“কক্সবাজার ভ্রমণে কোনও পর্যটক বাস টার্মিনালে পৌঁছালেই ওঁৎ পেতে থাকা এসব চক্র কম খরচে ভালো হোটেলে থাকার কথা বলে কৌশলে নিয়ে যায় নির্ধারিত হোটেলে।”

গাড়ি থেকে নামলেই টানা হেঁচড়া

fec-image

পর্যটন রাজধানী অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভুমি কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকদের হয়রানি ও ভোগান্তিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে অনেকদিন ধরে। কক্সবাজার বাসটার্মিনাল ও কলাতলিতে পর্যটক নামামাত্রই ভাল হোটেলে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে এক শ্রেণির দালাল চক্র তাদের টানা-হেঁচড়াসহ নানাভাবে হয়রানি করছে। বেশকিছু সিএনজি, টমটম ও রিকশাচালক এ চক্রের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।

এতে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে হোটেল-মোটেল, গেস্ট হাউস মালিকরা প্রচুর আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার পাশাপাশি পর্যাপ্ত পর্যটন সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে পর্যটকরা। অন্যদিকে পর্যটন শিল্প বিকাশে প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

ভুক্তভোগী পর্যটক ও স্থানীয়রা জানান, কক্সবাজার বাস টার্মিনাল কেন্দ্রীক একটি শক্তিশালি সিন্ডিকেট এক শ্রেণির হোটেল মালিকদের সহযোগিতায় দীর্ঘদিন ধরে এই অপকর্ম চালিয়ে আসছে। কিন্তু এ যাবৎ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন ধরনের অভিযোগ আমলে নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। কক্সবাজার ভ্রমণে কোনও পর্যটক বাস টার্মিনালে পৌঁছালেই ওঁৎ পেতে থাকা এসব চক্র কম খরচে ভালো হোটেলে থাকার কথা বলে কৌশলে নিয়ে যায় নির্ধারিত হোটেলে। আবার মাঝপথে নিয়ে গিয়ে পর্যটকদের কাছে থাকা দামি জিনিসপত্র নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও রয়েছে অহরহ।

শহরের বাসটার্মিনাল, কলাতলী মোড় ও সুগন্ধা পয়েন্টসহ বিভিন্ন পয়েন্টে প্রতিদিনই এসব চিত্র দেখা যায়। ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বেড়াতে আসা পর্যটকরা গাড়ি থেকে নামার সময় রীতিমত টানা-হেঁচড়া শুরু করে কিছু সিএনজি, টমটম ও রিকশাচালক। এসব চালকরা পর্যটকদের কলাতলীর হোটেল-মোটেল জোনে নিয়ে যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। আর গাড়িতে ওঠানোর পরেই শুরু হয় প্রতারণার নকশা। তারা পর্যটকদের নানাভাবে প্রলোভন দেখানো শুরু করে।

এছাড়াও পর্যটকের ধরন দেখে মাদক ও যৌনকর্মী সংগ্রহ করে দেওয়ার কথা বলেও হাতিয়ে নেয় টাকা। কমিশনের জন্য ওইসব দালাল চালকরা পর্যটকদের যেসব আবাসিক হোটেল বা কটেজে তুলে দেয়, সেগুলো টাকার তুলনায় খুবই নিম্নমানের। একইভাবে দালালরা খাবারের হোটেলেও নিয়ে যায় কমিশনের জন্য।

সরেজমিনে দেখা যায়, কলাতলি মোড়ে অপেক্ষামান কয়েকজন রিক্সাচালককে স্থানীয় এক যুবক শহরের লাইটহাউস যাওয়ার কথা বললে তারা সাফ জানিয়ে দেয় স্থানীয়দের রিক্সায় উঠাবে না। তারা অপেক্ষা করছে পর্যটকের জন্য। পরে জানা গেছে এ তিনি পেশাদার রিক্সাচালক না। শহরের কয়েকটি হোটেল ও কটেজের সঙ্গে কমিশন ভিত্তিক মৌখিকভাবে চুক্তিবদ্ধ।

ভুক্তভোগী পর্যটক দম্পতি আবুল হায়াত ও লাইলি আক্তার জানান, তারা কক্সবাজার এসেছেন ঈদের দুদিন পরে। আসার পথে বাস টার্মিনালে টমটম চালকের সহযোগিতায় যে আবাসিক হোটেলে উঠেছেন, ওই হোটেলের ব্যবস্থাপনা খুবই বাজে। যদিও তাদের কাছ থেকে রুম ভাড়া রাখা হয়েছে নির্দিষ্ট মূল্যের চেয়েও বেশি। একদিন পরে ওই হোটেল ছেড়ে দিয়ে তারা অন্য একটি আবাসিক হোটেলে ওঠেন এবং সেখানে ভাল আছেন।
কলাতলি পয়েন্টে কথা হয় ঢাকা থেকে আসা সাংবাদিক খোকা মোহাম্মদ চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, বাস টার্মিনালে নামামাত্রই টানা-হেঁচড়ায় বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হতে হয়।

একইভাবে সাভারের এক গার্মেন্ট ব্যবসায়ী পর্যটক মাহফুজুর রহমান জানান, তিনি এই পর্যন্ত চারবার কক্সবাজার এসেছেন। গত বছর তার দুই বন্ধুকে ভাল রেস্টুরেন্টে খাবারের কথা বলে দরিয়ানগরে নিয়ে ছিনতাইকারীর কবলে ফেলে এক টমটম চালক পালিয়ে যায়।
কক্সবাজার হোটেল মোটেল গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম সিকদার বলেন, এক শ্রেণির হোটেল ও কটেজ ব্যবসায়ীরা রিকশা, টমটম ও সিএনজি চালকদের আর্থিকভাবে প্রলোভন দেখিয়ে শহরের বিভিন্ন স্থানে পর্যটকদের পেছনে লেলিয়ে দিয়েছে। এ কারণে পর্যটক হয়রানি বেড়েছে। এটা আসলে বন্ধ করা দরকার।

তিনি আরো বলেন, বর্তমানে ঈদের পরে কয়েকদিন পর্যটন ব্যবসা হয়েছে। গতকাল অন্যান্য সময়ের চেয়ে পর্যটক আসা কমে গেছে এবং শহরের ভেতর যানজটও নেই বললে চলে। কিন্তু, পর্যটকবাহী বাসগুলোর শহরে প্রবেশাধিকার এখনও নিষিদ্ধ রয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে পর্যটকদের বাস টার্মিনালে নামিয়ে দেওয়া হয়। এ কারণে রিকশা, টমটম ও সিএনজি চালকধারি এক শ্রেণির দালাল চক্র পর্যটকদের নানাভাবে হয়রানির সুযোগ পাচ্ছে।

এ ব্যাপারে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (পর্যটন সেল) সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, ‘বাস টার্মিনাল ও কলাতলি মোড়ে পর্যটক হয়রানির কিছু ঘটনা সম্পর্কে অভিযোগ আমার কাছে এসেছে। ইতিপূর্বে কয়েকবার অভিযানও চালিয়েছি। বিষয়টি নিয়ে আমি কক্সবাজার জেলা প্রশাসক, হোটেল মোটেল মালিক সমিতিসহ সংশ্লিষ্ট অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। আশাকরি খুব দ্রুত এই সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে।’

তিনি জানান, ঈদের পরদিনও পর্যটককে হয়রানি করায় কয়েকজন দালাল এবং ছিনতাইকারীকে আটক করে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এ অভিযান অব্যাহত আছে থাকবে।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: গাড়ি, টানা হেঁচড়া, নামলেই
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × three =

আরও পড়ুন