parbattanews

কেন এই পুশ ইন : কীভাবে ঠেকাবে বাংলাদেশ?

পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট করে বলেছেন, ইতিমধ্যেই ৪৮০০ মানুষকে বাংলাদেশে পুশ ইন করা হয়েছে। তার এই বক্তব্য সঠিক হলে বাংলাদেশের জন্য তা অত্যন্ত খারাপ খবর। অর্থাৎ সীমান্তে আমরা যেটা দেখতে পাচ্ছি তা কেবলই নাটক কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট অবকাশ তৈরি হয়ে গেছে। বিশেষ করে তার এই কথা এমন সময় সামনে এসেছে যখন দিল্লিতে বাংলাদেশ-ভারত বিজিবি ও বিএসএফ ডিজি পর্যায়ের বৈঠক চলমান ছিল। শুভেন্দু অধিকারী এখন আর যে কেউ নন যে তার বক্তব্য উড়িয়ে দেয়া যায়। তিনি বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। তার কথা যদি সঠিক হয় তাহলে অনেকগুলো যৌক্তিক প্রশ্ন তৈরি হয়। আমরা সীমান্তে বিজিবির যে কড়া পাহারা দেখতে পাচ্ছি তা গলিয়ে কীভাবে এই বিপুল পরিমাণ লোক বাংলাদেশে ঢুকে গেল? প্রায় ৫০০০ লোক ঢুকে গেল অথচ বাংলাদেশে কোন টু শব্দ নেই কেন? কেউ কিছুই টের পেল না কেন? সরকার কি বিষয়টা জানতো? তারা কি বাংলাদেশের জনগণের কাছে তথ্যটি লুকিয়েছে?
৫ হাজার লোক ঢোকার পরেও যদি আমরা কিছুই জানতে না পারি, সরকার কোন বক্তব্য না দেয়, তাহলে এভাবেই ৫ লক্ষ বা ৫০ লক্ষ লোক ঢুকে যাবে? সরকার কি আজকের মত সেদিনও জনগণকে কিছুই অবগত করবে না? পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘বাংলাদেশের সীমান্তে বিজিবি সজাগ আছে এবং কোনোভাবেই আমরা এটা অ্যালাউ করছি না।’ তবে শুভেন্দু অধিকারীর এই দাবী সম্পর্কে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোন পক্ষ থেকেই স্বীকার বা অস্বীকার কিছুই করা হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, বিজিবি যদি সজাগ থাকে এবং কোনোভাবেই এলাও না করে তাহলে ৫০০০ লোক ঢুকলো কী করে? শামা ওবায়েদ বলেছেন, ইতোমধ্যেই চেন্নাই থেকে ৩৪ জন নাগরিককে ফেরত আনা হয়েছে। বাকি ৪৭৬৬ জন ঢুকলো কোন পথ দিয়ে? রোহিঙ্গা বিষয়ক পর্যবেক্ষণ অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, শুভেন্দু অধিকারীর এই দাবি অমূলক নাও হতে পারে। অবশ্য এটা হওয়া ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই। এর অনেকগুলো কারণ আছে, যেমন:
১. ভারত জানে তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যাই করুক বাংলাদেশ বর্তমানে তাদের কাউন্টার করার মত যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। প্রমাণ হিসেবে তাদের কাছে রোহিঙ্গা ইস্যু রয়েছে। প্রায় এক দশকে বাংলাদেশ একটি রোহিঙ্গাকে স্বদেশে ফেরাতে পাঠাতে সক্ষম হয়নি। বরং প্রতিনিয়ত রোহিঙ্গারা আসছে স্রোতের মত। কাজেই মাত্র ১৬৮ মাইল যারা সুরক্ষা দিতে পারে না, তারা যে ২৫০০ মাইল পাহারা দিতে পারবে না এটা খুবই স্বাভাবিক।
২. রোহিঙ্গারা সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর সদস্যদের ম্যানেজ করে খুব সহজেই বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। কাজেই একই সীমান্ত রক্ষী বাহিনীকে ম্যানেজ করে ভারতীয়রা ঢুকতে পারবে না এই ভাবনাও অমূলক। সীমান্তে বিজিবির প্রতিরোধের যে সকল ভিডিও আমরা দেখতে পায় তা মূলত টিপ অভ আইসবার্গ। এভাবে প্রকাশ্যে ১০০ ঠেকানো হচ্ছে, কিন্তু গোপনে যে ১ হাজার ঢুকে পড়ছে না সেই গ্যারান্টি কীভাবে দেয়া যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ সীমান্ত চোরা চালানোর কথা বলা যায়। বিজিবি প্রতিদিনই সীমান্তে কিছু না কিছু চোরাচালানি পণ্য আটক করে। কিন্তু এটা প্রকৃত চিত্র নয়। প্রকৃত চিত্র হচ্ছে, নানাভাবে এর কয়েক শ গুণ চোরাচালানি পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।
