বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় এমন কিছু জাতীয় সম্পদ রয়েছে, যেগুলোর প্রকৃত সম্ভাবনা এখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। সেইসব সম্ভাবনার অন্যতম হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্র কাপ্তাই লেক। দেশের বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ হিসেবে পরিচিত এই লেক দীর্ঘদিন ধরে মূলত জলবিদ্যুৎ, সীমিত মৎস্য আহরণ ও পর্যটনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে। অথচ সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে কাপ্তাই লেক হতে পারে বাংলাদেশের সবুজ জ্বালানি, নীল অর্থনীতি, পরিবেশবান্ধব পর্যটন এবং পাহাড়ি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
বর্তমান বিশ্বে উন্নয়নের ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন আর শুধু শিল্পকারখানা বা নগরায়ণকে উন্নয়নের একমাত্র সূচক হিসেবে দেখা হয় না; বরং প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশ সুরক্ষা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি সংকট এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে প্রতিটি দেশ নিজস্ব সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাইছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতা অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
এমন বাস্তবতায় কাপ্তাই লেককে নতুনভাবে মূল্যায়ন করার সময় এসেছে। ১৯৬২ সালে কর্ণফুলী নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে সৃষ্ট প্রায় ৬৮ হাজার হেক্টর বিস্তৃত এই জলাধার শুধু একটি লেক নয়; বরং এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতি, পরিবেশ, জ্বালানি এবং জনজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি কৌশলগত সম্পদ। প্রায় ৭২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ তীররেখা, অসংখ্য পাহাড়ি দ্বীপ, বনাঞ্চল ও জলজ সম্পদ মিলিয়ে কাপ্তাই আজও এক অনাবিষ্কৃত অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ভাণ্ডার।
বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বড় সংকট হলো জ্বালানি নিরাপত্তা। প্রতিবছর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিপুল পরিমাণ তেল, কয়লা ও এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেলেই দেশের অর্থনীতি চাপে পড়ে। বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়। অথচ কাপ্তাই লেককে কেন্দ্র করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক সমন্বিত প্রকল্প গড়ে তোলা গেলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমানে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৩০ মেগাওয়াট। এটি বাংলাদেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং সম্পূর্ণ নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর। যদিও জাতীয় চাহিদার তুলনায় এই উৎপাদন সীমিত, তবে এর কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। কারণ বিশ্ব যখন জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে গিয়ে সবুজ জ্বালানির দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তখন কাপ্তাই হতে পারে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির কেন্দ্রবিন্দু।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে Floating Solar Power Plant বা ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। চীন, ভারত, সিঙ্গাপুর, জাপানসহ বহু দেশ জলাধারের ওপর সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে নতুন জ্বালানি বিপ্লব সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের জন্যও কাপ্তাই লেক এই প্রযুক্তির সবচেয়ে উপযোগী স্থানগুলোর একটি। কারণ এখানে বিশাল জলরাশি রয়েছে, যেখানে সৌর প্যানেল স্থাপনের জন্য অতিরিক্ত জমির প্রয়োজন হবে না। ফলে কৃষিজমি নষ্ট হবে না, বনভূমি ধ্বংস হবে না এবং পাহাড় কাটারও প্রয়োজন পড়বে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কাপ্তাই লেকের সামান্য অংশ ব্যবহার করেই কয়েকশ’ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এখানে আগে থেকেই জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো বিদ্যমান। ফলে জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুতের সমন্বয়ে একটি Hydro-Solar Hybrid System বা “জলবিদ্যুৎ-সৌরবিদ্যুতের সমন্বিত হাইব্রিড ব্যবস্থা” গড়ে তোলা যেতে পারে। দিনে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় পানির ব্যবহার কমিয়ে রাতে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে। এতে বিদ্যুতের ধারাবাহিকতা যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি উৎপাদন ব্যয়ও কমবে।
শুধু বিদ্যুৎ নয়, কাপ্তাই লেককে কেন্দ্র করে বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ ফলমূল ও কৃষিপণ্য সংরক্ষণের অভাবে প্রতি মৌসুমে নষ্ট হয়ে যায়। আনারস, আম, কাঁঠাল, কলা, কাজুবাদাম, কমলা, ড্রাগন ফল কিংবা বিভিন্ন সবজি পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ও বাজারজাত ব্যবস্থার অভাবে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পান না। যদি সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলা যায়, তাহলে কৃষক যেমন লাভবান হবেন, তেমনি দেশের খাদ্য অপচয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
একইসঙ্গে পাহাড়ে সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলারও সুযোগ রয়েছে। খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প, মাছ সংরক্ষণ শিল্প, ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, বাঁশ ও কাঠভিত্তিক পরিবেশবান্ধব শিল্প কিংবা অর্গানিক কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে উঠতে পারে। এতে স্থানীয় তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়বে এবং পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে।
