গন্তব্য

শাহজালাল

[ ছোটগল্প/ আরাকানের সত্যঘটনা অবলম্বনে ]

বেলা শেষ, দীপ্তিময় সূর্য ঘুমিয়ে পড়েছে। পাড়া গ্রাম মহল্লা নিস্তব্দ, ঘর বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। কয়েকটা বাড়ি এখনো আছে। মানুষশূন্য বাড়িঘর সন্তানহারা মায়ের মত আহাজারি করছে। নারী-পুরুষ সন্তান নিয়ে গন্তব্যহীন পথে যাত্রা করেছে। আমি বুড়ো মানুষ কোথায় যাবো? আমি গন্তব্যহীন পথে যাত্রা করতে পারি না। জানি, আমার গন্তব্য! গন্তব্য আমার মৃত্যু, মৃত্যু আমায় ডাকছে। আমি আজরাইলের অপেক্ষায় আছি।

মাগরিবের নামাজ পড়ে প্রদীপ জালিয়ে লিখতে বসেছি। অনেকদিন কিছু লেখা হয় না। আজ খুব মায়ের কথা মনে পড়ছে। খুব ইচ্ছে করছে মায়ের কোলে মাথা রেখে শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ি। না, মা এই সুন্দর পৃথিবীর নরকবাস থেকে বিদায় নিয়েছেন। আমার মত বুড়োর মুখে মায়ের কোলে থাকা নিয়ে আশ্চর্য হচ্ছেন? আমিও দেশ ছেড়ে ভিন দেশে পালিয়ে যেতাম। জীবনের মায়া সবার আছে, আমারও। কিন্তু কেন যাবো? এই দেশে আমার জন্ম। বাবা মা ভাই বোন সবাই এই দেশে জন্মেছে। যারা গত হয়েছেন তারাও এই দেশের মাটিতে, কবরস্থ হয়েছেন এইখানে। আমিও এই দেশের মাটিতে মিশে যেতে চাই।

আজ কেমন যেন অন্য রকম লাগছে ! নিঃশ্বাস বন্ধ হলে হতো, হচ্ছে না। পোড়া লাশের গন্ধ সহ্য করতে পারছি না। বাতাসের সাথে মিশে থাকা আর্তচিৎকার শুনতে পাচ্ছি, “বাঁচাও! বাচাও”। নারী পুরুষের চিৎকার নয়। শিশুর চিৎকার ”মা মা” ডাক শুনতে পাচ্ছি। হে রাহমানুর রাহিম আমাকে মুক্তি দাও। আমাকে রহম করো, আমি আর পারছি না।

ক্ষাণিকবাদে দরজা ধাক্কানোর শব্দ হলো। মৃত্যু এসে গেল বুঝি। খুশিতে আত্মহারা হয়ে দরজা খুলে দিলাম। দরজা খুলে দেখতে পাই কয়েকজন মিলিটারি। তাদের চোখে মুখে খুনের নেশা। মুখ দিয়ে মদের গন্ধ বের হচ্ছে। কারো কারো শরীর দোল খাচ্ছে। আমাকে টেনে হিঁচড়ে উঠানে বের করে প্রশ্ন করলো, “কার জন্য অপেক্ষা করছিস?” আমি উত্তরে বললাম, “মৃত্যুর জন্যে।”

আমার উত্তর শোনার পর বেয়োনেট দিয়ে খোঁচাতে খোঁচাতে অট্টহাসি দিল সবাই। আমি কালিমা পড়তে লাগলাম। তারা আমায় বলতে লাগলো, “আজ তোর প্রাণ বাঁচানোর কোন ক্ষমতা নেই তোর আল্লাহর। আমাদের আল্লাহ ডাক প্রাণ ভিক্ষা চা। আমরা তোর প্রাণ ভিক্ষা দেব।’

‘না, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছি আমাকে যেন এই পৃথিবী থেকে মুক্তি দেয়। আমার ফরিয়াদ কবুল হলে নিশ্চয় আমি মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গন করতে পারবো। আর হ্যাঁ, প্রাণভিক্ষা তিনি দিতে পারেন, যিনি প্রাণ দিতে পারেন। সে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নন।