৩. দেশের মধ্যে বিদ্বেষপূর্ণ রাজনীতির বিরাজমানতা। বাংলাদেশে ব্যক্তি বা দলের স্বার্থে দেশকে বিপদে ফেলার মত ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের অভাব নেই। সরকারকে বিপদে ফেলার জন্য, সরকারকে নামানোর জন্য, নিজের লাভের জন্য, নিজের দলের লাভের জন্য প্রয়োজনে আমরা দেশের ক্ষতি হয়ে যায় এমন কিছু করতেও পিছুপা হইনা। মীরজাফর যেমন দেশ রক্ষার সৈনিক হয়েও এতটাই ক্ষমতা লোভী বা ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়েছিল যে তিনি রাষ্ট্র ও ধর্ম বিরোধী চক্রের সাথে, এমনকি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করার মতো প্রক্রিয়াতেও নিজেকে জড়িত করতে দ্বিধান্বিত হননি।
৪. আওয়ামী লীগের মতো একটি রাজনৈতিক দল দেশে যার কয়েক কোটি সমর্থক রয়েছে, এমনকি সীমান্তেও তাদের বিপুল সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে, এবং প্রায় লাখ খানেক প্রভাবশালী নেতা, সরকারি আমলা, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, গোয়েন্দা সংস্থার কয়েকজন প্রধান, বর্তমানে ভারতের হাতে। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য এটা যে কত বড় হুমকি তা প্রকৃতপক্ষে কখনো বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে না।
৫. ঝড় বৃষ্টির মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ মাথায় নিয়ে আড়াই হাজার মাইল দীর্ঘ সীমান্ত ২৪ ঘন্টা নিশ্ছিদ্র পাহারা দেয়া বিজিবি পক্ষে প্রকৃতপক্ষেই অসম্ভব। অনেক জায়গায় সীমান্ত এতটাই কাছাকাছি যে বাড়িও ভাগাভাগি হয়েছে। অনেক জায়গায় নদী রয়েছে। কাজেই কেবল বিজিবির উপর নির্ভর করে পাহারা দিয়ে এটা আটকানো সম্ভব নয়।
৬. নোম্যান্সল্যান্ডে ঢুকিয়ে দেয়া অনেকের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন ও পরিবারের একাংশ বাংলাদেশে রয়েছে। বাকি অংশ হয়তো দীর্ঘকাল পূর্বে বেচা বিক্রি করে এখান থেকে চলে গিয়েছিল ভারতে এবং সেখানেই নাগরিকত্ব নিয়েছে। নো ম্যানস ল্যান্ডে তাদের দুর্দশা দেখে বাংলাদেশে থাকা আত্মীয়-স্বজন ও পরিবারের বাকি সদস্যরা কোন না কোন ভাবে তাদের দেশের মধ্যে ঢুকিয়ে নিতে পারে এবং পরিচয় গোপন করতে পারে।
৭. বাংলাদেশের ভেতর ঠেলে দেয়া এই সকল মুসলিম জনগোষ্ঠীর নোম্যান্সল্যান্ডে থাকার দুর্ভোগ দেখে সীমান্তের এপারের মুসলিম জনগোষ্ঠী ধর্মীয় কারণেও তাদের সহায়তায় এগিয়ে যেতে পারে। রোহিঙ্গাদের বেলায় আমরা এ ধরনের আবেগ দেখেছি।
৮. স্থানীয় চোরা কারবারিদের সাথে যোগ সাজসের মাধ্যমেও তাদের ম্যানেজ করে অনেকে ঢুকে যেতে পারে।
৯. পতিত সরকারের সীমান্তবর্তী নেতাকর্মীরা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণেও এ কাজে সহযোগিতা করতে পারে।
১০. স্বাভাবিকভাবে মানুষ চলাফেরা ও জীবনযাপনে স্বাধীনতা প্রিয়। তারা কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পে থাকতে পছন্দ করে না। ফলে পশ্চিমবঙ্গে যখন এস আই আর এর মাধ্যমে নাগরিকত্ব থেকে বাদ দেয়া মানুষকে ধরে ধরে কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তখন ক্যাম্প জীবন থেকে রক্ষা পেতে এস আই আর থেকে বাদ পড়া জনগোষ্ঠী নিজে থেকেই নালা কায়দায় বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করতে পারে। অর্থাৎ ভারত চাইছে এস আই আর থেকে বাদ পড়া মানুষের জন্য সেখানে এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে যাতে বাদ পড়া লোকেরা নিজেরাই আতঙ্কিত হয়ে, প্রাণ বাঁচাতে কিংবা নির্যাতন বা আটক হওয়া থেকে রক্ষা পেতে বাংলাদেশে চলে আসতে বাধ্য হয়। এটা তাদের জন্য সবচেয়ে সহজ রাস্তা।
