকতা ২০০১ সাল পর্যন্ত বজায় ছিল।

কিন্তু ২০০১ পরবর্তী সময়ে নানামুখী দুর্নীতি ও অনিয়ম কেপিএমকে লোকসানী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান কয়েকশো কোটি টাকা। অবসরে যাওয়া শ্রমিক-কর্মচারীদের অনেক পাওনা ও বকেয়া রয়েছে।

কাঁচামাল ও বিভিন্ন সামগ্রী সরবরাহ বাবদ প্রতিষ্ঠানটির কাছে ঠিকাদার ও সরবরাহকারীরা পাওনা রয়েছে প্রায় শত কোটি টাকা। এত বড় অঙ্কের পাওনা পরিশোধ এবং নতুন করে অর্থ যোগান দিয়ে কারখানাটিকে সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। লোকসানের মধ্যে থাকায় ঠিকাদাররাও কাঁচামাল সরবরাহে আগ্রহ হারিয়েছেন।

বিসিআইসি’র পক্ষ থেকে দফায় দফায় বরাদ্দ দিয়েও কারখানাটিকে লাভজনক করা সম্ভব হচ্ছে না। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯ হাজার মেট্রিক টন কাগজের উৎপাদন কম হয়। কেপিএম বন্ধ হয়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কায় বিচলিত সেখানে কমর্রত বর্তমান শ্রমিক-কর্মচারীরা।

এদিকে প্রতিষ্ঠানটির ভঙ্গুরদশা থেকে মুক্তি দিতে ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর পার্বত্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি র.আ.ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর নেতৃত্বে ১০ সদস্যর একটি টিম কেমিএম পরিদর্শন করেন। তিনি প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাকর্মচারীদের সাথে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন এবং ওই এলাকায় নতুন করে আরেকটি মিল প্রতিষ্ঠা করা হবে বলে আশ্বাস প্রদান করেন। কিন্তু বছর চলে গেলেও এর কোন সুফলতা দেখতে পায়নি প্রতিষ্ঠানটি।

শ্রমিক-কর্মচারী পরিষদ সভাপতি আবদুল রাজ্জাক বলেছেন, কেপিএম এখন ধ্বংসের পথে। প্রতিষ্ঠানটির কোন অগ্রগামী নেই। নেই কোন মেইনট্যান্স । বর্তমানে ৩০০জন স্থায়ী শ্রমিক রয়েছে। উৎপাদন না থাকায় তাদের দু’মাসের বেতন বন্ধ।

তিনি আরও বলেন, কারখানার মেশিন (টারবাইন) চালানোর জন্য প্রতিদিন গড়ে ১০টন গ্যাস ব্যবহার করা হয়। মাসে খরচ পড়ে দেড় কোটি টাকার মতো। কিন্তু খরচের তুলনায় কাগজ উৎপন্ন করা যাচ্ছে না। কারণ কাগজ উৎপন্ন করার জন্য যে ধরণের আধুনিক মেশিনারিজ দরকার হয় তেমন মেশিন এ প্রতিষ্ঠানে নেই। পুরনো আমলের যে মেশিনগুলো আছে তা সংস্কার না করার কারণে নষ্ট হওয়ার পথে।

শ্রমিকদের এ নেতা জানান, মূলত কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা এবং অর্থ বিনিয়োগ না করায় প্রতিষ্টানটি এখন ধ্বংসের মুখে।

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, কর্তৃপক্ষের সুনজরে কেপিএম তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে।

এ বিষয়ে জানতে কর্ণফুলী পেপার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ডা: এমএম কাদেরের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে পরিচয় দিয়ে একটি ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোন সাড়া আসেনি।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × two =

আরও পড়ুন