হরমুজের যুদ্ধ এক অর্থে শুরু হয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- Who is going to win the battle of Hormuz? (হরমুজ প্রণালীর যুদ্ধে কে জয়ী হতে যাচ্ছে?) এই উত্তর জানার আগে বরং প্রশ্ন করতে হবে- এই যুদ্ধটা এখন শুরু হলো কেন?
ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক ত্রিটা পার্সি আজ বলেছেন- আমেরিকা তাদের পরাজয় উল্টে দেওয়ার চেষ্টা করছে। অর্থাৎ ৩৯ দিনের অল-আউট যুদ্ধে অ্যামেরিকা যেহেতু পরাজিত হয়ে চুক্তি ( ঠিক চুক্তি না, MOU) করেছে। যেটাকে প্রায় সকল বিশ্লেষক অ্যামেরিকার পরাজয় হিসেবে দেখেছে। এখন ট্রাম্প সেই পরাজয় পাল্টে দিয়ে নতুন করে জয়ী হতে চাইছে হরমুজ দখলে নেয়ার মাধ্যমে।
এর মাঝে গতকাল এবং আজ অ্যামেরিকা ইরনের বেশ কয়েক জায়গায় হামলা করেছে। ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে অ্যামেরিকান ঘাঁটি সহ অনেক জায়গায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। গতকাল ট্রাম্প বলেছিল- We will take control of the Strait of Hormuz and charge a 20% toll (আমরা হরমুজ দখল করে ২০% টোল নেব।)
এরপর দেখি অ্যামেরিকান সংবাদ মাধ্যম সিএনএন-এর কলামিস্ট ডেভিড গোল্ডম্যান এবং হানা মিলে একটা কলাম লিখেছে। সেই কলামের শিরোনাম হচ্ছে-The war with Iran has become a battle about a tollbooth. Free seas are at risk ( ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এখন টোল আদায়ের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। মুক্ত সমুদ্রপথ এখন ঝুঁকির মুখে।)
এরপর এই দুই কলামিস্ট নানান সব হিসাব করে দেখিয়েছেন- অ্যামেরিকা এভাবে টোল নিলে পৃথিবীর অর্থনীতি খারাপ হয়ে যাবে ইত্যাদি। এরপর দেখি ট্রাম্প ঘোষণা করেছে- আমরা টোল নেব না!
তার এই ঘোষণার পর নরওয়েজিয়ান ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক গ্লেন ডাইসেন বলেছেন- Trump says one thing one day and the opposite the next. Does anyone still believe him? ( ট্রাম্প একদিন যা বলে পরের দিনই সেটা উল্টে যায়। ওকে কি কেউ বিশ্বাস করে?)
তার এই কথার উত্তরে ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিক পেপ এস্কোবার বলেছেন- একদিন!! বলছো কি! বলো এক সেকেন্ডে যা বলে পরের সেকেন্ডেই সেটা উল্টে যায়। তবে ট্রাম্প এমনি এমনি এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে নাই। এস্কোবার জানিয়েছে- মধ্যপ্রাচ্যের সকল দেশ ট্রাম্পের এই ঘোষণায় অবাক হয়েছে। কারন তাঁদের কিছুই জানানো হয় নাই। এ জন্য সৌদি, কাতার সহ অন্যান্য দেশগুলো ট্রাম্পকে চাপ দিয়েছে।
যা হোক, এই মুহূর্তে হরমুজ দুই দিক থেকেই বন্ধ। ইরান কোন জাহাজকে এই পথে যেতে দিচ্ছে না। আর অ্যামেরিকা ইরানের জাহাজগুলোকে যেতে দিচ্ছে না। ব্রিটিশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র জানিয়েছে- হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল এখন খুবই সীমিত। দিনে দুই-একটা জাহাজ চলাচল করছে কিংবা করছেই না!