১১. একই পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেতে অনেকে বৈধ ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে ভ্রমণের নামে প্রবেশ করে পুনরায় নাও ফিরে যেতে পারে। ফলে এই মুহূর্তে ভারত থেকে বাংলাদেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরো অত্যন্ত জরুরী।
১২. ভারত বাংলাদেশকে চাপে ফেলার জন্য এবং তাদের অন্যায্য শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করার জন্য এটা করতে পারে।
১৩. শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে পাওয়া অবৈধ ও একতরফা সুবিধাগুলো বহাল রাখা, পদ্মা ব্যারেজ, তিস্তা ব্যারেজ, পাকিস্তান, চায়না ও তুরস্কের মত দেশের সাথে সম্পর্ক শক্তিশালীকরণ, বাংলাদেশকে ভারতীয় রাডারের বাইরে নিয়ে আসার চেষ্টা, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির বিভিন্ন উদ্যোগ যা ভারতকে অস্বস্তিতে ফেলেছে এমন বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের উপর চাপ সৃষ্টি করার লক্ষ্যেও ভারত এ উদ্যোগ নিতে পারে।
১৩. ভবিষ্যতের কোন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও এটা তারা করতে পারে।
১৪. বাংলাদেশ যেন তাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয় সেজন্য নোম্যান্সল্যান্ডে ঢুকিয়ে দেয়া নাগরিকগণ নিজেদেরকে যেন বাংলাদেশী হিসেবে পরিচয় দান করে এ ব্যাপারে তাদের বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করা হতে পারে। এছাড়াও এ সকল নাগরিকরা নিজেরাও যেহেতু বুঝতে পারছে ভারতে তাদের কোন ভবিষ্যৎ নেই, কাজেই বাংলাদেশে থাকার জন্য বা প্রবেশাধিকার পাওয়ার জন্য তারা নিজেরাও নিজেদেরকে বাংলাদেশি পরিচয় দিতে পারে।
১৫. সর্বোপরি ভারতের কেন্দ্রীয় ও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি, বিজেপির অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠার অভিলাষ একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। ভারতের অর্থনীতি কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে নিম্নমুখী। রিজার্ভ ও রূপির মান ক্রমাগত কমছে। মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে। অপারেশন সিন্দুরে পাকিস্তানের কাছে লজ্জাজনক পরাজয়ের পর আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারত ক্রমাগত অবস্থান হারাচ্ছে। এ সকল পরিস্থিতিতে সরকার দেশের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি সরিয়ে নেয়ার জন্য ভারত ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী উন্মাদনাকে বেছে নিয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার জনগণের মধ্যে ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা উসকে দিয়ে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি সরকারি ব্যর্থতা থেকে ঘুরিয়ে দিতে এই পথ বেছে নিতে পারে।
১৬. পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষী মুসলিম ভোটাররা মূলত তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি আস্থাভাজন। সর্বশেষ নির্বাচনেও প্রমাণিত হয়েছে, এস আই আর এর মাধ্যমে বাদ পড়া ভোটাররা যদি ভোট দিতে পারতো তাহলে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়লাভ সম্ভব ছিল না। রাজনৈতিক স্বার্থেই পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি কোনভাবেই চাইবে না বাদ পড়া এই বাংলাভাষী মুসলিম ভোটাররা পুনরায় ভারতীয় জাতীয় ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হোক। ফলে এদের ব্যাপারে তাদের সামনে আর একটি অপশন থাকে তা হচ্ছে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া।
