কার ভুলে কাটা যাচ্ছে এই দুধের শিশুর হাত!

fec-image

কার ভুলে কাটা যাচ্ছে ১১মাস বয়সী এই অবুঝ শিশুর হাত। কী তার অপরাধ! এখনোতো মুখে ঠিকভাবে বুলি ফোটেনি! মা-বাবা ছাড়া অন্য স্বজনরাও এখনো অচেনা। এরমধ্যেই অপারেশন থিয়েটারে জীবনের কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ছোট্ট এই দুধেরশিশু। ভুল চিকিৎসার শিকার শিশু হাফছা এখন ঢাকার শেরে বাংলা নগর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে (পঙ্গু হাসপাতাল) শরীর থেকে একটি হাত কেটে ফেলার অপেক্ষায়। অপর হাতটিও ওই ভুল চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় এখন কার্যক্ষমতা হারা। সে লামার পার্শ্ববর্তী আলীকদম উপজেলার শিবাতলী পাড়ার হাবিবুর রহমানের কন্যা।

হাফছার বাবা হাবিবুর রহমানের অভিযোগ, ঠাÐাজনিত রোগের চিকিৎসার জন্য একমাত্র শিশুকন্যাকে নিয়ে গেছেন লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সদের ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে তার দুধেরশিশু এখন মৃত্যু শয্যায়।

হাবিবুর রহমান জানান, তার শিশুকন্যার হাতে ভুলভাবে কেনোলা লাগিয়ে সেখানেই ভুল ইনজেকশন পুঁশ করে হাসপাতালের কর্তব্যরত নার্স। এরপরই তার হাতটি লালচে বর্ণ ধারণ করে ঠান্ডা হয়ে যায় এবং নাড়াচাড়ার কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এররেশ ধরে এখন অপর হাতটিও আর নাড়তে পারছে না তার কন্যা।

বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ঘটনা চাপা দিতে তড়িঘরি ছাত্রপত্র দিয়ে শিশুটিকে জেলার বাহিরের হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়েছে হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা। এরপর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল, চট্টগ্রামের বেসরকারি ন্যাশনাল হাসপাতাল এবং জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতাল ঘুরে এখন ঢাকার শেরে বাংলা নগরের জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে (তথা পঙ্গু হাসপাতাল) স্থান হয়েছে তার।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিসিৎসক অধ্যাপক নির্মল কান্তি দে পরামর্শ দিয়েছেন এই শিশুকে বাঁচাতে হলে ইনফেকশন হওয়া হাতটি দ্রæত অপরারেশনের (কেটে ফেলা) পাশাপাশি উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। না হলে জীবন নিয়েও শঙ্কা দেখা দিবে। তবে একমাত্র শিশুকন্যার চিকিৎসা ব্যয় কোত্থেকে যোগাবেন তা নিয়ে এখন চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ওই শিশুর বাবা-মা।

হাবিবুর রহমান জানান, গত ৭ অক্টোবর তার কন্যাকে লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভর্তি করানো হয়। ১২ অক্টোবর দিনগত রাতের ডিউটিতে থাকা নার্স অনেক চেষ্টা করেও হাতে কেনোলা স্থাপন করতে পারেননি। পরের দিন ১৩ অক্টোবর সকাল সাড়ে দশটার দিকে দিনের কর্তব্যরত নার্স পারভীন আক্তার হাতের কব্জির রক্ত নালীতে কেনোলা স্থাপন করে একটি ইনজেকশন দেন। বিকেল হতেই ওই হাতটি লালচে বর্ণ ধারণ করে এবং ঠান্ডা হয়ে যায়। ওই অবস্থাতেই রাতের ডিউটিতে আসা অপর নার্স মোকাররমা জান্নাত সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে ফের ইনজেকশন পুঁশ করেন। তবে ওই শিশুর হাতের অবস্থা এবং অসহ্য কান্নার বিষয়টি জানানোর পরও হাসপাতালের কর্তব্যরত কোনো চিকিৎসক ও নার্স কাছে গিয়ে একটু দেখেননি। ২৪ ঘন্টার মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে দূর থেকে এমনটা বলেই দায়িত্ব শেষ করেছেন তারা।

লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সিনিয়র স্টাফ নার্স পারভীন আক্তার জানান, চিকিৎসা সেবায় কোনো ত্রæটি ছিল না। ১৩ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে এদিনের স্থাপনকরা কেনোলার মধ্যে দিয়ে ইনজেকশন পুঁশ করার ৩০-৪০ মিনিট পরই নাকি শিশুটির হাতে এই সমস্যা দেখা দেয়। এরপরই কর্তব্যরত নার্স মোকাররমা জান্নাত সেই কেনোলা খুলে নিয়েছেন। কিন্তু শিশুর অভিভাবকরা আবাসিকের কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সদের সাথে খুবই বাজে ব্যবহার করেন। যার কারণে রাতের কর্তব্যরত চিকিৎসক জুনিয়র কনসালটেন্ট ডাঃ শাহবাজ রোগীকে ছাড়পত্র দিয়ে অন্যকোনো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন। তবে রোগীর অভিভাবকগণ দীর্ঘ গরিমসি করার পর পরের দিন দুপুরের পর রোগীকে চট্টগ্রাম নিয়ে যান। সেখানে নাকি তার হাতের অবস্থা আরও অবনতি হয়েছে যা পরে শুনেছি। তবে এই প্রসঙ্গে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও হাসপাতালের ডিউটি নার্স ইনচার্জ জান্নাতুল ফেরদৌস নিগার এর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি ও শিশু হাফছার অভিভাবকরা জানান, অবুঝ এই শিশুর হাতের অবস্থা অবনতি হওয়ার সাথে সাথে কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সদের জানানো হয়। তবে তারা প্রয়োজনীয় কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বিষয়টিকে অবহেলা করে যান। পরে জানাজানি হওয়ার পর ঘটনা আড়াল করতে ১৪ অক্টোবর দুপুরের পর দ্রæত ছাড়পত্র দিয়ে জেলার বাহিরে নেওয়ার পরামর্শ দেন হাসপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. শাহবাজ। সেখান থেকে ওই রাতেই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করানো হয়। এবার চমেকের কর্তব্যরত চিকিৎসকগণ জানান, শিশুটিকে বাঁচাতে হলে দ্রæত উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন। তারা পরামর্শ দেন চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে নিয়ে যেতে। পরের দিন ১৫ অক্টোবর সকালে সেই হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানকার কর্তৃপক্ষ ভর্তি নেওয়ার কিছুক্ষণ পরই ফের ছাড়পত্র দিয়ে বলেদেন দ্রæত ঢাকায় নিয়ে যেতে। এরপর চট্টগ্রাম ন্যাশনাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় দুইদিন পর ১৮ অক্টোবর ঢাকা জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়েছে। এই হাসপাতাল থেকেও তাকে ছাড়পত্র দিয়ে এবার পাঠিয়েছে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে।

তবে এটিকে নিছক দুর্ঘটনা বলে দায় এড়ালেন লামা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার মহিউদ্দিন মাজেদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ইতিপূর্বে এমন কোনো ঘটনা চোখে পড়েনি। এটিই প্রথম। ডাক্তার মহিউদ্দিন মাজেদের ভাষ্য, কেনোলা ডিসপ্লেস (নির্দিষ্ট স্থান থেকে সরে যাওয়া) হওয়ার কারণে ইনফেকশনে এমনটা হয়েছে। বিষয়টি খুবই মর্মান্তিক।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডাক্তার অং শৈ প্রæ মারমা বলেন, বিষয়টি শুনেছি। লিখিত অভিযোগ পেলে একটি বিশেষজ্ঞ টিম দিয়ে এই ঘটনা আমরা তদন্ত করে দেখবো, নার্সদের যদি কোনো গাফলতি থাকে অবশ্যই বিহিত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

One Reply to “কার ভুলে কাটা যাচ্ছে এই দুধের শিশুর হাত!”

  1. তাড়াতিড়ি হোমিও ডাক্তার দেখান। চৌধুরী ফারুক ইলাহী, এ বি এম শহিদুল্লাহ, বিপুল চৌধুরী আরও ভাল ডাক্তার ঢাকায় আছে ইনাদের দেখান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

6 + nineteen =

আরও পড়ুন