মৎস্যসম্পদের ক্ষেত্রেও কাপ্তাই লেক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর এখান থেকে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার মেট্রিক টন মাছ আহরণ করা হয়। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি ও গবেষণার অভাবে এই সম্ভাবনার বড় অংশ অপচয় হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লেকভিত্তিক Cage Culture বা খাঁচায় মাছ চাষের মাধ্যমে বিপুল অর্থনৈতিক সফলতা এসেছে। কাপ্তাই লেকে পরিকল্পিতভাবে এই প্রযুক্তি চালু করা গেলে মাছের উৎপাদন বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি মাছ প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তুলে রপ্তানি আয়ের নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি হতে পারে।
কাপ্তাই লেকের আরেকটি বড় সম্ভাবনা হলো পরিবেশবান্ধব পর্যটন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লেককেন্দ্রিক পর্যটন অর্থনীতির বড় ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের এত সুন্দর প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও কাপ্তাই এখনও আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন গন্তব্যে রূপ নিতে পারেনি। অথচ পাহাড়, লেক, বনভূমি এবং বৈচিত্র্যময় পাহাড়ি সংস্কৃতির সমন্বয় কাপ্তাইকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে।
পরিকল্পিতভাবে Eco-Tourism Zone বা “পরিবেশবান্ধব পর্যটন অঞ্চল” গড়ে তোলা গেলে দেশি-বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বহুগুণ বাড়তে পারে। ভাসমান রিসোর্ট, সৌরবিদ্যুৎচালিত পর্যটন কেন্দ্র, ওয়াটার স্পোর্টস, লেক ক্রুজ, পাহাড়ি সংস্কৃতিভিত্তিক পর্যটন, পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পিং জোন এবং আন্তর্জাতিক মানের নৌ-ভ্রমণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। এতে শুধু রাষ্ট্রীয় রাজস্বই বাড়বে না; বরং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষুদ্র ব্যবসা, হস্তশিল্প ও সাংস্কৃতিক অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।
নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নেও কাপ্তাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পার্বত্য অঞ্চলের বহু দুর্গম এলাকায় এখনও নৌপথই প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম। আধুনিক জেটি, ওয়াটার বাস ও সৌরশক্তিনির্ভর ইলেকট্রিক বোট চালু করা গেলে যোগাযোগব্যয় কমবে এবং পরিবেশ দূষণও হ্রাস পাবে। একইসঙ্গে পর্যটন শিল্পের বিকাশেও এটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তবে উন্নয়নের নামে কাপ্তাই লেকের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে পাহাড় কাটা, বন উজাড়, প্লাস্টিক দূষণ, অপরিকল্পিত স্থাপনা এবং পানিদূষণ লেকের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, সেডিমেন্টেশন ও বন ধ্বংসের কারণে ভবিষ্যতে লেকের ধারণক্ষমতা কমে যেতে পারে। ফলে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ কারণে কাপ্তাইকে কেন্দ্র করে যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা হতে হবে পরিবেশসম্মত ও বৈজ্ঞানিক। পুরো লেক জুড়ে অবকাঠামো নির্মাণ না করে অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। মৎস্যসম্পদ, বনাঞ্চল, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নকে শুধু নিরাপত্তা বা প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে হবে না; বরং এটিকে জাতীয় অর্থনীতির কৌশলগত অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কাপ্তাই লেককে কেন্দ্র করে Green Energy Economic Zone বা “সবুজ জ্বালানিভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল” প্রতিষ্ঠা করা গেলে তা দেশের জন্য বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করবে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং বেসরকারি বিনিয়োগকারীরাও এ ধরনের প্রকল্পে আগ্রহী হতে পারে।
বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতি সবুজ জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়নের দিকে এগোচ্ছে। বাংলাদেশ যদি সময়োপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে, তবে কাপ্তাই লেক শুধু একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়; বরং দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য উৎপাদন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার এত বছর পরও কাপ্তাইকে ঘিরে কোনো সমন্বিত মহাপরিকল্পনা গড়ে ওঠেনি। কোথাও বিদ্যুৎ, কোথাও মাছ, কোথাও পর্যটন—কিন্তু সমন্বিত উন্নয়ন ভাবনা অনুপস্থিত। অথচ বিশ্বের উন্নত দেশগুলো তাদের লেককেন্দ্রিক অর্থনীতিকে জাতীয় উন্নয়নের বড় ভিত্তিতে পরিণত করেছে। বাংলাদেশও চাইলে কাপ্তাইকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তুলতে পারে।
এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। বিদ্যুৎ, পর্যটন, কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ, নৌ-যোগাযোগ এবং শিল্পায়নকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে একটি সমন্বিত “কাপ্তাই মহাপরিকল্পনা” গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ পাহাড়ের মানুষের উন্নয়ন ছাড়া কাপ্তাইয়ের উন্নয়ন কখনো টেকসই হবে না।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, পর্যটন শিল্প, খাদ্য উৎপাদন ও পরিবেশগত ভারসাম্যের প্রশ্নে কাপ্তাই লেক এখন আর শুধু একটি আঞ্চলিক সম্পদ নয়; বরং এটি জাতীয় উন্নয়নের কৌশলগত ভিত্তিতে পরিণত হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা ধারণ করছে। দূরদর্শী পরিকল্পনা ও সুশাসনের মাধ্যমে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো গেলে আগামী দিনে কাপ্তাই লেক শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের নয়, সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com