সব মিলিয়ে ভারত চাইবে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর থেকে বাদ পড়ার ৯১ লক্ষ নাগরিকের পুরোটা বা সিংহভাগ বাংলাদেশকে গ্রহণ করতে হবে। তবে এখানেই থামবে না বিষয়টি। আসাম এবং ত্রিপুরার কথা ভুলে গেলে চলবে না। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এভাবে চললে কয়েক কোটি বাংলা ভাষী মুসলিমকে ফেরত নেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। কেবল বাংলাভাষী মুসলিম নয় ভারত তার দেশে থাকা রোহিঙ্গা মুসলিমদেরকেও বাংলাদেশে ফেরাতে চায়। এদিকে সৌদি আরব সেদেশে থাকা ৬৫ হাজার বাংলাদেশী পাসপোর্টধারী রোহিঙ্গা নাগরিককে ফেরত নেয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে প্রবল চাপ প্রয়োগ করে আসছে। সম্প্রতি এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে মালয়েশিয়ার নাম। মালয়েশিয়া সে দেশে থাকা বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গা নাগরিককে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আলোচনা শুরু করেছে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত মালয়েশিয়া সফরকে ঘিরে এই আলোচনা পুনরায় সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ভঙ্গুর গণতন্ত্র ও পররাষ্ট্রনীতি, দুর্বল সামরিক সক্ষমতা এবং বিবদমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন দেশে থাকা বিপুল পরিমাণ বাংলাভাষী মুসলিম ও রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার একটি চক্রান্ত চলছে। তবে এটি কেবল জনসংখ্যাগত সমস্যা নয়। এর পেছনে রয়েছে বর্তমান আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক নানা সমীকরণের গভীর হিসেব নিকাশ। এমনিতেই পরাশক্তি সমূহের ইন্দোপ্যাসিফিক ভূ-রাজনীতি ও চায়না ঠেকাও নীতিতে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভরকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সে সময়ে দেশের জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের এই আন্তঃরাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সরকার, রাজনৈতিক দলসমূহ, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যমে যদি যথেষ্ট সচেতন ও ঐকমত্য না থাকে তাহলে আসন্ন সংকট মোকাবেলা কঠিন হয়ে পড়বে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘বাংলাদেশে যদি ভারতীয় কোনো ইল্লিগ্যাল সিটিজেন থাকে বা ভারতে যদি বাংলাদেশের কোনো ইল্লিগ্যাল সিটিজেন থাকে, তাদেরকে ফেরত আনাটা আমাদের ভারতীয়দের ফেরত দেয়ার একটি মেকানিজম বিদ্যমান আছে। সেই বিদ্যমান মেকানিজমটা, ডিপ্লোমেসিটা অবলম্বন করেই ভারতকে আমাদের সাথে কাজ করতে হবে এবং কথা বলতে হবে এবং বাংলাদেশও সেটা করবে। আমরা যতরকম ডিপ্লোমেটিক নর্ম আছে আমরা সেটা ফলো করছি।’ এই ডিপ্লোম্যাটিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতকে ১২-১৩ টা চিঠি দিয়েছেন বলে তিনি দাবি করেছেন। কিন্তু ভারত এ সকল চিঠির কী উত্তর দিয়েছে, বা আদৌ কোন উত্তর দিয়েছে কিনা সে ব্যাপারে তিনি কিছুই বলেননি।
প্রশ্ন হচ্ছে, ভারত যদি এ সকল চিঠির উত্তর না দেয়, যদি প্রচলিত ডিপ্লোম্যাটিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে, এভাবেই সীমান্তে পুশ ইন বহাল রাখে তাহলে বাংলাদেশের করণীয় কী? পুশ ইন ঢাকাতে গিয়ে বিভিন্ন জায়গায় বিজিবি ও বিএসএফ যেভাবে মুখোমুখি হয়ে যাচ্ছে এটা বিপদজনক প্রক্রিয়া। এ ধরনের পরিস্থিতি যেকোনো সময় দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে খণ্ড যুদ্ধের বা দুই দেশের সীমান্তে বসবাসকারী নাগরিকদের মধ্যে সংঘর্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে, যা কারো কাম্য নয়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের করণীয় নিম্নরূপ:
১. সীমান্তে তাৎক্ষণিক পুশ ইন ঠেকাতে বিজিবিকে সর্বোচ্চ সর্তকাবস্থায় রাখা। বিজিবির কোন অসৎ কর্মকর্তা অর্থের বিনিময়ে চোরাচালানি পণ্যের অনুপ্রবেশে সহায়তার মত করে ভারতীয় পুশ ইন করা নাগরিকদের বাংলাদেশে প্রবেশে যেন সহায়তা না করে সে ব্যাপারে নজরদারি রাখা।
২. সীমান্তের চোরাচালানিরা যেন এই সুযোগে অর্থের বিনিময়ে পুশ ইন করা নাগরিকদের বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দিতে না পারে সে ব্যাপারে কঠোর নজরদারি করা।
৩. পুশ ইন ঠেকাতে সীমান্তবাসীদের নিয়ে নাগরিক কমিটি করে দেয়া এবং বিজিবির সাথে সমন্বয় করা।
৪. তবে সীমান্তে এই সমস্যার স্থায়ী কোন সমাধান নেই। এর স্থায়ী সমাধান কেবলমাত্র কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে সম্ভব। সে কারণে কূটনৈতিক উদ্যোগগুলোতে সর্বোচ্চ জোর দেয়া।
৬. দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, ওআইসি সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে এই ইস্যুটি জোরালোভাবে তুলে ধরা। ভারত যেভাবে পুশ ইন করছে তা সকল আন্তর্জাতিক আইনের বিরোধী। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে বাংলাদেশ নৈতিক সমর্থন পাবে সন্দেহ নেই।
৬. বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টি খুব বড় আকারে সামনে না এলেও উপরের আলোচনা থেকে এটা পরিষ্কার হয়েছে যে এটি আগামী দিনে একটি বড় সমস্যায় পরিণত হতে চলেছে বাংলাদেশের জন্য। ফলে এই সমস্যা সমাধানের জন্য দেশের মধ্যে জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে সরকার, বিরোধীদল সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, কূটনৈতিক, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা। এই কমিটির মাধ্যমে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হওয়া।
৭. ভারত যদি বাংলাদেশের উদ্বেগকে ক্রমাগত উপেক্ষা করে তাদের আগ্রাসনীতি বহাল রাখে তাহলে বাংলাদেশে বৈধ ও অবৈধভাবে বসবাসকারী ভারতীয় নাগরিক ও চাকুরিরতদের বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
৮. ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় প্রত্যন্ত এলাকার নাগরিক পরিচয় পত্র নিয়ে যে সমস্ত নাগরিক সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে নিয়োগ পেয়েছে তাদের প্রকৃত নাগরিকত্ব অনুসন্ধান করা।
৯. সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশে ভারতীয় পণ্য বর্জনের আন্দোলন শুরু করা। ইতোমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে, ভারতীয় পণ্য ছাড়া বাংলাদেশ চলতে সক্ষম। ভারত ভিসা বন্ধ করে দেয়ার পর বাংলাদেশে কোন নাগরিকের চিকিৎসা সংকট হয়নি। কিন্তু ভারতের অনেক হাসপাতাল রোগী সংকটে ভুগেছে। অসংখ্য রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়েছে। পর্যটন খাতে আয় ব্যাপকভাবে কমে গেছে। সীমান্তবর্তী প্রদেশগুলোর শপিং সেন্টারগুলো ক্রেতা শূন্যতায় ভুগেছে। কিন্তু আমরা এসংক্রান্ত কোন সমস্যায় পড়িনি। ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করার পর বাংলাদেশে পেঁয়াজের সংকট হয়নি। কিন্তু ভারতীয় পেঁয়াজ চাষী ও ব্যবসায়ীরা রাস্তায় পেঁয়াজ ঢেলে প্রতিবাদ করেছে। চাল রপ্তানি বন্ধ করার পর এদেশে খাদ্য সংকট হয়নি। কাজেই এটা প্রমাণিত যে, অর্থ থাকলে আমরা ভিন্ন উৎস থেকেও ভারত থেকে আমদানি করা পণ্য সংগ্রহ করতে পারব। কিন্তু সীমান্তের এত কাছে এত বিশাল বিকল্প বাজার ভারত খুঁজে বের করতে পারবে না।
১০. অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা।