’ আমার কথা শেষ না হওয়ার পূর্বেই কপালে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দেয় ওরা। পা দিয়ে আমায় সোজা করে মুখে থুথু দেয়। বেয়োনেট দিয়ে খোঁচাতে খোঁচাতে হাসতে থাকে। আমি চোখ বন্ধ করে সহ্য করতে লাগলাম। আল্লাহ আমার সব গুনাহ বুঝি আজ মাফ করতে চলেছেন। মুখ দিয়ে ‘উ’ শব্দও করছি না আমি। শুধু একটা বুলেটের অপেক্ষা করছি চোখ বন্ধ করে । খোঁচানো বন্ধ করলো ওরা। ভেবেছি এই বুঝি বুলেটের আঘাতে কপাল ফুটো করে দেবে, কিন্তু না। তারা প্রস্থান করে।

তাদের যাওয়ার পর বারবার একটা কথা মনে পড়ছে। প্রয়োজনের সময় কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রয়োজন ফুরালে চোখের সামনে গড়াগড়ি করে। কত মানুষ বাঁচার জন্য চেষ্টা করেছে, কিন্তু বাঁচতে পারেনি। আমি শুধু একটা মাত্র বুলেট চেয়েছিলাম। কোন রকম হামাগুড়ি দিয়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করি। কলম হাতে জমি চাষ করার মত লিখে চলেছি। কি লিখছি? মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে একরকম, লিখছি অন্য রকম। তারপরও লিখে যাচ্ছি।

খুব একা একা লাগছে। পাশে বিবি নেই, পায়ের পাশে বিড়ালটাও না। আমার বিবি যতক্ষণ জেগে থাকে, ততক্ষণ ঘ্যানঘ্যান করে। বিবি ঘুমিয়ে পড়লে বিড়াল মিউ মিউ করতে করতে ইঁদুর শিকার করে। শিকার শেষে পায়ের কাছে এসে ঘুমিয়ে পড়ে।

মাঝরাতে ছোট ছেলের মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে জেগে উঠে। প্রতিদিন কতই না বিরক্ত হই। মনে হতো বিবি বিড়াল আদরের নাতনী শান্তি নষ্ট করে। না, আজ মনে হচ্ছে তাদের অনুপস্থিতি আমার অশান্তির কারণ। কলম খাতা রেখে শুয়ে পড়লাম। মাকে যে বছর হারিয়েছিলাম তারপর থেকে কোন রাত বালিশ না ভিজিয়ে ঘুমায়নি। আজকেও চোখ দিয়ে নিজে নিজে পানি পড়ছে বালিশ ভিজে গিয়ে একেক ফোটা চাদরে পড়ছে। নিরবে কাঁদার মাঝে এক ধরণের সুখ আছে। কাঁদতে কাঁদতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ি।

ফজরের আজানের পূর্বে ঘুম ভাঙ্গল। দশ বছর বয়স থেকে খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ার অভ্যাস, তারপর কাজ শুরু করি। আজানের শব্দ শোনা যাচ্ছে না, আজান দেওয়ার মত কেউ নেই। নামাজ পড়ার মত মানুষ নেই। মসজিদও নেই, পুড়িয়ে দিয়েছে। ওজু করে নামাজ পড়ে কিছুক্ষণ কোরাআন তেলোয়াত করে বেরিয়ে পড়লাম গন্তব্যের উদ্দেশ্য।

দোকানপাট সব পুড়িয়ে দিয়েছে। ছাই মঝে মাঝে বাতাসের সাথে খেলা করছে। হাঁটতে হাঁটতে মিলিটারি ক্যাম্পের সামনে পৌঁছালাম। গেটে থাকা দুই গার্ড আমাকে পাগল বলে তাড়িয়ে দিলো। আমিও নাছোড়বান্দা। বটগাছের নিচে মাথা নিচু করে একটা বুলেটের অপেক্ষায় বসে আছি। অনেকক্ষণ হলো কেউ কিছু বললো না। গাড়ি আসছে, গাড়ি যাচ্ছে, আমার দিকে কেউ ফিরে তাকাচ্ছে না। আমার মত বুড়োর জন্য একটা বুলেট তাদের বরাদ্দ নেই। মাঝে মাঝে পুরুষের আর্তচিৎকার শোনা যাচ্ছে। গ্রামের যুবকদের নির্যাতন করছে।

এক সময় হতাশ হয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ততক্ষণে আকাশের সাথে মিশে যাচ্ছে ধোঁয়া। যে ক’টা বাড়িঘর বাকী ছিল সে সব পুড়িয়ে দিয়েছে। একদল বস্তা করে আসবাবপত্র নিয়ে যাচ্ছে। আরেক দল পুড়িয়ে আনন্দ করছে, এই যেন পুড়ানোর উৎসব। আমাকে দেখে মিলিটারি একজন পাগল বলে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল। ভেবেছিলাম একটা বুলেট আমার জন্য তাদের বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু না, আমার দিকে আর কেউ ফিরেও তাকালো না।

