খাগড়াছড়িতে বেড়েছে দেশীয় মুরগীর উৎপাদন

_2260627824

দুলাল হোসেন,খাগড়াছড়ি॥
 দেশে প্রতি বছরই বাড়ছে মানুষ। বাড়ছে বাড়ি-ঘর, অফিস-আদালত, শিল্প কলকারখানা। কমছে চাষ যোগ্য জমি। ক্রমবর্ধমান মানুষের ভবিষ্যত খাদ্য চাহিদাসহ অন্যান্য আনুষাঙ্গিক চাহিদা মেটানোর জন্য সরকারের পদক্ষেপের শেষ নেই। সরকারকে লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা।

ঠিক তেমনি আন্তর্জাতিক সংস্থা ডানিডা ও  ই ইউ’র সহযোগিতায়  খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ জেলার নয় থানায় ”কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্প” বাস্তবায়ন করছে। সংস্থাটি প্রথমে দেশীয় উদ্ভাবিত স্বল্প খরচের ছোট-ছোট আধুনিক প্রযুক্তি বা পদ্ধতি গ্রহন করছে। তার পর তা প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে ছড়িয়ে দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। স্থানীয় মাংসের চাহিদা পুরনের লক্ষ্যে সংস্থাটি বেশী করে দেশীয় মুরগীর বাচ্চা উৎপাদনের লক্ষ্যে উমে বসা মুরগী পালনের উপর একটি পদ্ধতি হাতে নিয়েছে। বিনা খরচে তৈরি করা এই পদ্ধতি ব্যাবহার করে গত আড়াই বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে দেশীয় মুরগীর উৎপাদন বেড়েছে। দেশীয় মুরগীর মাংসের স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে প্রতিমাসে অতিরিক্ত প্রায় ৩০ হাজার কেজি  মুরগী রপ্তানী হচ্ছে আশে-পাশের জেলাগুলোতে। নিজেদের মাংসের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আর্থিকভাবেও লাভবান হচ্ছেন কৃষকেরা। ।

অনুসন্ধানে জানা যায়,১৯৯১ সালে খাগড়াছড়ি জেলায় পরিবার সংখ্যা ছিল ৭০, ৮৯১ আর মুরগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ লক্ষ, ২০০১ সালে পরিবার সংখ্যা বেড়ে দাড়ায় ১.০৯,১৯০ আর মুরগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৫ লক্ষে, ২০১১ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায় পরিবার সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১,৩৩,৭৯২ আর দেশীয় মুরগীর  উৎপাদন বেড়ে দাড়িয়েছে প্রায় ৭ লক্ষে। জনসংখ্যার সাথে পাল্লা দিয়ে দেশীয় মুরগীর সংখ্যা বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বেশী অবদান খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ কর্তৃক চলমান ”কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্পের”। বিগত ২০১০ সালের ১লা জুলাই থেকে স্থানীয় পাহাড়ি ও বাঙ্গালীদের খাদ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ এ পর্যন্ত জেলার ২১৪টি গ্রামে স্থাপন করেছে কৃষক মাঠ স্কুল। আর এসব স্কুলের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত করে তোলা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কৃষককে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা   ইউএনডিপি’র অর্থায়নে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ কৃষকদেরকে জেলার প্রতি ইঞ্চি জায়গা ব্যাবহারের পাশাপাশি স্বল্প খরচের বিভিন্ন প্রযুক্তি, বিভিন্ন পদ্ধতির উপর প্রকল্প বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে – উমে বসা মুরগীর পালন ব্যাবস্থাপনা, ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র, খামারজাত সার প্রস্তুত, কুমড়া জাতীয় ফুলের হাত পরাগায়ন,বীজ শোধনও সংরক্ষনসহ নানা প্রযুক্তি। তবে উমে বসা মুরগীর পালন ব্যাবস্থাপনা জেলার জনপ্রিয়তা পেয়েছে। জেলার সব জায়গায় এখন এই প্রযুক্তি ব্যাবহার হচ্ছে । প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান শুধু মাটি দিয়ে তৈরি করা হয় মুরগীর ডিমে তা দেওয়ার পাত্রটি। শুধু মাটির তৈরি এই পাত্রটিতে এক পাশে একটি ছোট খাবারের পাত্র থাকে। আরেকপাশে থাকে একটি পানির পাত্র । ফলে উমে বসা মুরগীটিকে খাবারের জন্য বাইরে যেতে হয়না। যার ফলে ডিমে পর্যাপ্ত তা দেওয়ার পাশাপাশি মা মুরগীর ওজনও ঠিক থাকে। উমে বসানোর আগে প্রথমে পাত্রটিতে দুই ইঞ্চি পরিমান ছাঁই দেওয়া হয়। তার পর নেপথলিন দেওয়া হয় যাতে উমে বসা মুরগীর পাত্রে কোন পোকা-মাকড়ের জন্ম না হয়। তার পর মাটির পাত্রটির চারদিকে খড় দেওয়া হয়। এর পর ডিম দিয়ে মা মুরগীটিকে বসানো হয়। এরফলে একদিকে যেমন ডিম নষ্ট হয়না, অন্যদিকে দেশীয় মুরগীর বাচ্ছার উৎপাদনও হয় বেশী । পুরাতন পদ্ধতিতে কৃষকেরা ১৫-১৬টি ডিম তা বা উমে দেওয়ার জন্য দিত। কিন্তু মুরগী খাবার ও পানি খাওয়ার জন্য প্রতিদিন বাইরে যাওয়ার ফলে তা বেশী দিতে পারতনা, তাছাড়া অনেক সময় উমে বসার পাত্রটি কাত হয়ে পড়ে ডিম ভেংগে যেত। ফলে মা মুরগী ৮-১০টির বেশী বাচ্চা ফোটাতে  পারতো না।