১১. সীমান্তে একটা ভয়ানক প্রবণতার লক্ষ্য করা যাচ্ছে, বর্তমানে সীমান্তে দুই দেশের নাগরিকদের মধ্যে যে মুখোমুখি অবস্থান কি হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায় এটা কঠোর ভাবে দমন করা প্রয়োজন। কোনভাবেই বাংলাদেশের নাগরিকদেরকে সীমান্তের কাছাকাছি যেতে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত হতে পারে না। সীমান্ত পাহারায় বিজিবি সহায়তায় সাধারণ জনগণের সাথে সমন্বয়ের প্রয়োজন আছে এটা স্বীকার করেই বলছি, তাদেরকে একটি নির্দিষ্ট সীমারেখার ভেতরে থাকতে হবে। কিন্তু বর্তমানে যেভাবে তারা কাঁটাতারের পাশে গিয়ে ভারতীয় নাগরিকদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে তার পেছনে কোন গভীর অভিসন্ধি লুকিয়ে থাকতে পারে যা দুই দেশের মধ্যে খন্ড যুদ্ধের কারণ তৈরি করতে পারে। এমনকি এটা সে ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টির লক্ষ্যেও তৈরি করা হতে পারে।
১২. আজ দেখলাম বাংলাদেশী নাগরিকরা সীমান্তের পাশে ভারতীয়দের ধাওয়া দিয়ে তাদের জমিতে প্রবেশ করে ফসল তুলে ক্যামেরার সামনে উল্লাস করছে। এটা যে কত বড় ভয়ানক ও বিপদজনক ব্যাপার তা হয়তো তাৎক্ষণিক আবেগে তারা বুঝছে না। কিন্তু বিজিবির বোঝা উচিত ছিল। বাংলাদেশের নাগরিকগণ যদি মব তৈরি করে ভারতীয় সীমান্তে প্রবেশ করে এবং ভারতীয়রা গুলি করে সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বলার জায়গা থাকবে না খুব একটা। সরকারের প্রতি আহ্বান, এ ধরনের প্রক্রিয়া বন্ধে কঠোর হস্তে পদক্ষেপ গ্রহণ করা। কেননা এই প্রক্রিয়া বন্ধ করতে না পারলে, এ ধরনের ঘটনা ক্রমাগত চলতে থাকলে কোন চক্রান্তকারী গোষ্ঠী পেছন থেকে ইন্ধন দিয়ে এ ধরনের মব সৃষ্টি করে কাঁটাতারের বেড়াও কেটে ফেলার উস্কানি দিতে পারে। তাৎক্ষণিকভাবে উত্তেজিত মানুষ এই উস্কানিতে উত্তেজিত হয়ে কাঁটাতারের বেড়া কাটতে চলে গেলে ভারত যদি তাদের উপর গুলি শুরু করে তাহলে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে সহজেই অনুমেয়। এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য দেশের ভেতরে ও বাইরে থেকে কোন মহল উস্কানি দিচ্ছে কিনা সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে খতিয়ে দেখার অনুরোধ করছি। আন্তর্জাতিক সীমান্ত হাসিনার গণভবন নয়, সেটা তাদের বোঝাতে হবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কেবল আইন ও কনভেনশন দিয়ে নির্ধারিত হয় না। বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালে ভুরিভুরি নজির পাওয়া যাবে, আন্তর্জাতিক আইন ও কনভেনশনগুলো কেবলমাত্র দুর্বল রাষ্ট্রের উপর আপতিত হচ্ছে এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো থোড়াই কেয়ার করে যাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে বর্তমান বিশ্বে পারস্পরিক স্বার্থ ও সক্ষমতাই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নির্ধারণের নিয়ামক হয়ে উঠেছে। প্রায় ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বিনির্মাণে বাংলাদেশকে যত বেশি সম্ভব বার্গেইনিং এজেন্ট, পয়েন্ট বা কার্ড তৈরি করতে হবে। সম্প্রতি ইরান বিশ্বের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে, ঐক্যবদ্ধ দেশপ্রেমিক জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বড় বার্গেনিং কার্ড। বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের যুদ্ধবদ্ধ শক্তি, সাহস ও দেশপ্রেম আমাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। সরকার যদি জাতীয় ইস্যুতে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে তাহলে যে কোন সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশ সক্ষম হবে।
লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক, সম্পাদক পার্বত্যনিউজ।
Exit mobile version