পোড়ানো শেষ হলে উপরের দিকে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে চলে গেল ওরা। মাটিতে শুয়ে শুয়ে মাটির গন্ধ শুঁকচ্ছি। এক সময় উঠে ধীরে ধীরে হাটা শুরু করলাম। সামনে ফসলের ক্ষেত। হাঁটছি আর হাঁটছি। আইলে পড়ে আছে নারী পুরুষ আর শিশুর লাশ। একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম, প্রত্যেক নারীর লাশ উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে। আরও এক বছর এই রকম লাশ পড়ে থাকতে দেখেছিলাম।

সেবছর মাঠের পর মাঠ ফসলে ভরে গিয়েছিল ধানের গোছা একেকটা অনেক বড় হয়েছিল। ধান পেকে হলুদ রংয়ে সেজেছিল। ধান কাটার কয়েকদিন বাকী ছিল। হঠ্যাৎ বন্যার পানিতে সব তলিয়ে গিয়েছিল। মাঠের পর মাঠ লাশ পড়েছিল। এই বছরেও তাই মাঠে ধান পেকে হলুদ হয়ে আছে, ধানের গোছ সে বছরের মত বড় বড়। লাশ পড়ে আছে ধানক্ষেতের মাঝে, আইলে। একটা পার্থক্য লক্ষ্য করলাম। তখন মানুষের লাশ পড়েছিল, এখন শুধু সংখ্যালঘু মুসলমানদের লাশ।

……… দখিনা বাতাসে শরীরের নিস্ক্রিয় ঈন্দ্রিয় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ইচ্ছে করছে জামাকাপড় খুলে নাচতে নাচতে সারা মাঠ লাফিয়ে বেড়াই। ওহ! সেদিন কতই না আনন্দের ছিলো! পরনের লুঙ্গী হাতে নিয়ে উড়াতে কতই না হৈ চৈ করেছি। আজও তাই করতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু সময় আমার অনুকূলে নেই। ইচ্ছে! অনেক কিছু করতে ইচ্ছে করে কিন্তু হৃদয়ে জন্ম নিয়ে হৃদয়ে মৃত্যু ঘঠে। সুযোগ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অনেক দুমড়ে মুচড়ে অপরিপূর্ণ থেকে যায়। মাঝে মাঝে নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করি “জীবনের মানে কী?”

…………… দু’হাত প্রসারিত করে মাঠের মাঝে ঢিবিতে দাঁড়িয়ে আছি। ইচ্ছে করছে পাখির মত ডানা মেলে উড়ে যাই দূর আকাশে। লক্ষ্য করলাম, ধানের প্রতিটি গোছা মানুষের রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। কানে ভেসে আসে অসহায় মজলুমের চিৎকার। শত শত হাজার হাজার মানুষ আমার সামনে দাড়িয়ে আছে অধীর আগ্রহে। কিছু চাইছে আমার মত ভিখারীর কাছে। ভিক্ষা নয়, পথের সন্ধান। আমার কী করা উচিৎ? কি বলা উচিৎ? আমার জানা নেই।

গন্তব্যহীন পথে যাত্রা করতেও বারণ করতে পারি না। মিলিটারির হাতে মারা পড়বে, তাই। মনে হচ্ছে, আমার একটা কথা তাদের শক্তিকে দ্বিগুণ করবে। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবে নির্দ্বিধায়। । আমি কী পারিনা তাদের সঠিক পথের সন্ধান দিতে? আমিও কী মহাপুরুষ ! না, আমি পুরুষ নই! মানুষ হয়ে জন্ম নিয়ে মহাপুরুষ হয়, আর আমরা মানুষ হয়ে জন্ম নিয়ে কাপুরুষ হই।

দ্রুম দ্রুম দুই রাউন্ড বুলেটের শব্দকানে এসে বাজে। আমি মাটির ডিবি থেকে নিচে পড়ে যায়। মনে হলো, কপাল দিয়ে বুলেট টা গেছে । কালিমা পড়া শেষ হওয়ার পূর্বে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। খানিক বাদে জ্ঞান ফিরে আসে।ভেবে ছিলাম, আমার শেষ গন্তব্যে পৌছাতে মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গন করেছি। কিন্তু না,বুলেট আমার কপাল ফুঁটো করেনি। কানের পাশ দিয়ে গেছে।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

12 + 6 =

আরও পড়ুন