এই অবস্থায় হরমুজের যুদ্ধে কারা জয়ী হতে চলেছে?অ্যামেরিকান এনবিসি নিউজের সাংবাদিক রিচার্ড এঞ্জেল দিন কয়েক আগে খামেনির শেষ অনুষ্ঠান কাভার করতে ইরানে গিয়েছিলেন। তিনি আজ জানিয়েছেন- ইরানের বিরোধী দলের মানুষজন কিংবা সরকার বিরোধী মানুষরাও সবাই এক হয়ে গেছে এই যুদ্ধে।
এরপর তিনি বলেছেন- অথচ পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো ইরান দুর্বল এটা দেখানোর জন্য ইরানের অমুক নেতা গৃহবন্দী হয়েছে; আইআরজিসি আর সরকারের মাঝে বিরোধ আছে এইসব খবর প্রচার করছে।
রিচার্ড এরপর বলেছেন- ইরানে আমাকে কোন বিধি নিষেধ দেয়া হয় নাই। আমি নির্বিঘ্নে রিপোর্ট করতে পেরেছি। নিশ্চিত করে বলতে পারি- ইরানিরা এখন আগের চাইতে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ এবং শক্তিশালী। এদিকে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবার্ট পেপকে আজ জিজ্ঞেস করা হয়েছে
-কে জিতবে হরমুজের যুদ্ধে?
তিনি বলেছেন- It’s like the Titanic. You know the iceberg is there, yet you still sail straight into it. ( এটা টাইটানিকের মতো। সামনে হিমশৈল আছে জেনেও সোজা গিয়ে আপনি সেটাতেই ধাক্কা খাচ্ছেন)। অর্থাৎ তিনি টাইটানিক বলতে সাম্রাজ্যবাদী অ্যামেরিকাকে বুঝিয়েছেন। সে জানে যে পরাজিত হবে। তবুও পরাজয়ের দিকেই ধাবিত হচ্ছে। কেন অ্যামেরিকা পরাজিত হবে জানেন?
কারণ ট্রাম্প আগেই বলে রেখেছে- অ্যামেরিকার হাতে চার সপ্তাহের তেল রিজার্ভ আছে। এটা তো সে আরও দুই সপ্তাহ আগেই বলেছে। তবুও আপনি আজকে থেকেই ধরেন। এখন ট্রাম্প বলছে- আমরা খুব দ্রুতই এটা (হরমুজের যুদ্ধ) শেষ করবো। খার্গ দ্বীপ দখল করবো এবং হরমুজ নিয়ন্ত্রণে নেব।
এবার আপনাদের দেই মূল তথ্যটা। ইরান যুদ্ধ শুরু হবার পর নিউইয়র্ক টাইমস পেন্টাগনের বরাত দিয়ে জানিয়েছিল- হরমুজ দখলে নিতে অ্যামেরিকার অন্তত ছয় মাস সময় লাগবে।
হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। গিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসের এপ্রিল মাসের রিপোর্ট পড়ে আসুন। অর্থাৎ অ্যামেরিকার সামরিক বাহিনী মনে করছে- অন্তত ছয় মাস লাগবে।
তবে সেটাও নিশ্চিত না। মানে অ্যামেরিকা যদি সকল শক্তি দিয়ে চেষ্টা করে আরকি। হয়ত ছয় মাসে দখলে নিতে পারবে। কিন্তু দখল টেকসই হবে কিনা সেটা পরের বিষয়। টেকসই যে হবে না, সেটা তো সবারই জানা। কারন এরপর ইরান ওই সব জায়গায় হামলা করবে।
তবুও ধরে নিন ছয় মাস লাগবে হরমুজ দখলে নিতে। আর ট্রাম্পের হাতে সময় কত আছে?
সর্বোচ্চ চার সপ্তাহ। সেটাও আসলে নাই। নইলে পৃথিবীর অর্থনীতি ধ্বসে পড়বে। অর্থাৎ এই হরমুজের যুদ্ধেও ট্রাম্প পরাজিত হতে যাচ্ছে। অ্যামেরিকান সামরিক বিশেষজ্ঞ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক উপদেষ্টা কর্নেল ম্যাক গ্রেগর আজ বলেছেন- ট্রাম্প সর্বোচ্চ ১০ দিন থেকে দুই সপ্তাহ চেষ্টা করবে। এরপর হরমুজ থেকে ট্রাম্পকে ফিরে যেতে হবে।
হিসাব তো আমিই দেখিয়ে দিয়েছি। ইরানে অ্যামেরিকার আর পাবার কিছু নেই। ট্রাম্প প্রথম পরাজয় উল্টে দিয়ে হরমুজে এসেছে নতুন করে জয়ী হতে। এখন এই হরমুজেই সাম্রাজ্যবাদী অ্যামেরিকার দ্বিতীয় পরাজয় হবে।
লেখক : ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষক। উৎস : লেখকের ফেইসবুক পোস্ট
