কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে জনপ্রিয় টাইপ মেশিন : বান্দরবানে বেকার টাইপ রাইটাররা

fec-image

সময় পাল্টানোর সাথে সাথে পাল্টে গেছে মানুষের জীবনধারা ও বৈচিত্র্য এসেছে অনেক পরিবর্তন । আর এই বিবর্তনের ধারায় পিছনে পড়ে গেছে একসময়কার জনপ্রিয় সে টাইপ মেশিন গুলো। যেখানে একসময় টিকটক শব্দ হতো টাইপ মেশিন গুলার সে শব্দের সমাহার বর্তমানে তেমন বেশি শোনা যায় না । তথ্যপ্রযুক্তি হার মানিয়ে দিয়েছে এ টাইপ মেশিন কে। তাইতো বেকারত্বের মত অসহায় সময় পার করছে অন্যান্য জেলার মত বান্দরবানের টাইপিস্টরা ।

বান্দরবান জেলা সদরের অবস্থিত জেলা প্রশাসকের কার্যালয় । যেখানে বান্দরবানকে জেলা ঘোষণার পর থেকে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সরকারি কার্যালয় । বিশেষ করে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের পুরনো গেইটে টাইপরাইটার রয়েছে। একটা মেশিন এবং একটা টেবিল নিয়ে বসে থাকেন এসব টাইপ রাইটাররা। হেঁটে যাওয়ার সময় যা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে । দেখতে কম্পিউটারের মত এই জিনিসটি টাইপ মেশিন বলে সবার কাছে পরিচিত।

বান্দরবানে কর্মরত টাইপ রাইটার টিপু বড়ুয়া জানান আজ থেকে দীর্ঘ ত্রিশ বছর আগে আমরা টাইপরাইটাররা এটার উপর প্রশিক্ষণ নিয়েছি কিভাবে এটি টাইপ করতে হবে এবং কিভাবে এটি পরিচালনা করতে হবে , এটির সৃষ্টিকারী কে , কিভাবে এর উৎপত্তি হয়েছে। ক্রিস্টোফার শোলস্‌ নামে একজন যন্ত্র প্রকৌশলী ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে প্রচুর গবেষণা করে প্রথম এই টাইপ রাইটার নির্মাণ করেন এবং এটির উন্নয়নে অনেক কাজ করে পরবর্তীতে তা বাজারজাত করেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন বাসিন্দা ছিলেন ।

বাংলাদেশ সহ অন্যান্য দেশে শোলস্‌ অ্যান্ড গ্লিডেনস্‌ ব্র্যান্ডের প্রথম টাইপরাইটার বাজারজাত করেন ১৮৭৪ সালে। পরবর্তীতে আরেক কোম্পানি বাংলাদেশসহ বিভিন্ন অফিস-আদালতে বাণিজ্যিক পর্যায়ে টাইপ মেশিনের প্রচলন ও বিক্রি শুরু করে। কোম্পানিটির নাম ছিল রেমিংটন রান্ড । পরে ধাপে ধাপে পর্যায়ক্রমিকভাবে বিভিন্ন রকম ক্যাটাগরিতেই টাইপ মেশিন প্রস্তুত করা হয়।

৩০ বছর ধরে চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এর কার্যালয়ের পুরনো গেইট এ কর্মরত প্রবীণ একজন টাইপরাইটার রতন পালিতের সাথে কথা বললে তিনি জানান আমার জীবনের সম্পূর্ণ অর্ধেকটা আমি শেষ করেছি এই টাইপ মেশিনের মাধ্যমে, এখন বৃদ্ধ অবস্থা প্রায় । এই মেশিনগুলোতে টাইপ করতে করতে মেশিনের অক্ষর ক্ষয়ে গেছে। কতদিন , কতযুগ ও বছর পার হয়ে গেছে তার সাক্ষী শুধু আমি নিজে এবং এই ক্ষয়ে যাওয়া টাইপ মেশিন ।এখনো আমরা বসে থাকি এ টাইপ মেশিন নিয়ে। কিন্তু বর্তমানে কম্পিউটার প্রস্তুত হওয়াতে সকল কাজ কম্পিউটারের মাধ্যমে করা হয় আগের টাইপ মেশিনে লেখা হয় না কারন মানুষ দীর্ঘস্থায়ী চিন্তাভাবনা করে। তাই এক প্রকারে বলতে গেলে সকল কর্মরত টাইপরাইটার রেবেকার সময় পার করছে বান্দরবানে । কিন্তু সরকার যদি বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে কোনো চিন্তাভাবনা করতো তাহলে অবশ্যই একসময়কার ঐতিহ্যবাহী টাইপ মেশিন বেঁচে থাকতে বলে আমি মনে করি।

বাতেন রাইটার নামে একজন প্রবীণ বয়োজ্যেষ্ঠ রাইটার জানান আজ থেকে অনেক বছর আগে যেভাবে কাজকর্মও প্রচলিত ছিল এখন আর সেভাবে কোন কিছু নেই । ঘরে বসতে মন টিকে না তাই আমরা মনের টানে এই টাইপ মেশিনের কাছে সব সময় চলে আসি । চুম্বকের মত এই মেশিনটা কে চোখে না দেখলে আমরা দিনের একটা কিছু অপূর্ণ থেকে যায় মনে হয় । কারণ এই মেশিনটা আমাদের সকল টাইপরাইটারের অন্তরের সাথে মিশে গেছে এবং যেটা দিয়ে আমরা আমাদের বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করে যেতাম। বর্তমানে ডিজিটাল প্রযুক্তির বিভিন্ন কম্পিউটার ও অন্যান্য প্রিন্টার্স বাজারে আসার কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে এক সময়কার জনপ্রিয় সে টাইপ মেশিন। তাই আমরা চাই এই টাইপ মেশিন বাঁচিয়ে রাখতে সরকারিভাবে যে কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা হোক।

গোপাল পালিত নামে আরেকজন রাইটার বলেন জেলা পরিষদ অথবা মাননীয় মন্ত্রী বীর বাহাদুর যদি বান্দরবানে কর্মরত টাইপ রাইটারদের আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করতে তাহলে তারা সম্পূর্ণভাবে নতুন উদ্যোগে কাজ শুরু করতে পারত। যেটা তাদের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক উপকার হত।

বান্দরবান পিটিশন টাইপ রাইটার এসোসিয়েশনের সভাপতি র,ক,ম , নুরুল আমিন এর সাথে কথা বললে তিনি জানান আগে বান্দরবানের সকল কাজকর্ম টাইপরাইটাররা করত । তারা পুরাতন অভিজ্ঞ লোক হওয়াতে যেকোনো কাজ নির্ভুলভাবে করত । কিন্তু বর্তমানে সকল টাইপরাইটাররা খুব কষ্টের মধ্যে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। তাই তাদের জীবন মান উন্নয়নে তাদের যন্ত্রপাতি অথবা ল্যাপটপ ও প্রিন্টার কেনার জন্য যদি কিছু আর্থিক সহায়তা প্রদান করে পরবর্তী জীবন ভালোভাবে কাটানোর সুযোগ প্রদান করত তাহলে সকল টাইপরাইটার গন সরকারকে প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন ও সাধুবাদ জানাত। তাই সকল টাইপরাইটারের চাওয়া ডিজিটাল প্রযুক্তির সাথে একত্রিত হয়ে তারা ভালোভাবে কাজ করে যাবে ।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × 3 =

আরও পড়ুন