কিন্তু নতুন পদ্ধতিতে মা মুরগী বেশীরভাগ সময় ডিমেই তা দেয়। খাবারও পানির জন্য বাইরে যেতে হয়না। যদি কোন কারনে মা মুরগী বাইরে যায়ও তাহলেও পাত্র পড়ার ঝুঁকি থাকেনা, ডিম ভাংগার সম্ভাবনাও থাকেনা। যার ফলে ১৫-১৬টি ডিমের প্রত্যেকটিতে মা মুরগী সমানভাবে তা দিতে পারে এবং বাচ্চা ফোটাতে পারে। মাটির তৈরি পাত্র অনায়াসে ঘরের যেকোন স্থানে বসানো যায় । জেলার প্রায় প্রতিটি এলাকায় এই পাত্র ব্যাবহার করে উপকৃত হচ্ছে কৃষকেরা। নতুন এই পদ্ধতি ব্যাবহার করার ফলে আগের চেয়ে মুরগীর উৎপাদন অনেক বেশী । প্রতিদিন খাগড়াছড়ি জেলা থেকে গড়ে ১০০০ কেজী দেশীয় মুরগী যাচ্ছে আশে পাশের জেলাগুলোতে।
 ব্যাবসায়ীরা বলেন স্থানীয় মুরগীর মাংসের চাহিদা মিটিয়ে মুরগী রপ্তানি হচ্ছে আশে-পাশের জেলাগুলোতে এতে খাগড়াছড়ি জেলার দরিদ্র মুরগী চাষীদের পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরে আসছে।

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের খাদ্য ও নিরাপত্তা প্রকল্পের জেলা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজান আলী
 বলেন এ প্রকল্পের মাধ্যেমে প্রাপ্ত প্রশিক্ষন কাজে লাগিয়ে কৃষকরা বেশ উপকৃত হচ্ছে ।এ প্রকল্প প্রতিটি পাহাড়ের প্রতিটি পরিবারে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
বিনা খরচে, শুধু মাটি দিয়ে তৈরি করা পাত্রটি ব্যাবহার করে-মা মুরগীর মাধ্যমে বেশী বেশী দেশীয় মুরগীর বাচ্চা উৎপাদন করার আধুনিক পদ্ধতিটি ছড়িয়ে পড়ুক দেশের প্রতিটি কৃষক পরিবারে-এই প্রত্যাশা সকলের।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × one =

আরও পড়ুন